চার শতাব্দী ধরে জনপ্রিয় জাপানি থিয়েটার আর্ট ফর্ম কাবুকি

১২ এপ্রিল, ২০২৫ ওসাকা এক্সপোর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পারফর্ম করছেন কিকুগোরো ওনোয়ে অষ্টম (মাঝখানে)। তিনি তৎকালীন সময়ে কিকুনোসুক ওনোয়ে নামে পরিচিত ছিলেন। ছবি: এপি
জাপানের 'কাবুকি' প্রায় ৪০০ বছরের পুরোনো একটি ধ্রুপদী নাট্যশিল্প। নাটকীয় ভঙ্গি, জমকালো পোশাক ও বিশেষ মেকআপের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত শিল্পটি। ১৬০৩ সালের দিকে শুরু হলেও বর্তমানে জাপানের অন্যতম প্রধান সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য কাবুকি।
সর্বপ্রথম ২০০৫ সালে ইউনেস্কো কর্তৃক 'মাস্টারপিস অব দ্য ওরাল অ্যান্ড ইনট্যানজিবল হেরিটেজ অব হিউম্যানিটি' হিসেবে স্বীকৃতি পায় জাপানের কাবুকি থিয়েটার।
দেশটির ঐতিহ্যবাহী কাবুকি নাট্যশিল্প হাতবদল হয় প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। এই শিল্পে নাম-হস্তান্তর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি রীতি। এই অনুষ্ঠানটি কয়েক বছর পরপর মঞ্চে ও বিশেষ আয়োজনের মাধ্যমে উদযাপন করা হয়।
বর্তমানে ঐতিহাসিক এ ধারা অব্যাহত রেখে ঐতিহ্য অনুসারে অষ্টম কিকুগোরো নামটি হাত বদল করছে। ৮৩ বছর বয়সী সপ্তম কিকুগোরোর কাছ থেকে এই নাম তুলে দেওয়া হচ্ছে তার পুত্র ৪৮ বছর বয়সী কাজুয়াসুর কাছে। ৮৩ বছর বয়সী এই কাবুকি শিল্পীও কিকুগোরো নামটি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিলেন তার পিতার কাছ থেকে।
নতুন কিকুগোরো ৪৮ বছর বয়সী কাজুয়াসু তেরাজিমা নতুন পাওয়া এই নামের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে জানান, এই নাম গ্রহণ করা মানে শুধু একটি নাম নেওয়া নয়, বরং পূর্বপুরুষদের সৃষ্ট দায়িত্বকে ধারণ করা যা চলে আসছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে।
তার ভাষায়, একজন কাবুকি অভিনেতার কাজ হলো অতীত থেকে যা আমরা পেয়েছি, তাকে বর্তমান সময়ে নতুনভাবে উপস্থাপন করা। আর তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করা।
কিকুগোরোর মতোই কাবুকিতে আরেকটি বিখ্যাত পারিবারিক নাম হলো দানজুরো। এই নামের ত্রয়োদশ উত্তরাধিকারী ২০২২ সালে গ্রহণ করেন দানজুরো নামটি।
সতেরো শতক থেকে শুরু হওয়া কাবুকি আজও জাপানে অত্যন্ত জনপ্রিয়। সাম্প্রতিক সময়ে নির্মিত ২০২৫ সালে মুক্তি প্রাপ্ত ‘কোকুহ’ চলচ্চিত্রটি একজন জাপানিজ কাবুকি শিল্পীর জীবনের ওপর নির্মিত। চলচ্চিত্রটি সেরা মেকআপ ও চুলের সাজের জন্য পেয়েছে অস্কারে মনোনয়ন। ধারণা করা হচ্ছে যে, কাবুকি ফর্মের জনপ্রিয়তা বজায় আছে বলেই সিনেমাটির সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে পেরেছেন দর্শক ও সমালোচকরা। এটি জাপানের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি আয় করা লাইভ-পারফর্মেন্স ভিত্তিক চলচ্চিত্র।
