ব্রিকস অতিথিদের জন্য পর্দার আড়ালে দিল্লির কুলি ক্যাম্প

দক্ষিণ দিল্লির ভাসন্ত বিহারের কুলি ক্যাম্পের চারপাশে টাঙানো হয়েছে প্রায় ১০ ফুট উঁচু পর্দা। ছবি : সংগৃহীত
আন্তর্জাতিক অতিথিদের স্বাগত জানাতে দিল্লি যখন সাজছে, তখন ভারতের রাজধানীরই একটি বস্তি ঢেকে দেওয়া হয়েছে বড় পর্দায়। দক্ষিণ দিল্লির ভাসন্ত বিহারের কুলি ক্যাম্পের চারপাশে টাঙানো হয়েছে প্রায় ১০ ফুট উঁচু পর্দা। ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে আসা অতিথিদের যাতায়াতের পথের কাছেই এই বসতি।
পর্দা টাঙানোর পর স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে, আন্তর্জাতিক অতিথিদের চোখের আড়ালে কি দিল্লির বস্তিবাসীদের জীবনকে সরিয়ে রাখা হচ্ছে?
১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন হয়েছে। সম্মেলনকে সামনে রেখে দিল্লির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও এলাকাও সাজানো হয়েছে। এর মধ্যেই ১০ সেপ্টেম্বর কুলি ক্যাম্পের চারপাশে পর্দা বসানো হয় বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
নেলসন ম্যান্ডেলা মার্গ ও মুনিরকা মার্গের কাছেই কুলি ক্যাম্প। ব্রিকস সম্মেলনে আসা অতিথিদের যাতায়াতের গুরুত্বপূর্ণ পথের পাশে এই বসতি। ২০১২ সালের দিল্লি আরবান শেল্টার ইমপ্রুভমেন্ট বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, এখানে প্রায় ২৮১টি দরিদ্র পরিবার বসবাস করে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পর্দা বসানোর পাশাপাশি বসতিতে ঢোকা ও বের হওয়ার পথও কমিয়ে দুটি করা হয়েছে। এতে ঠেলাগাড়ি ও অন্যান্য যান নিয়ে চলাচলে সমস্যায় পড়ছেন তারা।
১১ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত সংবাদমাধ্যম ব্রুটের প্রতিবেদনে বাসিন্দাদের অভিযোগ তুলে বলা হয়েছে, সম্মেলনের আগে কুলি ক্যাম্পকে বাইরের মানুষের চোখ থেকে আড়াল করা হচ্ছে। এক বাসিন্দার প্রশ্ন, ‘আমরাই তো এই শহর পরিষ্কার করি।’
বাসিন্দাদের বক্তব্য, দিল্লিকে সুন্দর দেখানোর জন্য যদি তাদের জীবনযাত্রার উন্নতি না করে শুধু পর্দা টাঙানো হয়, তাহলে সমস্যার সমাধান কোথায়?
পর্দার প্রভাব পড়েছে তাদের আয়-রোজগারেও। স্থানীয় ঠেলাগাড়ি চালক ও বিক্রেতাদের কয়েকজন জানিয়েছেন, পুলিশ বা পুরকর্মীরা গাড়ি আটকে দিতে পারেন—এমন আশঙ্কায় তারা গাড়ি নিয়ে বের হননি। ফলে কমেছে আয়।
কুলি ক্যাম্পের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলোও রয়ে গেছে। সরু গলি, খোলা নালা, ভাগ করে ব্যবহার করা পানির ব্যবস্থা এবং অপর্যাপ্ত নিকাশির সমস্যায় বসবাস করতে হয় তাদের। আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আগে এসব সমস্যার সমাধান না করে পর্দা টাঙানোতেই কেন জোর দেওয়া হলো, সেই প্রশ্ন তুলেছেন বাসিন্দারা।
দিনমজুর হাননান আনসারি বলেছেন, ‘আমি শ্রমিকের কাজ করি। এখন কাজে যেতে পারছি না। পুলিশ আসা-যাওয়া করতে দিচ্ছে না। আজ বাড়িতেই বসে আছি। কোথায় যাব? এভাবে চলতে থাকলে ছুটিতেই থাকতে হবে। যা আয় করেছি, তা দিয়েই ক্ষতি সামলাতে হবে।’
সবজি বিক্রি করা এক বাসিন্দা বলেছেন, ‘রোজ ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা আয় হয়। এখন সেই আয় হচ্ছে না। তবু পেট চালানোর জন্য কোনোভাবে কাজ করতেই হবে।’
এক দোকানদার বলেছেন, ‘এটা আমাদের ক্ষতি। দোকানের ক্ষতি। কোনো ক্রেতা নেই। পর্দা লাগানোর পর গেটও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কে আসবে?’
