একটি নয়, এনসিপির নজর সংরক্ষিত ৩ আসনে
- ৬ সাধারণ আসনের বিপরীতে বরাদ্দ একটি সংরক্ষিত আসন
- আনুপাতিক নয়, যুক্তি বা চুক্তির সমীকরণে বাড়তি চাওয়া
- খতিয়ে দেখা হচ্ছে অতিরিক্ত আসন দেওয়ার আইনগত দিক
- বিএনপি ৩৬, জামায়াত ঐক্য ১৩, স্বতন্ত্ররা পাবে ১টি আসন

জাতীয় সংসদে প্রতিনিধির সংখ্যা ৬ থেকে বাড়িয়ে ৯ জন করতে চায় জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। নিয়ম অনুযায়ী একটি মাত্র সংরক্ষিত নারী আসন প্রাপ্য দলটির। কিন্তু আরও দুটি আসন পেতে দেন-দরবার শুরু করেছে তারা।
এনসিপির বেশ কয়েকজন নেতা বলছেন, হিসাব-নিকাশ চলছে জামায়াতের সঙ্গে। শিগগিরই নিশ্চিত হওয়া যাবে তিনটি সংরক্ষিত আসন পাওয়ার বিষয়টি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ছয়টি আসনে জিতে প্রথমবারের মতো সংসদে গেছে এনসিপি। অবশ্য দল হিসেবেও এটি তাদের প্রথম নির্বাচন, কেননা দলটির জন্মই হয়েছে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে।
আওয়ামী লীগ সরকার পতনে অবদানের প্রেক্ষাপটে ভোটের মাঠেও বেশ গুরুত্বপূর্ণ ছিল এনসিপি। তবে জামায়াতের সঙ্গে জোট গঠনের পর পড়তে হয় জোর নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার মুখে। দল ছাড়েন বেশ কয়েকজন জনপ্রিয় ছাত্রনেতা। নানা সমালোচনার মুখে পড়লেও জামায়াতের সঙ্গ ছাড়েনি নাহিদ ইসলামের দল।
আর এখন সেই দলটির কাছ থেকেই নিতে চায় বিশেষ সুবিধা, সেটি হলো আরও দুটি সংরক্ষিত নারী আসন।
নির্বাচন কমিশনের তফসিল অনুযায়ী সংরক্ষিত নারী আসনের ভোট হবে আগামী ১২ মে। যদিও আসলে নামেই ভোট, আদতে দলগুলো একজনকেই মনোনয়ন দেয়, নির্বাচিত হন তিনিই। তাই নারী আসনের এই সংরক্ষিত সদস্যদের ভোটে বিজয়ী না বলে মনোনয়নদৌড়ে বিজয়ী বলাই শ্রেয়।
জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসন ৫০টি। সে হিসেবে প্রতি ছয়জন সাধারণ সদস্যের বিপরীতে একটি সংরক্ষিত নারী আসন পায় দলগুলো।
এই অঙ্কে বিএনপি জোট ৩৬, জামায়াত জোট ১৩ এবং স্বতন্ত্ররা মিলে পাবে ১টি সংরক্ষিত আসন। আর জামায়াতের জোটে থাকা এনসিপির ছয়টি আসনের বিপরীতে পাওয়ার কথা একটি।
কিন্তু এনসিপি একটি নয়, অন্তত নিশ্চিত করতে চায় তিনটি আসন। কোন যুক্তিতে বা কোন চুক্তিতে জামায়াতের কাছ থেকে তারা বাড়তি দুটি আসন নেবে, সেটাই এখন আলোচনার বিষয়।
যারা নির্বাচন করেননি এবং দলের বিভিন্ন জায়গায় এবং নির্বাচনকালীন সময়ে রেখেছেন ভূমিকা, তাদেরই মনোনয়ন দেওয়া উচিত। কারণ, যারা নির্বাচন করেছেন, তারা তো পেয়েছেন নানা সুবিধা
এরই মধ্যে জোটে প্রাথমিক সমঝোতা হয়েছে বলে আগামীর সময়কে নিশ্চিত করেছেন জামায়াত-এনসিপির কয়েকজন নেতা। তবে আনুপাতিক হিসাবের বাইরে অতিরিক্ত আসন দেওয়া আইনগতভাবে সম্ভব কি না, এখন খতিয়ে দেখা হচ্ছে সে বিষয়টিই।
কারা হচ্ছেন এনসিপির তিন নারী সংসদ সদস্য?