কাবুকি শিল্প হলো থিয়েটারের একটি আর্ট ফর্ম। সাহসী সামুরাইদের প্রতিশোধের গল্প কিংবা সুন্দরী নারীর সাপ হয়ে যাওয়ার মতো স্থানীয় লৌকিক কাহিনিই হোক, কাবুকিতে উপস্থাপন করা হয় জাপানি জীবন ধারার বৈচিত্র্যময় গল্প।
এতে থাকে সংগীত, নৃত্য ও অভিনয়ের সমন্বয়। কাবুকির সঙ্গে কিছুটা মিল পাওয়া যায় বাংলা পালা গানের। কিংবা অনেকটা মিল খুঁজে পাওয়া যায় হারিয়ে যাওয়া ঘেঁটু গানেরও। মজার ব্যাপার হলো, কাবুকির উদ্ভাবক ছিলেন ইজুমো নো ওকুনি নামের একজন নারী। ১৬০৩ সালের দিকে তিনি ও তার নারী দলটি প্রথম কিয়োটোতে এই পারফরম্যান্স শুরু করেন।
তবে, একসময় কাবুকি পারফর্মেন্সে সব চরিত্রেই অভিনয় করতে শুরু করেন পুরুষ অভিনেতারা। ১৬২৯ সালে জাপানের তৎকালীন শোগুন সরকার নারীদের কাবুকি পারফর্ম নিষিদ্ধ করে দেয় নৈতিক অবক্ষয় ও বিশৃঙ্খলার অজুহাতে। এরপর থেকে বহু বছরের জন্য কাবুকি পরিণত হয় পুরুষ-শাসিত শিল্পে। পরে ১৯ শতকের শেষ দিকে নারীদের ওপর থেকে তুলে নেওয়া হয় এই আইনি নিষেধাজ্ঞা। বর্তমানে কাবুকি পারফর্মেন্সে দেখা যায় নারীদের অংশগ্রহণও।
কাবুকি শিল্পীরা কোনো গল্প তুলে ধরার আগে ব্যবহার করেন রঙিন পোশাক ও ভারি মেকআপ। সেই একই রীতি আমরা দেখতে পাই অন্য অনেক দেশের অনুরূপ শিল্পরূপেও।
যেসব পুরুষ অভিনেতা নারীর চরিত্রে অভিনয় করেন, তাদের বলা হয় ‘ওন্নাগাতা’। আবার কিকুগোরোর মতো কিছু অভিনেতা নারী ও পুরুষ দুই ধরনের চরিত্রই করে থাকেন।
পশ্চিমা দর্শকদের কাছে কাবুকির সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো, এখানে বাস্তব জীবনের আচরণ অনুকরণের কোনো চেষ্টা নেই। অভিনয়ের মাঝখানে অভিনেতারা কিছুটা অতি-নাটকীয় ভঙ্গিতে থেমে বিশেষ ভঙ্গি নেন। এই রীতিকে বলা হয় ‘মিয়ে’। এর মাধ্যমে সাহস বা উত্তেজনার অনুভূতি প্রকাশ করা হয়। এই মুহূর্তগুলোকে বিশেষ ছন্দে কাঠের টোকা দিয়ে করা হয় আরও জোরালো।
মঞ্চে সংলাপগুলো প্রায়ই বলা হয় সুরেলা কবিতার মতো করে। মঞ্চে সরাসরি পরিবেশন করা হয় সংগীত। যা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে কাবুকি শিল্পের উপযুক্ত আবহ তৈরিতে। যেমন বড় ঢোলের গর্জনের ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক তৈরি করে বজ্রধ্বনির আবহ। আবার মৃদু বাজনায় সৃষ্টি হয় তুষারপাতের অনুভূতি। ঘণ্টার শব্দে ফুটে ওঠতে দেখা যায় উড়ন্ত প্রজাপতির ছবি।
কাবুকির মঞ্চসজ্জাও অত্যন্ত চমকপ্রদ। ঘূর্ণায়মান মঞ্চ, কৃত্রিম চেরি গাছ থেকে ঝরে পড়া গোলাপি পাপড়ি, সব মিলিয়ে এক অনন্য অভিজ্ঞতা দর্শকের কাছে। কখনো কখনো তারের সাহায্যে অভিনেতারা আকাশে ঝুলে অভিনয় করেন। যেমন শিয়ালের চরিত্রে আনন্দে মজা করে নাচা।
