প্রত্যাখ্যান বিভিন্ন গোষ্ঠীর
মিয়ানমার জান্তার ‘শান্তি’ প্রস্তাব কেবল জনসংযোগের কৌশল

মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ হাসান ও জান্তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী তিন মং সুই- মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়
চলতি সপ্তাহে মিয়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সফররত মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যকার বৈঠকে শান্তির আলোচনার আগ্রহ দেখিয়েছে নব গঠিত জান্তা সরকার। তবে এই উদ্যোগকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের স্বীকৃতি পাওয়ার জনসংযোগ (পিআর) কৌশল হিসেবে আখ্যা দিয়েছে দেশটির রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক এবং জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো (ইএও)।
তাদের অভিযোগ, প্রকৃত কোনো শান্তির ইচ্ছা নেই জান্তা সরকারের। তারা এই শান্তি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য ইরাবতী।
মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ হাসানের মিয়ানমার সফর এবং জান্তা সরকারের পক্ষ থেকে বিরোধী পক্ষগুলোর সাথে শান্তি আলোচনায় বসার আগ্রহ দেখানো হয় সম্প্রতি।
জান্তা সরকার গত এপ্রিলে ২০১৫ সালের ‘দেশব্যাপী যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে’ (এনসিএ) স্বাক্ষরকারী এবং স্বাক্ষর না করা জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে (ইএও) আগামী ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে শান্তি আলোচনায় যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানায়। একই সঙ্গে তারা ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্টের (এনইউজি) সশস্ত্র শাখা পিপলস ডিফেন্স ফোর্সকে (পিডিএফ) আত্মসমর্পণ করারও আহ্বান জানায়।
কাচিন ইন্ডিপেন্ডেন্স আর্মির মুখপাত্র কর্নেল ন ডন বু, অল্টারনেটিভ আসিয়ান নেটওয়ার্ক অন বার্মার প্রতিষ্ঠাতা ও সমন্বয়কারী ডেবি স্টোথার্ড এই প্রস্তাবের সমালোচনা করেছেন।
তাদের মতে, ‘শুধু জান্তার পররাষ্ট্রমন্ত্রীই নন, বরং ভুয়া প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইংয়ের পক্ষ থেকেও শান্তি ও শান্তি আলোচনার জন্য বিভিন্ন ধরনের জনসংযোগের স্টান্ট দেখানো হচ্ছে। তবে সবাই জানে, তাদের এই আহ্বানে বিশ্বাসযোগ্যতা ও আন্তরিকতার অভাব। তারা (জান্তা) শান্তির কথা বলে, কিন্তু বাস্তবে তারা সামরিক অভিযান চালাচ্ছে। তাই এখন পর্যন্ত জান্তা সরকারের কথা ও কাজের কোনো মিল নেই।’
শান্তি আলোচনার আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছে ক্যারেন ন্যাশনাল ইউনিয়ন, চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট এবং অল বার্মা স্টুডেন্টস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের মতো এনসিএ স্বাক্ষরকারী বেশ কয়েকটি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো।
কেআইও/কেআইএ, সিএনএফ/সিএনএ, কেএনইউ, এনইউজি, কারেন্নি ন্যাশনাল প্রগ্রেসিভ পার্টি/কারেন্নি আর্মি (কেএনপিপি/কেএ) এবং কমিটি রিপ্রেজেন্টিং পাইডুংসু হ্লুত্তাও (সিআরপিএইচ) নিয়ে গঠিত একটি উচ্চ-স্তরের রাজনৈতিক ও সামরিক জোট স্টিয়ারিং কাউন্সিল ফর দ্য ইমার্জেন্স অব এ ফেডারেল ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নও (এসসিইএফ) এ আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছে।
মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা বেরনামার তথ্য অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার জান্তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী তিন মং সুইয়ের সঙ্গে বৈঠক করেছেন মোহাম্মদ হাসান। সেসময় তাকে জানানো হয়, বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ খুঁজতে প্রস্তুত জান্তা সরকার।
মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে উদ্ধৃত করে সংবাদ সংস্থাটি জানায়, ‘তারা (জান্তা) আলোচনার টেবিলে বসতে এবং সব পক্ষকে একসঙ্গে নিয়ে আসার বিষয়ে প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে। যদি এটি সত্যিই করা সম্ভব হয়, তবে তা আমার কাছে নতুন এবং ইতিবাচক অগ্রগতি।’
মঙ্গলবার সুবাংয়ের রয়্যাল মালয়েশিয়ান এয়ার ফোর্স ঘাঁটিতে এক সংবাদ এই মন্তব্য করেন সম্মেলনে মোহাম্মদ হাসান।
২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করার পর থেকেই চরম বিশৃঙ্খলা চলছে মিয়ানমারে।
গত ৬ থেকে ৮ মে ফিলিপাইনের সেবুতে অনুষ্ঠিত হয়েছে আসিয়ানের শীর্ষ সম্মেলন। সম্মেলন শেষে মিয়ানমারের সার্বিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করতে গত মঙ্গলবার নেপিদো যান মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
সহিংসতার অভিযোগে বর্তমানে আসিয়ানের শীর্ষ সম্মেলনে নিষিদ্ধ জান্তা নেতারা। সহিংসতা ও স্থিতিশীলতার জন্য পাঁচ দফা প্রস্তাব আছে জোটের। এটি বাস্তবয়ান না হওয়া পর্যন্ত শীর্ষ সম্মেলনে নিষিদ্ধই থাকবে নেপিদো।
উল্লেখ্য, ২০২১ সালের এপ্রিলে জাকার্তায় অনুষ্ঠিত বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে পাঁচ দফা বাস্তবায়নের রাজি হয়েছিলেন মিন অং হ্লাইং। এর জবাবে বয়কট নীতি বজায় রাখে আসিয়ান। তাতে ক্ষোভ জানায় জান্তা সরকার। এরপরই নেপিদো সফরে আসেন মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
হাসান জানান, জান্তা এবং বিরোধী পক্ষগুলোর মধ্যে আলোচনা সহজ করতে প্রস্তুত কুয়ালালামপুর। তবে নেপিদোর ওপর প্রকাশ্যে চাপ সৃষ্টি করার বিষয়ে সতর্ক করেন তিনি।
বেরনামার প্রতিবেদন অনুযায়ী, জান্তা প্রতিপক্ষের সঙ্গে বৈঠকে বেসামরিকদের ওপর সহিংসতা থামাতে আসিয়ানের পাঁচ দফার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।





