যুক্তরাজ্যে আশ্রয় পেতে ‘সমকামিতা’ দাবি, আলোচনায় পাকিস্তান-বাংলাদেশ

ছবি: সংগৃহীত
অভিবাসীদের ভুয়া আশ্রয় দাবির অভিযোগে তদন্ত শুরু করেছে যুক্তরাজ্য সরকার। বিবিসির এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দেখা গেছে, কিছু অভিবাসীকে সমকামী বা গৃহসহিংসতার শিকার বলে মিথ্যা দাবি করতে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। যাতে তারা যুক্তরাজ্যে থাকতে পারেন।
তবে তদন্ত শুধু বাংলাদেশ বা পাকিস্তানের নাগরিকদের ঘিরে নয়; পুরো আশ্রয়ব্যবস্থার সম্ভাব্য অপব্যবহারই খতিয়ে দেখছে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ।
যদিও সমকামিতার ভিত্তিতে আশ্রয় চাওয়ার ক্ষেত্রে পাকিস্তানিদের নাম সবচেয়ে বেশি উঠে এসেছে, এরপর রয়েছে বাংলাদেশিদের নাম।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর জানিয়েছে, আশ্রয়প্রার্থীদের আবেদন যাচাইয়ে ‘কঠোর সুরক্ষা ব্যবস্থা’ রয়েছে। যাতে প্রতিটি দাবি ‘যথাযথ ও ন্যায্যভাবে যাচাই’ করা হয়।
প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র বলেছেন, ‘বিবিসির প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগগুলো তদন্ত করছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও ইমিগ্রেশন অ্যাডভাইস অথরিটি, যাতে অভিবাসনব্যবস্থার সম্ভাব্য অপব্যবহারকারীদের জবাবদিহির আওতায় আনা যায়।’
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আগে থেকেই সমকামী পরিচয়ের ভুয়া দাবি এবং গৃহসহিংসতার শিকারদের সুরক্ষার জন্য থাকা নিয়মের অপব্যবহারের অভিযোগ খতিয়ে দেখছিল। এখন বিবিসির প্রতিবেদনে উঠে আসা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোকেও তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে।
বিবিসির অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ভিসার মেয়াদ শেষ হতে চলা অভিবাসীদের ভুয়া গল্প সাজিয়ে দেওয়া হচ্ছে এবং জাল প্রমাণ তৈরির কৌশল শেখানো হচ্ছে। এসব প্রমাণের মধ্যে রয়েছে সমর্থনপত্র, ছবি ও চিকিৎসাসংক্রান্ত নথি।
কিছু ক্ষেত্রে আইনজীবী প্রতিষ্ঠান ও পরামর্শদাতারা হাজার হাজার পাউন্ড নিয়ে অভিবাসীদের এমনভাবে পরামর্শ দিচ্ছেন, যাতে তারা সমকামী পরিচয় দাবি করে নিজ দেশে ফিরে গেলে প্রাণনাশের আশঙ্কার কথা তুলে আশ্রয় চাইতে পারেন। এই ধরনের আবেদনের ক্ষেত্রে পাকিস্তানের পরই বাংলাদেশের নাম বেশি এসেছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, গৃহসহিংসতার শিকারদের দ্রুত স্থায়ী বসবাসের সুযোগ দিতে যে নিয়ম করা হয়েছে, সেটিও কেউ কেউ অপব্যবহার করছেন। কিছু ক্ষেত্রে অভিবাসীরা ব্রিটিশ নাগরিকদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে বা বিয়ে করে পরে যুক্তরাজ্যে এসে ভুয়া নির্যাতনের অভিযোগ তুলছেন।
গৃহসহিংসতার ভিত্তিতে দ্রুত বসবাসের অনুমতি চাওয়ার আবেদন এখন বছরে ৫ হাজার ৫০০ ছাড়িয়েছে, যা তিন বছরে ৫০ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র বলেছেন, প্রকৃত গৃহসহিংসতার শিকারদের সুরক্ষার জন্য তৈরি ব্যবস্থার অপব্যবহার লজ্জাজনক এবং সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট করেছেন, যারা প্রতারণার মাধ্যমে যুক্তরাজ্যে থাকার চেষ্টা করবে, তাদের আবেদন বাতিল করা হবে এবং একমুখী বিমানে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হবে।
