মিয়ানমারে আরও শক্তিশালী চীন

সংগৃহীত ছবি
‘ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটে; প্রথমবার ট্র্যাজেডি হিসেবে, দ্বিতীয়বার প্রহসন হিসেবে।’ উক্তিটি কার্ল মার্কসের বিখ্যাত রচনা ‘দ্য এইটিনথ ব্রুমেয়ার অব লুই বোনাপার্টের’। ১৮৫১ সালে নেপোলিয়নের ভাতিজা লুই-নেপোলিয়ন বোনাপার্টের অভ্যুত্থান ও তার চাচার ক্ষমতার উত্থানের তুলনা করে লিখেছিলেন তিনি।
ফরাসি প্রথম সাম্রাজ্যকে ট্র্যাজেডি এবং দ্বিতীয়টিকে প্রহসন বলা গেলেও আজকের মিয়ানমারে ঘটছে ঠিক তার উল্টো। ১৯৮৮ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বরের গণহত্যার পর আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতার মুখে মিয়ানমার সামরিক বাহিনী ঝুঁকেছিল চীনের দিকে; কিন্তু সেই নির্ভরশীলতা হয়ে ওঠে প্রকট। তাই পশ্চিমাদের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্য দেশটি উন্মুক্ত করে দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না জান্তার কাছে।
মিয়ানমারে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটছে মার্কসের সূত্রের উল্টো পথে। এখানে কোনো প্রহসন নয়, বরং মঞ্চস্থ হচ্ছে এক ভয়াবহ ট্র্যাজেডি। এখানে জনগণের কথা বলার কোনো অধিকার নেই
২০১০ সালের কারচুপির নির্বাচনের পর অগোছালো পদক্ষেপ এবং পরিকল্পনাহীন উদ্যোগের ফলে জন্ম নেয় এক শক্তিশালী নাগরিক সমাজ। টানা দুইবার বড় জয় পায় এনএলডি। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে অভ্যুত্থান ঘটান সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইং। ফলস্বরূপ পশ্চিমাদের নিষেধাজ্ঞা ও বয়কট ফিরে আসে আবারও।
তবে বর্তমান সেনাশাসন অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে বৈচিত্র্য এনেছে বিদেশি যোগাযোগে। অন্যদিকে চীনও মিয়ানমারের ওপর প্রভাব বিস্তারে এখন অনেক বেশি কৌশলী। শেষ পর্যন্ত এটি একটি ট্র্যাজেডি হতে যাচ্ছে, যার চড়া মূল্য দিতে হবে মিয়ানমারের সাধারণ মানুষকে।
অপ্রত্যাশিত কিছু না ঘটলে মিয়ানমারের ভবিষ্যৎ অত্যন্ত অন্ধকার। নতুন সরকার হয়তো লোক-দেখানো কিছু রাজনৈতিক বন্দি মুক্তি দেবে কিংবা ব্যর্থ ‘শান্তি প্রক্রিয়া’ পুনরায় চালুর নাটক করবে
প্রথম কোনো শক্তিশালী দেশের নেতা হিসেবে সিনিয়র জেনারেল থেকে প্রেসিডেন্ট হওয়া মিন অং হ্লাইংকে অভিনন্দন জানিয়েছেন চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এবং বেইজিংয়ের সাবেক রাষ্ট্রদূত টিন মং সোয়েকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া।
এটি প্রমাণ করে যে বর্তমান সরকার চীনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করতে আগ্রহী। ১৯৮৮ পরবর্তী জান্তার চেয়ে মিন অং হ্লাইংয়ের সরকারের বক্তব্যগুলো এখন অনেক বেশি মার্জিত। ১৯৮৯ সালে তৎকালীন সামরিক গোয়েন্দা প্রধান খিন নিউন্ট বেইজিংয়ের গণতন্ত্রকামী বিক্ষোভকারীদের ওপর দমন-পীড়নের প্রতি সহানুভূতি জানিয়ে বলেছিলেন, ‘মিয়ানমারের মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ায় চীনের প্রতি তাদের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে।’