দলের কয়েকজন নেতা বলছিলেন, মনোনয়নদৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে আছেন যুগ্ম আহ্বায়ক ও জাতীয় নারী শক্তির আহ্বায়ক মনিরা শারমিন, দলের যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. মাহমুদা আলম মিতু এবং যুগ্ম আহ্বায়ক নুসরাত তাবাসসুম।
তাদের মধ্যে সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনে দলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করেছিলেন মনিরা। মাহমুদা মিতু ঝালকাঠি-১ আসনে মনোনয়ন পেলেও জোটের স্বার্থে সরে দাঁড়ান, কাজ করেন সক্রিয়ভাবে।
অন্যদিকে নুসরাত বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম নারী সমন্বয়ক ও পরিচিত মুখ। জুলাই অভ্যুত্থানের সময় ডিবি হেফাজতে নেওয়াদের মধ্যে তিনিই ছিলেন একমাত্র নারী।
অবশ্য আলোচনায় রয়েছে দলটির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন, হুমায়রা নুর, দিলশানা পারুল এবং নাবিলা তাসনিদের নামও।
এনসিপিকে কিছুটা বাড়তি সুযোগ দেওয়া হলে তা দীর্ঘ মেয়াদে প্রভাব ফেলতে পারে ইতিবাচক
এনসিপির যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আরিফুর রহমান তুহিন বলছিলেন, এনসিপি থেকে সংরক্ষিত আসনে একাধিক নারী সংসদে যেতে পারেন। প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে, দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও সদস্য সচিব আখতার হোসেন জোটসঙ্গীদের সঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নেবেন চূড়ান্ত।
সমঝোতার আভাস পাওয়া গেল জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জোবায়েরের কণ্ঠেও।
এনসিপিকে সহযোগিতার বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে বলেও জানালেন তিনি।
মনোনয়নদৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে আছেন যুগ্ম আহ্বায়ক ও জাতীয় নারী শক্তির আহ্বায়ক মনিরা শারমিন, দলের যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. মাহমুদা আলম মিতু এবং যুগ্ম আহ্বায়ক নুসরাত তাবাসসুম
সংসদে তুলনামূলক সক্রিয় ও কার্যকর ভূমিকা রাখছেন এনসিপির তরুণ সদস্যরা। প্রথম অধিবেশনেই বিভিন্ন জাতীয় ইস্যুতে বক্তব্য ও প্রস্তাব দিয়ে আলোচনায় এসেছেন তারা।
কেউ কেউ মনে করেন, সংসদে এনসিপির প্রতিনিধিত্ব বাড়লে তা রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য হবে ইতিবাচক।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাহবুবুর রহমানের মতে, সংসদে কার্যকর বিরোধী ভূমিকা নিশ্চিত করতে হলে শুধু সংখ্যা নয়, গুণগত উপস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ।
‘সেই জায়গা থেকে এনসিপির তরুণ সদস্যরা এরই মধ্যে ইঙ্গিত দিয়েছেন সম্ভাবনার। জোটের পক্ষ থেকে যদি তাদের দু-তিনটি সংরক্ষিত নারী আসন বাড়িয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা শুধু দলটির জন্যই নয়, সামগ্রিকভাবে বিরোধী শিবিরের অবস্থান করবে আরও শক্তিশালী’
সংসদে নতুন ও কর্মক্ষম মুখের উপস্থিতি বাড়লে বিতর্কের মান হয় উন্নত- এমনটিই মনে করেন এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক। তার মতে, এতে জনগণের প্রত্যাশার প্রতিফলনও বেশি দেখা যায়।
আগামীর সময়কে তিনি বললেন, ‘সে বিবেচনায় এনসিপিকে কিছুটা বাড়তি সুযোগ দেওয়া হলে তা দীর্ঘ মেয়াদে প্রভাব ফেলতে পারে ইতিবাচক।’
সম্ভবত, সেসব দিকও আসন ছাড়ার ক্ষেত্রে মাথায় রাখছে জামায়াত। মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে এনসিপি কোন বিষয়টিকে প্রাধান্য দিচ্ছে, তা জানতে কথা হয় এক শীর্ষ নেতার সঙ্গে।
তিনি মনে করেন, যারা নির্বাচন করেননি এবং দলের বিভিন্ন জায়গায় এবং নির্বাচনকালীন সময়ে রেখেছেন ভূমিকা, তাদেরই মনোনয়ন দেওয়া উচিত। কারণ, যারা নির্বাচন করেছেন, তারা তো পেয়েছেন নানা সুবিধা।
‘যারা নির্বাচনের আগে জোটের বিরোধিতা করেছে, দলকে ধ্বংসের নেতৃত্ব দিয়েছে, তাদের নিয়ে অস্বস্তি আছে। তাদেরই সুযোগ করে দেওয়া কোনোভাবেই উচিত নয়। এটা করা হলে দলের মধ্যে বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে,’ যোগ করেন তিনি।