যেখানে অনৈতিক বা অবৈধ কার্যকলাপের প্রমাণ পাওয়া যাবে, সেখানে সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার মাধ্যমে আইনজীবীদের বিরুদ্ধে পুলিশি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে এই তদন্তের সময়সীমা জানানো হয়নি।
আশ্রয় আবেদন যথাযথভাবে যাচাই হচ্ছে কি না? এ প্রশ্নে মুখপাত্র বলেছেন, আশ্রয়ব্যবস্থায় শক্তিশালী সুরক্ষা রয়েছে। প্রতিটি আবেদন কঠোরভাবে ও ন্যায্যভাবে যাচাই করা হয়, অপব্যবহার চিহ্নিত করা হয় এবং এসব প্রক্রিয়া নিয়মিত পর্যালোচনা করা হয়।
যুক্তরাজ্যের ইমিগ্রেশন সার্ভিসেস কমিশনার গাওন হার্ট বলেছেন, এ ক্ষেত্রে ‘ব্যবস্থার জঘন্য অপব্যবহার’ হচ্ছে এবং কিছু পরামর্শদাতা পুরো খাতের সুনাম ক্ষুণ্ন করছেন।
বিবিসি রেডিও ফোরের টুডে অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, ‘যেখানে লোভের সুযোগ থাকে, সেখানে অপব্যবহার হবেই এবং আমরা তা মোকাবিলা করব।’
তিনি জানান, গত বছর অনিয়ন্ত্রিত পরামর্শ ও ব্যবস্থার অপব্যবহারের অভিযোগে উল্লেখযোগ্য ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সন্দেহভাজন কিছু ঘটনা কমিশনে পাঠিয়েছে এবং তদন্ত ও বিচার কার্যক্রম জোরদারে অর্থায়ন বাড়ানো হচ্ছে। তবে তিনি বলেন, এই ব্যবস্থায় ‘আরও স্পষ্টতা ও সরলতা’ প্রয়োজন এবং অনিয়মের সন্দেহ থাকলে তা জানাতে সবার প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
২০২৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর লেবার পার্টি-নেতৃত্বাধীন সরকার অবৈধ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ ও আশ্রয়ব্যবস্থা সংস্কারকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। তবে কঠোরতা ও মানবিক সুরক্ষার মধ্যে ভারসাম্য রাখা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
বিবিসির প্রতিবেদনের পর বিরোধী দলগুলোর প্রতিক্রিয়াও এসেছে। কনজারভেটিভ পার্টির ছায়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস ফিলিপ বলেছেন, ‘আশ্রয়ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণভাবে ঢেলে সাজাতে হবে, যাতে কেবল প্রকৃত নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিরাই আশ্রয় পান।’
লিবারেল ডেমোক্র্যাটস নেতা উইল ফস্টার বলেছেন, ‘এটি জঘন্য। আমাদের এমন একটি আশ্রয়ব্যবস্থা দরকার, যা ন্যায্য, নিয়ন্ত্রিত ও কার্যকর—কনজারভেটিভরা যে বিশৃঙ্খল অবস্থা রেখে গেছে, তা নয়।’
রিফর্ম ইউকে বলেছে, তারা ক্ষমতায় এলে ভুয়া আশ্রয় দাবিতে সহায়তাকে ফৌজদারি অপরাধ করে আইন করবে; এতে উদ্দেশ্য প্রমাণের দরকার হবে না এবং সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড হতে পারে।
অন্যদিকে গ্রিন পার্টির মতে, বিবিসির প্রতিবেদন ‘বাস্তবে আশ্রয়প্রার্থীদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ব্যবস্থাকে ভুলভাবে উপস্থাপন করেছে এবং এতে তাদের প্রতি ‘বিরূপ পরিবেশ’ আরও বাড়তে পারে।