সব সমীকরণ বদলে দিয়েছে মিন অং হ্লাইংয়ের অভ্যুত্থান। চীন এখন পূর্ণ শক্তিতে ফিরে এসেছে মিয়ানমারে। পুনরায় চালুর কথা চলছে মিতসোন প্রকল্প
খিন নিউন্টকে মিয়ানমারে চীনের ঘনিষ্ঠ লোক হিসেবে দেখা হতো। তার সেই বক্তব্যের পর চীন দেশটিতে পাঠাতে শুরু করে যুদ্ধবিমান, ট্যাংক ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম।
২০০৪ সালের অক্টোবরে খিন নিউন্টের পতনের মূল কারণ ছিল তার গোয়েন্দা ব্যবস্থার অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা। তার অনুগতরা কাস্টমস, ইমিগ্রেশন ও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে আধিপত্য বিস্তার করে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছিল সামরিক চেইন অব কমান্ডকে। পতনের তাৎক্ষণিক কারণ হিসেবে চীনের সীমান্তবর্তী মুসে বাণিজ্য জোনে গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের ব্যাপক দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া যায়।
খিন নিউন্ট সেই কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ উপেক্ষা করে উল্টো তদন্ত শুরু করে সংশ্লিষ্ট সেনা কর্মকর্তাদের ওপর। ফলে তাকে সৈন্যসহ ঘিরে ফেলে সপরিবারে গ্রেপ্তার করেন জান্তা প্রধান সিনিয়র জেনারেল থান শোয়ে।
মুসের ঘটনাটি শেষ কারণ হলেও, থান শোয়ে মনে করতেন চীনের সঙ্গে খিন নিউন্টের সম্পর্ক ছাড়িয়ে গেছে সামরিক বাহিনীর গ্রহণযোগ্য সীমা। এমনকি খিন নিউন্ট দায়িত্বে থাকাকালীনই সেনাবাহিনী খুঁজতে শুরু করে চীনের বিকল্প। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে রাশিয়ার কাছ থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনা শুরু করে মিয়ানমার। এমনকি হাজার হাজার ক্যাডেটকে প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো হয় রাশিয়ায়।
পাকিস্তান বা ভারতের চেয়ে চীনের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মিয়ানমার। কারণ নেপিদো একমাত্র প্রতিবেশী, যার ভূখণ্ড ব্যবহার করে সরাসরি ভারত মহাসাগরে প্রবেশের সুযোগ পায় বেইজিং
খিন নিউন্টের পতনের দুই বছর পর মস্কো সফর করেন ভাইস-সিনিয়র জেনারেল মং আই। এটি ছিল কয়েক দশকের মধ্যে কোনো শীর্ষ মিয়ানমার নেতার প্রথম রুশ সফর। ২০০৭ সালে রাশিয়া ও চীন জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে মিয়ানমার জান্তার বিরুদ্ধে আনা নিন্দা প্রস্তাব ভেটো দিয়ে আটকে দেয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মিয়ানমার সামরিক বাহিনী বেলারুশ এবং সে দেশের একনায়ক আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কোর সঙ্গেও গড়ে তুলেছে সুসম্পর্ক।
তবে রাশিয়া বা বেলারুশ কারোরই চীনের মতো প্রভাব বা ভূ-কৌশলগত স্বার্থ মিয়ানমারে নেই। এশিয়ার মানচিত্রের দিকে তাকালেই বোঝা যায় মিয়ানমার বেইজিংয়ের কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ। চীন একটি বিশাল স্থলবেষ্টিত সাম্রাজ্য, যার উপকূলরেখা তুলনামূলক ছোট। রপ্তানি-নির্ভর অর্থনীতির জন্য বন্দরের সুবিধা তাদের কাছে অত্যাবশ্যকীয়।