কাবুকির আরেকটি মজার দিক হলো, মঞ্চের সামনেই চরিত্র ও পোশাক বদলানো। একজন মানুষ মুহূর্তেই পোশাক বদলে রূপ নেন দানবে। আবার মুহূর্তে পরিণত হতে পারেন দেবদূতে। এই কাজে সাহায্য করেন কালো পোশাক পরা মঞ্চ সহকারীরা। যাদের বলা হয় ‘কুরোগো’। কুরোগোরা মিশে থাকতে পারেন মঞ্চের আলো-আঁধারে।
কাবুকির সঙ্গে মিল পাওয়া যায় শেক্সপিয়রের নাটকেরও। যেমন 'সোনেজাকিতে প্রেমিক যুগলের আত্মহত্যা বা দ্যা লাভ সুইসাইড এট সোনেজাকি' নামের একটি জনপ্রিয় নাটক, যেখানে দুই প্রেমিক-প্রেমিকা একসঙ্গে মৃত্যুবরণ করেন। কাহিনিটি অনেকটা ‘রোমিও ও জুলিয়েটের’ মতো।
তবে মজার ব্যাপার হলো, এই মিল সম্পূর্ণ কাকতালীয়। এই নাটকের রচয়িতা চিকামাতসু মনজায়েমন জাপানের বিচ্ছিন্নতাবাদী যুগে বাস করতেন। ধারণা করা হয়, তিনি শেক্সপিয়রের লেখা কখনো পড়েনইনি।
নতুন কিকুগোরো কাজুয়াসি তেরাজিমা জানান, তার জন্য কিকুগোরো হওয়া ছিল তার জন্মগত নিয়তি। ছোটবেলা থেকেই তিনি নিয়েছেন প্রশিক্ষণ। এতে কখনোই কোনো দ্বিধা ছিল না তার।
তার ভাষ্য, আমি আমার পূর্বপুরুষদের গভীরভাবে ভালোবাসি ও শ্রদ্ধা করি। তারা যে অসাধারণ কাজ সৃষ্টি করেছেন, যা আজও মানুষ ভালোবাসে, তার জন্য আমি কৃতজ্ঞ। এমন একটি পরিবারে জন্ম নিতে পেরে আমি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করি।
পাশে বসেছিল তার ১২ বছর বয়সী ছেলে কাজুফুমি। ভবিষ্যতে তার বাবার নাম গ্রহণ করবে ছেলেটি। প্রজন্ম ধরে নামগুলো পরিবারের তরুণদের মধ্যে হস্তান্তরিত হয়ে আসছে এভাবেই।
কাজুফুমি জানায়, কাবুকি অভিনয় ভালোবাসে সে। তবে অন্য সাধারণ শিশুদের মতো ভিডিও গেমও পছন্দ তার। জাপানি ব্যান্ডের গানও ভালো লাগে তার।
কাবুকি শিল্পীদের মতে, বেশ কঠিন এই পেশা। শরীরের নমনীয়তা ধরে রাখতে প্রতিদিন সকালে দৌঁড়াতে হয় তাদের। খাদ্যনিয়ন্ত্রণ ও নিয়ম করে দ্রুত ঘুমানো এই শিল্পের অংশ।
তেরাজিমা আরও জানান, শুধু শারীরিক নয়, মানসিক দিক থেকেও এই কাজটি কঠিন। কখনো কখনো আমি অনেক রেগে যেতাম। এমনও হয়েছে— বাবা-মায়ের ওপর ঝেড়েছি সব রাগ।
গবেষক জেমস আর ব্র্যান্ডনের বর্ণনায়, কাবুকি এমন এক নাট্যরূপ যেখানে অভিনয়ই মূল ভিত্তি। নাট্যকার ও অভিনেতা একসঙ্গে একটি অনন্য শৈলী তৈরি করেন বলে মত তার।
জাপানি ঐতিহ্যে প্রতিটি কাজেরই থাকে নির্দিষ্ট পদ্ধতি। আর সেই পদ্ধতিই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য হয়ে ওঠে আদর্শ।
অনেকে জাপানিজ কাবুকির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হলেও নতুন কিকুগোরো বিশ্বাস করেন, এই শিল্পের প্রয়োজন নেই মূল কাঠামো পরিবর্তনের। মানুষের প্রতি সহমর্মিতা এবং একে অপরের প্রতি যত্নশীলতার যে মানবিক বার্তা, সেটাই তিনি তুলে ধরতে চান কাবুকি শিল্পের মাধ্যমে।



