ইরান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে যুক্তরাজ্যে খাদ্য সরবরাহে শঙ্কা

ছবি: সংগৃহীত
ইরান যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক না হলে যুক্তরাজ্যে খাদ্য সরবরাহে বিঘ্ন ঘটতে পারে, এমন আশঙ্কায় আগাম প্রস্তুতি নিচ্ছে দেশটির সরকার।
সরকারি এক সূত্র বিবিসিকে জানিয়েছে, সম্ভাব্য সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এতে হরমুজ প্রণালি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকা এবং কার্বন ডাই-অক্সাইড সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার মতো পরিস্থিতি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় কার্বন ডাই-অক্সাইড অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পশু জবাই, খাদ্য সংরক্ষণ, ঠান্ডা রাখা, এমনকি কোমল পানীয় ও বিয়ার উৎপাদনেও এই গ্যাস ব্যবহৃত হয়।
পরিবেশ, খাদ্য ও গ্রামীণ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলেন, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ চলছে এবং সম্ভাব্য সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির পরিকল্পনা ভবিষ্যতের পূর্বাভাস নয়, বরং প্রস্তুতির একটি অংশ।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, ট্রেজারি ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা ‘এক্সারসাইজ টার্নস্টোন’ নামে জরুরি পরিকল্পনা মহড়ায় অংশ নিয়েছেন। এতে পরীক্ষা করা হচ্ছে, হরমুজ প্রণালি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে ব্রিটিশ শিল্প ও সরবরাহ ব্যবস্থায় কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
সম্ভাব্য চিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে জুন মাস পর্যন্ত প্রণালি বন্ধ থাকা, যুক্তরাষ্ট্র–ইরান শান্তিচুক্তির অনুপস্থিতি এবং দেশের কোনো একটি প্রধান কার্বন ডাই-অক্সাইড উৎপাদন কেন্দ্রের যান্ত্রিক ত্রুটি।
ব্রিটিশ ব্যবসামন্ত্রী পিটার কাইল বলেছেন, সরকার যে আগাম প্রস্তুতি নিচ্ছে, তা জনসাধারণের জন্য আশ্বস্ত হওয়ার মতো বিষয়। পরিকল্পনার তথ্য ফাঁস হওয়াকে তিনি “সহায়ক নয়” বলে মন্তব্য করেন।
‘এই মুহূর্তে কার্বন ডাই-অক্সাইড সরবরাহ নিয়ে অর্থনীতিতে কোনো উদ্বেগ নেই।’ - যোগ করেন তিনি।
খাদ্য খাতের নেতারা বলছেন, সরবরাহ সংকটের চেয়ে দাম বাড়ার আশঙ্কাই বেশি। ব্রিটিশ পোল্ট্রি কাউন্সিলের প্রধান নির্বাহী রিচার্ড গ্রিফিথস বলেছেন, ‘আমাদের সদস্যরা এখন পর্যন্ত কোনো সমস্যা জানাননি, তবে আমরা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি।’
ব্রিটিশ রিটেইল কনসোর্টিয়াম জানায়, খুচরা বিক্রেতারা সরবরাহ ব্যবস্থার ঝুঁকি মোকাবিলায় অভিজ্ঞ। তবে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এমন এক সময়ে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়াচ্ছে, যখন দেশীয় নীতির কারণে খরচ আগেই বেড়েছে।
দেশটির অন্যতম প্রধান সুপারমার্কেট টেসকোর প্রধান নির্বাহী কেন মারফিও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ কমানোর চেষ্টা করেন। তিনি বলেছেন, ‘এই মুহূর্তে আমাদের সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনো সমস্যা দেখা যাচ্ছে না... পণ্যের প্রাপ্যতায় কোনো ঘাটতি নেই। আমরা ভালো অবস্থানে আছি।’
তবে ভবিষ্যৎ দামের বিষয়ে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ‘পরিস্থিতি খুবই অস্থির ও অনিশ্চিত, এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না।’
গত মাসে সরকার কার্বন ডাই-অক্সাইড সরবরাহ নিশ্চিত করতে টিসাইডের এনসাস বায়োইথানল কারখানা সাময়িকভাবে চালু করে, যা আগে বন্ধ ছিল। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, তারা দেশের চাহিদা পূরণে সক্ষম থাকবে।
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। এর ফলে জ্বালানি ও সার তথা খাদ্য উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বিশ্বব্যাপী ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। জ্বালানির দাম বেড়ে গেছে এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) সতর্ক করেছে, এই সংঘাত বৈশ্বিক অর্থনীতিকে মন্দার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
ন্যাশনাল প্রিপেয়ার্ডনেস কমিশনের চেয়ারম্যান লর্ড টবি হ্যারিস বলেছেন, ‘বিশ্ব পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে আমাদের অপ্রত্যাশিত ঘটনার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।’
তিনি বলেছেন, ‘এই ধরনের ধাক্কা ভবিষ্যতে আরও ঘন ঘন আসবে। তাই বিভিন্ন পরিস্থিতিতে কীভাবে মোকাবিলা করা যায়, তা যত বেশি অনুশীলন করা যাবে, ততই ভালো।’
দ্য গ্রোসার পত্রিকার আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পাদক কেভিন হোয়াইট বলেছেন, কার্বন ডাই-অক্সাইড এমন একটি উপাদান, “যার গুরুত্ব মানুষ বোঝে না যতক্ষণ না সমস্যা হয়। তার মতে, খাদ্যপণ্যে মূল্যস্ফীতি “প্রায় অনিবার্য”।
তিনি বলেছেন, ‘সরবরাহকারী, কৃষক, পরিবহন খাত—সবারই লাভের মার্জিন খুব কম। বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি তারা সামাল দিতে পারে না, সেখান থেকেই মূল্যস্ফীতি তৈরি হয়।
ন্যাশনাল ফার্মার্স ইউনিয়ন সতর্ক করেছে, আগামী ছয় সপ্তাহে শসা ও টমেটোর দাম বাড়তে পারে। তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে অন্যান্য ফসল ও দুধের দামও বাড়তে পারে। ফুড অ্যান্ড ড্রিংক ফেডারেশন বলছে, ডিসেম্বরের মধ্যে খাদ্য মূল্যস্ফীতি অন্তত ৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
অ্যাগ্রিকালচারাল ইন্ডাস্ট্রিজ কনফেডারেশনের জো গিলবার্টসন বলেছেন, সার ও জ্বালানির দাম বেড়ে গেলে কৃষকেরা আগাম অর্ডার দিতে নিরুৎসাহিত হতে পারেন। তিনি সতর্ক করেন, এভাবেই শেষ পর্যন্ত খাদ্যসংকট তৈরি হতে পারে।
তবে সরকার ও খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, আপাতত তাৎক্ষণিক কোনো সংকট নেই। কেন মারফির ভাষায়, কোভিড ও ব্রেক্সিটের মতো একাধিক সংকট সামাল দেওয়ার অভিজ্ঞতা থাকায় প্রয়োজনে সরবরাহ ব্যবস্থা দ্রুত মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে।

