লাঠি হাতে গ্রামে গ্রামে নারীরা
উত্তরপ্রদেশে অপরাধীদের যম এখন মহিলাদের ‘গ্রিন আর্মি’

ছুটির দিন এলেই উত্তরপ্রদেশের গ্রামের পথে দেখা যায় এক অন্যরকম দৃশ্য। সবুজ শাড়ি পরা একদল মহিলা, হাতে লাঠি নিয়ে দল বেঁধে ঘুরছেন। ঠিক যেন উত্তরপ্রদেশে অপরাধীদের কাছে যমের মতো। কারণ তাদের দেখলেই কোথাও জুয়ার আসর গুটিয়ে যায়, কোথাও আবার মদের বোতল লুকিয়ে ফেলেন পুরুষেরা। এই মহিলারাই এখন পরিচিত ‘গ্রিন আর্মি’ নামে। তাদের লড়াই শুধু মদ, জুয়া বা নেশার বিরুদ্ধে নয়। বাল্যবিবাহ, পণপ্রথা, গার্হস্থ্য হিংসা এবং মেয়েদের পড়াশোনা নিয়েও তাঁরা নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছেন।
নিজের ঘরের অত্যাচার থেকেই শুরু
এই উদ্যোগের শুরু উত্তরপ্রদেশের বারাণসী জেলার কুশিয়ারি গ্রামে। ২০১৪ সালে গ্রামের কয়েকজন মহিলা তাদের নিজেদের জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে একজোট হন। তাদের অনেকের স্বামী মদ খেয়ে সংসারের টাকা নষ্ট করতেন, জুয়ায় জড়িয়ে পড়েছিলেন। অনেক পরিবারে খাবারের অভাব ছিল। এমনও হয়েছে, মদ্যপ স্বামীর অত্যাচারের কারণে সন্তানদের না খেয়ে ঘুমোতে হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই ‘আর চুপ করে নয়’— এই ভাবনা তৈরি হয়।
এই সময় কুশিয়ারি গ্রামে গিয়েছিলেন প্রাক্তন বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রবি মিশ্র। শিশুদের স্কুলে না যাওয়ার কারণ খুঁজতে গিয়ে তিনি গ্রামের মহিলাদের সঙ্গে কথা বলেন। তাঁদের কয়েকজনের সঙ্গে আলোচনার পরই এই দল গড়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরে ২০১৫ সালে রবি মিশ্র ও তাঁর সহযোগীদের উদ্যোগে হোপ ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টও প্রতিষ্ঠিত হয়। ‘গ্রিন আর্মি’ সেই সংগঠনের অন্যতম প্রধান উদ্যোগ হয়ে ওঠে।
লাঠি ভয় দেখানোর জন্য নয়
শুরুতে মহিলারা দল বেঁধে বাড়ি বাড়ি গিয়ে কথা বলতেন। মদ ছাড়তে, জুয়া বন্ধ করতে এবং পরিবারের মহিলাদের উপর অত্যাচার না করতে পুরুষদের নিয়মিত বোঝানো হত। সবুজ শাড়ি ধীরে ধীরে তাঁদের পরিচয়ের প্রতীক হয়ে ওঠে। হাতে থাকা লাঠিও শুধু মারধরের অস্ত্র নয়। মহিলাদের কথায় এটি তাঁদের ঐক্য ও আত্মরক্ষার প্রতীক। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেলে পুলিশকেও খবর দেওয়া হয়। রবি মিশ্র এক সাক্ষাৎকারে জানান, প্রায় ২০০ সদস্যকে ‘পুলিশ মিত্র’ পরিচয়পত্র দেওয়া হয়েছিল। যাতে প্রয়োজনের সময় তাঁরা সহজে পুলিশের সাহায্য চাইতে পারেন।
আর ধীরেধীরে সময়ের সঙ্গে লড়াইয়ের পরিধিও বেড়েছে। এখন বাল্যবিবাহ আটকানো, পণপ্রথার বিরুদ্ধে সচেতনতা, কন্যা শিক্ষা, কুসংস্কার এবং মাদক বিরোধী প্রচারও তাদের কাজের অংশ। কোনও বাড়িতে মেয়ের জন্ম হলে তাঁরা সেখানে গিয়ে গান করেন, পরিবারকে বোঝান— কন্যাসন্তান বোঝা নয়। ‘বেটি উৎসব’ কর্মসূচির মাধ্যমে নবজাতক মেয়েদের পরিবারকে পুষ্টি এবং স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সহায়তাও দেওয়া হয়।
লড়াইয়ের সঙ্গে জীবিকার পথও
শুধু সামাজিক সচেতনতা নয়, মহিলাদের আর্থিক ভাবে স্বনির্ভর করার কাজও শুরু হয়েছে। সেলাই, চটি তৈরির মতো উদ্যোগে তাদের যুক্ত করা হচ্ছে। ২০২৪ সালের শেষে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও গ্রিন আর্মির কাজের প্রশংসা করেন। বারাণসীর দেওরা গ্রামের সদস্য নির্মলা দেবী গ্রিন আর্মির তৈরি চটি তাঁকে পাঠানোর পর প্রধানমন্ত্রী চিঠি লিখে তাঁদের উদ্যোগের প্রশংসা করেছিলেন তিনি।
আর ২০২৬ সালের মার্চে এই উদ্যোগে আরও নতুন সহায়তাও আসে। উত্তরপ্রদেশের রাজ্যপাল আনন্দীবেন পটেল হোপ ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টকে একটি গাড়ির চাবি তুলে দেন। বারাণসী, মির্জাপুর, ভাদোহী- সহ বিভিন্ন এলাকায় গ্রিন আর্মির কাজ আরও ছড়িয়ে দিতে এই গাড়ি কাজে লাগবে বলে জানানো হয়। এছাড়া রাজ্যপাল তাঁদের মাঠপর্যায়ের কাজের প্রশংসাও করেন
বর্তমানে হোপ ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের ওয়েবসাইটে দাবি করা হয়েছে যে , গ্রিন আর্মির সঙ্গে ২,৮০০- র বেশি মহিলা যুক্ত রয়েছে এবং সংগঠনটি ২৮০ -র বেশি গ্রামে কাজ করছে।
এ বিষয়ে আগামীর সময়কে উত্তরপ্রদেশের কানপুরের সমাজসেবী আবুল হাসান বলেন, ‘গ্রিন আর্মি’র এই উদ্যোগটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ যারা একসময় নিজের ঘরে অত্যাচারের শিকার হয়েছেন। তাঁরাই আজ অন্য মহিলাদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন। মদ, জুয়া, বাল্যবিবাহ বা গার্হস্থ্য হিংসার মতো সমস্যার বিরুদ্ধে শুধু আইন করলেই হবে না, গ্রামের মানুষের মধ্যেও সচেতনতা তৈরি করতে হবে । আর সেই কাজটাই এই মহিলারা নিজেদের মতো করে করছেন। সবচেয়ে ভালো লাগার বিষয় হল যে, তারা শুধু সমস্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছেন না, মহিলাদের স্বনির্ভর করার চেষ্টাও করছেন।'