পাকিস্তান বা ভারতের চেয়ে চীনের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মিয়ানমার। কারণ নেপিদো একমাত্র প্রতিবেশী, যার ভূখণ্ড ব্যবহার করে সরাসরি ভারত মহাসাগরে প্রবেশের সুযোগ পায় বেইজিং। এর ফলে বিতর্কিত দক্ষিণ চীন সাগর এবং ব্যস্ত মালাক্কা প্রণালি এড়িয়ে তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদ আমদানি-রপ্তানি করা সম্ভব।
১৯৮৫ সালে বেইজিং রিভিউয়ের এক নিবন্ধে প্যান কি নামক এক সাবেক মন্ত্রী চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডরের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। এই রুটটি মূলত মিয়ানমার উপকূল থেকে ইউনান পর্যন্ত বিস্তৃত তেল ও গ্যাস পাইপলাইনের পথ। বর্তমানে ইউনান থেকে বঙ্গোপসাগরের কিউফিউ গভীর সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত ভাবা হচ্ছে উচ্চগতির রেলসংযোগের পরিকল্পনাও।
৯৩ বছর বয়সী থান শোয়ে এখন দৃশ্যপটের আড়ালে। সেই সঙ্গে হারিয়ে গেছে চীনের সঙ্গে সম্পর্কের সেই সতর্ক অবস্থান। ২০১১ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট থেইন সেইন স্থগিত করে দেয় চীনা অর্থায়নের মিতসোন বাঁধ প্রকল্প। এটি ছিল বেইজিংয়ের জন্য এক বড় ধাক্কা।
তবে সব সমীকরণ বদলে দিয়েছে মিন অং হ্লাইংয়ের অভ্যুত্থান। চীন এখন পূর্ণ শক্তিতে ফিরে এসেছে মিয়ানমারে। পুনরায় চালুর কথা চলছে মিতসোন প্রকল্প। বেইজিং নিজের স্বার্থ রক্ষায় থামিয়ে দিয়েছে ‘অপারেশন ১০২৭’ নামক বিদ্রোহী তৎপরতাও। বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোকে পিছু হটতে এবং জান্তার সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে বাধ্যও করেছে দেশটি। কারণ তাদের কাছে বাণিজ্যিক পথ সচল রাখাই মূল উদ্দেশ্য।
রাশিয়া বা বেলারুশের পক্ষে অসম্ভব ছিল এমন প্রভাব বিস্তার করা। ফলে মিয়ানমারের অন্যান্য অংশেও প্রতিরোধ আন্দোলন এখন নড়বড়ে। চিন রাজ্যসহ বিভিন্ন এলাকায় বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো এখন নিজেদের মধ্যে আধিপত্য ও কর আদায় নিয়ে লড়াইয়ে ব্যস্ত। বিলুপ্ত করা হয়েছে একসময়ের শক্তিশালী দল এনএলডি। সামরিক শাসনের ভয়ে চুপ করিয়ে দেওয়া হয়েছে শহরাঞ্চলের মানুষকে।
প্রত্যাশিত কিছু না ঘটলে মিয়ানমারের ভবিষ্যৎ অত্যন্ত অন্ধকার। নতুন সরকার হয়তো লোক-দেখানো কিছু রাজনৈতিক বন্দি মুক্তি দেবে কিংবা ব্যর্থ ‘শান্তি প্রক্রিয়া’ পুনরায় চালুর নাটক করবে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক হয়তো কিছুটা উন্নত হবে। তবে সামরিক বাহিনী ২০১১ সালের মতো দেশ উন্মুক্ত করার ভুল আর করবে না। সামান্য শিথিলতা দেখালেও আগের মতো রাজনৈতিক স্বাধীনতা পাওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
মিয়ানমারে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটছে মার্কসের সূত্রের উল্টো পথে। এখানে কোনো প্রহসন নয়, বরং মঞ্চস্থ হচ্ছে এক ভয়াবহ ট্র্যাজেডি। এখানে জনগণের কথা বলার কোনো অধিকার নেই। চীন-সমর্থিত সামরিক বাহিনী এখন আগের চেয়েও বেশি সুসংহত। সশস্ত্র প্রতিরোধ চললেও তা নেপিদোর জেনারেলদের জন্য বড় কোনো হুমকি নয়। এই ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে শুধু সামরিক বাহিনীর ভেতর বড় ধরনের ফাটল। বর্তমানে এমনটা ঘটার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।
লেখক : সুইডিশ সাংবাদিক ও লেখক



