ম্যাগি নুডলস থেকে থামস আপ: ভারত কীভাবে সস্তা খাবারে ঝুঁকল?

মুম্বাইয়ের একটি খাবারের দোকানে সাজিয়ে রাখা ম্যাগি নুডলসের প্যাকেট। ছবি: রয়টার্স
একসময় ঘরের রান্নাই ছিল ভরসা। এখন ব্যস্ত জীবনে সস্তা ও সহজলভ্য প্যাকেটজাত খাবারই অনেক ভারতীয় পরিবারের নিত্যসঙ্গী। ম্যাগি নুডলসসহ নানা প্রক্রিয়াজাত খাবারের বড় বাজার তৈরি হয়েছে দেশটিতে।
তবে এসব খাবারে অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও চর্বির পরিমাণ নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ। এর মধ্যেই কিছু প্যাকেটজাত খাবারে স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এতে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে, সস্তা খাবারের এই জনপ্রিয়তা ভারতের মানুষের জন্য কতটা নিরাপদ?
রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, প্রশ্নটি এখন আর শুধু খাদ্যাভ্যাসে সীমাবদ্ধ নেই। প্যাকেটজাত খাবারের পুষ্টিমান, উপাদানের মান এবং ভোক্তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে ভারতে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে একই ব্র্যান্ডের পণ্য বিভিন্ন দেশে ভিন্ন উপাদানে তৈরি হওয়ার বিষয়টি এ বিতর্ককে আরও জোরালো করেছে।
ভারতে কিছু প্যাকেটজাত খাবারের মোড়কে স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা দেওয়ার প্রস্তাব ঘিরে দেশ জুড়ে এই বিতর্কের সূত্রপাত। ভারতের ফুড সেফটি অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ডস অথরিটি অব ইন্ডিয়া (এফএসএসএআই) জানিয়েছে, যেসব খাবারে সরকার নির্ধারিত সীমার চেয়ে বেশি বাড়তি চিনি, লবণ বা স্যাচুরেটেড ফ্যাট রয়েছে, সেসব পণ্যে কঠোর লাল সতর্কবার্তার লেবেল দেওয়া হতে পারে।
এর আগে ধাপে ধাপে এই ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা ছিল। তবে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের বিচারকরা ওই পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন তোলার পর একসঙ্গে সতর্কবার্তা দেওয়ার বিষয়টি সামনে আসে। ফলে দীর্ঘদিনের জনপ্রিয় প্যাকেটজাত খাবারের বাজারে এখন স্বাস্থ্যঝুঁকির প্রশ্নটিও সামনে চলে এসেছে।
ভারতে মাথাপিছু আয় বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় অনেক কম। ফলে নেসলের ম্যাগি ইনস্ট্যান্ট নুডলস ও কোকাকোলা কোম্পানির থামস আপের মতো কম দামের খাবার ও পানীয়ের বড় বাজার তৈরি হয়েছে। এতে বড় খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক দেশে যে কঠোর খাদ্যমান মেনে চলে, ভারতে সেগুলো প্রয়োগের চাপ তুলনামূলক কম ছিল।
তবে এবার সেই পরিস্থিতিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে।
ভারতীয় খাবারে অতিরিক্ত চিনির পরিমাণ বিশেষভাবে উদ্বেগের কারণ। বিশ্বে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষের প্রায় এক-চতুর্থাংশই ভারতে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এর পেছনে প্রক্রিয়াজাত খাবারের ভূমিকার কথাও উল্লেখ করেছেন।
ডেনমার্কের ওষুধ কোম্পানি নোভো নরডিস্কের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভারতে ১০ কোটি ১০ লাখের বেশি মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। আরও প্রায় ১৩ কোটি ৬০ লাখ মানুষ প্রি-ডায়াবেটিসে ভুগছেন।
দ্রুত বাড়ছে বাজার
গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইএমএআরসি গ্রুপের তথ্য অনুযায়ী, ভারতে প্যাকেটজাত খাবারের বাজার ২০২৫ সালে ১২ হাজার ৯১৮ কোটি ডলার থেকে বেড়ে ২০২৬ সালে ১৩ হাজার ৭২৫ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। ২০৩৪ সালের মধ্যে এই বাজার ২৩ হাজার ৮৮৩ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে।
