মিজোরাম ঘিরে বাড়ছে নিরাপত্তা-শঙ্কা
মাদক-জঙ্গি-শরণার্থী চাপে ভারত-মিয়ানমার সীমান্ত

ছবি: আগামীর সময়
মিয়ানমারে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার জেরে ভারত-মিয়ানমার সীমান্তে নিরাপত্তা পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হয়ে উঠছে। জঙ্গি কার্যকলাপ, আন্তঃসীমান্ত মাদক পাচার, ড্রোন-যুদ্ধের সম্ভাব্য বিস্তার এবং শরণার্থী অনুপ্রবেশ—এই চারটি বিষয়কে ঘিরে বিশেষ করে মিজোরামসহ উত্তর-পূর্ব ভারতের সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলিতে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
অরুণাচল প্রদেশ, নাগাল্যান্ড, মণিপুর ও মিজোরামের মধ্য দিয়ে যাওয়া ১,৬৪৩ কিলোমিটার দীর্ঘ ভারত-মিয়ানমার সীমান্তের একটি বড় অংশ দুর্গম ও ভৌগোলিকভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ায় এই সীমান্ত দিয়ে জঙ্গি চলাচল, অস্ত্র ও মাদক পাচার এবং মানুষের অনুপ্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করা নিরাপত্তা সংস্থাগুলির কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে মিজোরামকে ঘিরে সবচেয়ে বড় উদ্বেগগুলির একটি হল মাদক পাচার। মিয়ানমার-সংলগ্ন সীমান্ত দিয়ে ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল’ অঞ্চল থেকে হেরোইন, মেথামফেটামিন ও অন্যান্য মাদক উত্তর-পূর্ব ভারতে ঢোকার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। নিরাপত্তা সূত্রের দাবি, মাদক পাচারের এই নেটওয়ার্কের সঙ্গে কিছু জঙ্গি সংগঠনের আর্থিক যোগসূত্রও রয়েছে।
২০২৫ সালে মিজোরামের মিয়ানমার সীমান্তবর্তী এলাকাগুলি থেকে ১,০০০ কেজিরও বেশি মাদক বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে বলে নিরাপত্তা সংস্থার উদ্ধৃত পরিসংখ্যানে জানা গেছে। এর মধ্যে ছিল ৭৯.২ কেজি হেরোইন, ৯৬৪.৪ কেজি মেথামফেটামিন এবং ৩৮.৮ কেজি ক্রিস্টাল মেথামফেটামিন।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে শুরু হওয়া ‘অপারেশন জেরিকো’-র অধীনে প্রায় ৩১৭.৩ কোটি টাকা মূল্যের মাদক উদ্ধার হয়েছে বলেও সূত্রের দাবি। সীমান্তের দুর্গম ভূখণ্ড এবং মিয়ানমারের অস্থির পরিস্থিতির কারণে এই পাচারচক্র দমনে আরও সমন্বিত নজরদারির প্রয়োজন বলে মনে করছেন নিরাপত্তা আধিকারিকরা।
ভারতীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলির কাছে আরেকটি বড় উদ্বেগ হল মিয়ানমারের ভূখণ্ডে সক্রিয় বিভিন্ন ভারতীয় জঙ্গি সংগঠনের উপস্থিতি। সূত্রের দাবি, চিন, সাগাইং, কাচিন ও শান প্রদেশের বিভিন্ন এলাকায় জাতিগত সশস্ত্র সংগঠনগুলির নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চলে ভারতীয় বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলির ক্যাডার প্রশিক্ষণ, অস্ত্র সরবরাহ এবং যোগাযোগের নেটওয়ার্ক রয়েছে।
এনএসসিএন-আইএম, এনএসসিএন-কে, পিএলএ, উলফা (১), ইউএনএলএফ এবং কেসিপি-সহ একাধিক সংগঠনের সঙ্গে এই ধরনের নেটওয়ার্কের যোগসূত্রের অভিযোগ রয়েছে।
সীমান্তের নিকটবর্তী এলাকায় ঘাঁটি থাকায় কোনও হামলার পর জঙ্গিদের মিয়ানমারের দিকে সরে যাওয়া তুলনামূলক সহজ হয়ে যায়। ফলে সীমান্তের ওপারের পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়ছে ভারতের নিরাপত্তা ব্যবস্থায়।
সাম্প্রতিক সময়ে নিরাপত্তা সংস্থাগুলির উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে ড্রোন প্রযুক্তির ব্যবহার। জাতীয় তদন্তকারী সংস্থার একটি তদন্তে মার্কিন নাগরিক ম্যাথিউ অ্যারন ভ্যান ডাইক এবং ছয় ইউক্রেনীয় নাগরিকের বিরুদ্ধে মিয়ানমারের চিন জাতিগত সশস্ত্র সংগঠনগুলিকে ড্রোন যুদ্ধের কৌশলগত প্রশিক্ষণ দেওয়ার অভিযোগ উঠে এসেছে বলে সূত্রের দাবি।