তার দাবি, স্বাভাবিক সময়ে তার দোকান থেকে দিনে প্রায় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা আয় হয়। ২০২৩ সালের জি২০ সম্মেলনের সময়ও চার দিন একইভাবে পর্দা থাকায় প্রায় ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা লোকসান হয়েছিল বলে জানিয়েছেন তিনি।
এই অভিজ্ঞতা অবশ্য কুলি ক্যাম্পের বাসিন্দাদের জন্য নতুন নয়। ২০২৩ সালের ৯ ও ১০ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে জি২০ শীর্ষ সম্মেলনের আগেও বসতিটির চারপাশে বড় সবুজ পর্দা টাঙানো হয়েছিল। তখনও আন্তর্জাতিক অতিথিদের চোখ থেকে বস্তির জীবন আড়াল করার অভিযোগ উঠেছিল। চলাচলে বিধিনিষেধের কারণে ছোট ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবী মানুষের আয় কমে যাওয়ার কথাও জানিয়েছিলেন স্থানীয়রা।
অর্থাৎ দুই বছর পর সম্মেলনের নাম বদলেছে। বদলায়নি কুলি ক্যাম্পের অভিজ্ঞতা।
২০২৩ সালে জি২০ সম্মেলনের সময় যে প্রশ্ন উঠেছিল, এবার ব্রিকস সম্মেলনের আগেও তা সামনে এসেছে। দ্য ওয়্যারসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে তখন কুলি ক্যাম্পের বাসিন্দাদের জীবন এবং পর্দার আড়ালের বাস্তবতা তুলে ধরা হয়েছিল। এবারও একই বসতিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে বিতর্ক।
তবে পর্দা টাঙানো নিয়ে সব বাসিন্দার অবস্থান এক নয়। ব্রুটের প্রতিবেদনে কেউ কেউ বলেছেন, দিল্লিকে পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর রাখার অংশ হিসেবে এসব পর্দায় তাদের বড় আপত্তি নেই। আবার অন্যরা মনে করেন, এর মাধ্যমে তাদের জীবনকে অতিথিদের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখা হচ্ছে।
ব্রিকসের মঞ্চে যখন উন্নয়ন, সহযোগিতা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে রাষ্ট্রনেতাদের আলোচনা হয়েছে, তখন কুলি ক্যাম্পের বাসিন্দাদের প্রশ্নটি খুবই সাধারণ।
যে মানুষগুলোর শ্রমে রাজধানী পরিষ্কার থাকে, তাদের জীবনযাত্রার উন্নতি কবে হবে? দিল্লিকে বিশ্বের সামনে সুন্দর দেখানোর জন্য যদি দিল্লিরই দরিদ্র মানুষের জীবন পর্দার আড়ালে রাখতে হয়, তাহলে সেই সৌন্দর্যায়নের অর্থ কী?
পর্দা হয়তো কিছুদিনের জন্য দৃষ্টির আড়াল করতে পারে। কিন্তু অভাব, অনটন আর নাগরিক সুবিধার সংকটকে কতদিন আড়াল করে রাখা যাবে—কুলি ক্যাম্পের প্রশ্ন এখন সেখানেই।