ভারতের পরিবার ও বিভিন্ন খাবারের দোকানে প্রতি বছর প্রায় ৬০০ কোটি বার খাওয়া হয় নেসলের ম্যাগি টু-মিনিটস মসলা নুডলস। সুইজারল্যান্ডের খাদ্যপণ্য প্রতিষ্ঠান নেসলে ১৯৮৩ সালে ভারতে প্রথম ইনস্ট্যান্ট নুডলস ব্র্যান্ড হিসেবে ম্যাগি বাজারে আনে।
কর্মজীবী মা ও শিশুদের লক্ষ্য করে পণ্যটির প্রচার করা হয়েছিল। বিজ্ঞাপনে স্কুল বা খেলাধুলার পর ক্ষুধার্ত শিশুদের ম্যাগি খাওয়ার দৃশ্য তুলে ধরা হতো।
ম্যাগির জনপ্রিয়তা ভারতে নেসলের অবস্থান আরও শক্তিশালী করে। বর্তমানে ভারত নেসলের দ্রুততম বর্ধনশীল বাজারগুলোর একটি। তবে ভারতে বিক্রি হওয়া ম্যাগির সব ধরনের পণ্যেই পাম অয়েল ব্যবহার করা হয়।
অন্যদিকে, যুক্তরাজ্যে বিক্রি হওয়া ম্যাগির অনেক সংস্করণে তুলনামূলক দামি সূর্যমুখী তেল ব্যবহার করা হয়। একইভাবে, ভারতে বিক্রি হওয়া নেসলের কিটক্যাটে অস্ট্রেলিয়ার বাজারের সংস্করণের তুলনায় কোকোর পরিমাণ কম।
নেসলের ভারতীয় ইউনিটের সাবেক বিপণন কর্মকর্তা শশাঙ্ক মেহতা বলেছেন, বিষয়টি জাতীয় গর্বের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। ভারতের মানুষ কেন কম মানের উপাদান পাবে এবং কোম্পানিগুলো কেন ধরে নেবে যে ভারতীয়রা ভালো উপাদানের পণ্য কিনতে পারবেন না?
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নেসলের এক সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, উন্নতমানের উপাদানের দামও বেশি। এতে মূল্যসচেতন ভারতীয় বাজারে পণ্যের দাম বাড়তে পারে।
নেসলে জানিয়েছে, স্থানীয় ভোক্তাদের প্রত্যাশা, স্বাদ, খাদ্যসংস্কৃতি, উপাদানের প্রাপ্যতা ও আবহাওয়ার বিষয় বিবেচনা করেই তাদের পণ্যের রেসিপি তৈরি করা হয়।
প্রতিষ্ঠানটির দাবি, রেসিপিতে ভিন্নতা থাকলেও তা পণ্যের মানে প্রভাব ফেলে না। বিশ্ব জুড়ে কিটক্যাটের ১০টির বেশি আঞ্চলিক রেসিপি রয়েছে। তারা ভারতের সব খাদ্যনিরাপত্তা আইন মেনে চলে এবং পণ্যের প্যাকেটে উপাদানগুলো স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়।
বাড়ছে জনঅসন্তোষ
ভারতে কয়েক বছর ধরেই প্যাকেটের সামনের দিকে চিনি, লবণ ও চর্বির মাত্রা সম্পর্কে সতর্কবার্তা দেওয়ার আলোচনা চলছে। চিলি ও মেক্সিকোর মতো দেশেও এ ধরনের ব্যবস্থা চালু রয়েছে। তবে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর বিরোধিতার কারণে ভারতে তা বাস্তবায়নে দেরি হয়েছে। কারণ, দেশটির অনেক প্রচলিত খাবারেই চিনি বা চর্বির পরিমাণ বেশি।
চিলিতে ২০১৬ সালে খাদ্যপণ্যের লেবেলিং আইন চালু করা হয়। ওই আইনে কোনো পণ্যে নির্দিষ্ট পুষ্টি উপাদানের মাত্রা বেশি হলে প্যাকেটে আলাদা কালো অষ্টভুজ আকৃতির সতর্কবার্তা দিতে হয়। গবেষকদের মতে, আইনটি চালুর পর দেশটিতে চিনিযুক্ত পানীয়ের বিক্রি ২৩ দশমিক ৭ শতাংশ কমে যায়।
অল ইন্ডিয়া ফুড প্রসেসরস অ্যাসোসিয়েশনের দাবি, প্রস্তাবিত লেবেলিং ব্যবস্থা চালু হলে ভারতে প্যাকেটজাত খাবারের প্রায় ৮০ শতাংশেই অতিরিক্ত চিনি, লবণ বা চর্বির সতর্কবার্তা দিতে হতে পারে।
সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিকারকর্মী ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবশালীদের কাছ থেকেও কঠোর লেবেলিং ব্যবস্থা চালুর দাবি জোরালো হয়েছে।
রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গত মার্চে ভারতের সরকার শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর লবিংয়ের কাছে নতি স্বীকার করে খাবার ও পানীয়ের প্যাকেটের সামনে সতর্কবার্তা দেওয়ার পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছিল। কোকাকোলা এবং নেসলে ও পেপসিকোর পক্ষে থাকা বিভিন্ন সংগঠন ওই উদ্যোগের বিরোধিতা করেছিল। এর পরই খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ন্ত্রক সংস্থার নতুন প্রস্তাবটি সামনে আসে।
দীর্ঘদিনের অভ্যাস, প্রশ্নের মুখে ব্র্যান্ড
পশ্চিমা বিশ্বের প্যাকেটজাত খাবার উৎপাদনকারী বড় প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায় এক শতাব্দী ধরে ভারতে ব্যবসা করছে। নেসলে ১৯১২ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ উপনিবেশ ভারতে চিনিযুক্ত কনডেন্সড মিল্ক বিক্রি শুরু করে। তখন দেশটির মানুষের বড় অংশই ছিল অত্যন্ত দরিদ্র।
ইউনিলিভার ১৯৩৭ সালে ভারতে ‘ডালডা’ নামে হাইড্রোজেনেটেড উদ্ভিজ্জ তেল বিক্রি শুরু করে। দামি প্রচলিত ঘি-এর তুলনায় সাশ্রয়ী হওয়ায় দ্রুতই এটি নিম্নবিত্ত পরিবারের রান্নাঘর, রেস্তোরাঁ ও মিষ্টির দোকানে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। দাম কম রাখতে বিদেশি কোম্পানিগুলো দ্রুত ভারতেই পণ্য উৎপাদন শুরু করে।
মন্ডেলিজের ভারতীয় ইউনিটের সাবেক কর্মকর্তা পারুল শর্মা বলেছেন, ভারতের অনেক পণ্যের রেসিপি কয়েক দশক আগে মূল্যসচেতন ভোক্তাদের কথা মাথায় রেখে তৈরি করা হয়েছিল। পরে সেগুলো আর পরিবর্তন করা হয়নি। দীর্ঘ সময় ধরে ভারতীয় ভোক্তারাও এসব ব্র্যান্ড নিয়ে খুব একটা প্রশ্ন তোলেননি।
কোকাকোলা কোম্পানির থামস আপও স্থানীয় স্বাদের সঙ্গে মানিয়ে কয়েক দশক ধরে ভারতে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বর্তমানে এক বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের এই ব্র্যান্ডটি ভারতে বিক্রি হওয়ার পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী ভারতীয়দের কাছেও রপ্তানি করা হয়।
দেখতে অনেকটা পেপসি ও কোকা-কোলার মতো হলেও থামস আপের স্বাদ আলাদা। কোকাকোলা ১৯৯৩ সালে প্রায় ৬ কোটি ডলারে ব্র্যান্ডটি কিনে ধীরে ধীরে বাজার থেকে সরিয়ে নিজেদের প্রধান কোমল পানীয় দিয়ে তা প্রতিস্থাপনের পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু ভারতীয় ক্রেতারা থামস আপের স্বাদের প্রতি এতটাই অনুগত ছিলেন যে কোকা-কোলা শেষ পর্যন্ত ব্র্যান্ডটি রেখে দেয়।
ভারতে কোকা-কোলার প্রচলিত কোমল পানীয়ও সাংস্কৃতিকভাবে বেশ জনপ্রিয়। রাস্তার দোকানগুলোতে এতে মসলা মিশিয়ে মসলা কোক হিসেবেও বিক্রি করা হয়।
এ বিষয়ে কোকা-কোলা কোম্পানির কাছে মন্তব্য চাওয়া হলেও তারা কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
ইউনিলিভারের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, গত পাঁচ বছরে প্রতিষ্ঠানটি তাদের বিভিন্ন পণ্যে চিনি ও লবণের পরিমাণ কমাতে অগ্রগতি করেছে। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের প্রতি তাদের সমর্থনের অংশ হিসেবেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পুষ্টি উন্নয়নে বিজ্ঞানভিত্তিক কঠোর মানদণ্ড অনুসরণের দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকারও রয়েছে তাদের।
মন্ডেলিজের সাবেক কর্মকর্তা পারুল শর্মার মতে, ভোক্তাদের দীর্ঘদিনের অভ্যাসই বড় কোম্পানিগুলোর রেসিপি পরিবর্তনের ক্ষেত্রে অন্যতম বড় বাধা। তার ভাষ্য, দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত ক্রেতাদের হারানোর ঝুঁকি থাকায় কোনো কোম্পানিই রাতারাতি একটি পণ্যের রেসিপি বদলাতে পারে না।
সূত্র: রয়টার্স