ইউরোপ থেকে ভারত হয়ে মিয়ানমারে জঙ্গি গোষ্ঠীগুলির কাছে ড্রোন পৌঁছনোর বিষয়টিও তদন্তে উঠে এসেছে বলে জানা গেছে।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে মণিপুরের কৌত্রুক ও কাদাংব্যান্ড এলাকায় অস্ত্রবাহী ড্রোন ব্যবহার করে হামলার অভিযোগ পরিস্থিতির ভয়াবহতার নতুন দিক সামনে আনে। নিরাপত্তা সূত্রের দাবি, ওই হামলায় ৪০টিরও বেশি বোমা ও গ্রেনেড ফেলা হয়েছিল।
এর ফলে মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলির হাতে থাকা ড্রোন প্রযুক্তি ভবিষ্যতে ভারতীয় ভূখণ্ডে সক্রিয় জঙ্গি সংগঠনগুলির কাছেও পৌঁছতে পারে কি না, তা নিয়ে নতুন করে সতর্ক হয়েছে নিরাপত্তা সংস্থাগুলি।
২০২১ সালে মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকেই দেশটির বিভিন্ন প্রান্তে সংঘাত বেড়েছে। সেনাবাহিনী, জাতিগত সশস্ত্র সংগঠন এবং বিভিন্ন প্রতিরোধ গোষ্ঠীর মধ্যে লড়াইয়ের জেরে চিন স্টেট ও সাগাইং অঞ্চল থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে মিজোরাম ও মণিপুরে আশ্রয় নিয়েছেন।
মিজোরামে বর্তমানে প্রায় ২৮,০০০ থেকে ৩২,০০০ নথিভুক্ত মিয়ানমার শরণার্থী রয়েছেন বলে অনুমান করা হচ্ছে। তাদের অধিকাংশই চিন সম্প্রদায়ের। তবে অনিবন্ধিত শরণার্থীদের যুক্ত করলে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে বিভিন্ন মহলের ধারণা।
মিজোরামের সঙ্গে মিয়ানমারের চিন স্টেটের মানুষের দীর্ঘদিনের জাতিগত ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ রয়েছে। ফলে মানবিক কারণে শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়ার বিষয়টি রাজ্যে ব্যাপক সমর্থন পেয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি শরণার্থী উপস্থিতি সীমান্ত নিরাপত্তা, প্রশাসনিক চাপ এবং সম্পদের ওপর বাড়তি বোঝা তৈরি করছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
মিয়ানমার থেকে মানুষের প্রবেশের বিষয়টি মণিপুরে আরও স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে। চিন শরণার্থীদের সঙ্গে কুকি-জো জনগোষ্ঠীর জাতিগত ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ থাকায় অনুপ্রবেশ, জনসংখ্যার ভারসাম্য পরিবর্তন, জমির ওপর চাপ এবং পোস্ত চাষ সম্প্রসারণ নিয়ে মেইতেই সমাজের বিভিন্ন অংশে উদ্বেগ রয়েছে।
২০২৩ সালের মে মাসে শুরু হওয়া মণিপুরের মেইতেই-কুকি সংঘাতের প্রেক্ষাপটে সীমান্তপারের ঘটনাপ্রবাহ তাই শুধুমাত্র নিরাপত্তার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। তা ইতিমধ্যেই রাজ্যের অভ্যন্তরীণ জাতিগত রাজনীতি ও সামাজিক উত্তেজনার সঙ্গেও যুক্ত হয়ে পড়েছে।
ফলে নিরাপত্তা সংস্থাগুলির সামনে এখন একসঙ্গে একাধিক চ্যালেঞ্জ—সীমান্তপথে জঙ্গিদের যাতায়াত রোধ, মাদক পাচার বন্ধ করা, অস্ত্র ও ড্রোন প্রযুক্তির প্রবাহ আটকানো এবং শরণার্থী সমস্যার মানবিক দিকটি বিবেচনা করে সীমান্ত নিরাপত্তা বজায় রাখা।
মিয়ানমারে সংঘাতের দ্রুত অবসানের কোনও লক্ষণ না থাকায় ভারত-মিয়ানমার সীমান্ত আগামী দিনেও উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ক্ষেত্র হয়ে থাকবে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট আধিকারিকরা। বিশেষ করে মিজোরামের মতো সীমান্তবর্তী রাজ্যে সীমান্তরক্ষী বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা, রাজ্য পুলিশ এবং প্রশাসনের মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ সমন্বয় এখন সময়ের দাবি।






