মরে যাওয়ার পরও কি বেঁচে থাকা যায়?

ছবি: বিবিসি
একদিন হঠাৎ করেই বেথ হান্টার বুঝতে পারলেন, তার বাবাকে তিনি ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলছেন। আলঝেইমার রোগ মানুষের স্মৃতিকে যেমন কেড়ে নেয়, তেমনি কেড়ে নেয় পরিচিত মুখ। আরও কেড়ে নেয় পরিচিত গল্প আর পরিচিত সম্পর্কের অনুভূতিও। বাবার রোগ ধরা পড়ার পর বেথের মনে হলো— একটি কাজ অন্তত করা দরকার। তিনি বাবার সঙ্গে একটি দীর্ঘ কথোপকথন রেকর্ড করে রাখতে চাইলেন। যেন ভবিষ্যতের কোনো এক নিঃসঙ্গ বিকালে সেই কণ্ঠস্বর আবার শুনতে পারেন। কিন্তু বাবা রাজি হলেন না।
মৃত্যু, বিচ্ছেদ কিংবা অনুভূতির কথা বলতে তিনি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন না। বরং তিনি বেছে নিলেন অন্য পথ। নিজের জীবনের যুদ্ধের গল্পগুলো লিখতে শুরু করলেন। হাতে লিখলেন, পরে সেগুলো টাইপ করালেন। তার বিশ্বাস ছিল, মৃত্যুর পর তার রেখে যাওয়ার মতো সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস হলো এই গল্পগুলো। হয়তো তখনো তিনি জানতেন না, তিনি আসলে নিজের উত্তরাধিকার লিখে যাচ্ছেন।
আমরা সাধারণত মনে করি উত্তরাধিকার বা ‘লিগ্যাসি’ হলো ধনী মানুষের বিষয়। বিশাল সম্পত্তি, কোনো বিখ্যাত বই, একটি স্মৃতিস্তম্ভ কিংবা এমন কিছু, যা মানুষ শত বছর পরও মনে রাখবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রত্যেক মানুষই কিছু না কিছু রেখে যায়। কেউ রেখে যায় একটি নাম, কেউ একটি গল্প, কেউ একটি শিক্ষা, আবার কেউ রেখে যায় এমন কিছু মূল্যবোধ, যা তার মৃত্যুর পরও অন্য মানুষের জীবনে কাজ করে যায়।
গবেষকরা বলছেন, মজার বিষয় হলো— উত্তরাধিকার শুধু মৃত্যুর পরের কোনো বিষয় নয়। বরং এটি জীবিত মানুষের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমরা কী রেখে যেতে চাই, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমরা আসলে বুঝতে পারি, কীভাবে বাঁচতে চাই এবং সেই উত্তরই অনেক সময় জীবনের অর্থ খুঁজে পেতে সাহায্য করে।
মৃত্যু নিয়ে মানুষ সবসময়ই অস্বস্তিতে থাকে। কেউ মুখোমুখি হতে চায় না, কেউ আলোচনা করতে চায় না। কিন্তু পৃথিবীর সবচেয়ে নিশ্চিত সত্যটিকে এড়িয়ে যাওয়াও সম্ভব নয়।
ডিউক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কিম্বার্লি ওয়েড-বেনজোনি বলেছেন, ‘মানুষের উত্তরাধিকার রেখে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষার গভীরে আসলে মৃত্যুভয় কাজ করে। যখন মানুষ উপলব্ধি করে যে একদিন তাকে চলে যেতে হবে, তখন তার মনে প্রশ্ন জাগে— ‘তারপর কী?’ আমি চলে গেলে কী থাকবে? কেউ কি আমাকে মনে রাখবে? আমার জীবন কি কোনো অর্থ বহন করবে?
এই প্রশ্নগুলো শুনতে বিষণ্ন মনে হলেও গবেষকরা বলছেন, এগুলো সব সময় নেতিবাচক নয়। বরং উত্তরাধিকার নিয়ে ভাবা মানুষকে ‘মৃত্যুভীতি’ থেকে ‘মৃত্যুচিন্তন’-এর দিকে নিয়ে যায়। অর্থাৎ মৃত্যু নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার বদলে মানুষ ভাবতে শেখে, তার জীবনকে কীভাবে আরও অর্থবহ করা যায়।
এ কারণেই আজকাল অনেক হাসপাতাল ও হসপিসে মৃত্যুপথযাত্রী রোগীদের জন্য বিশেষ ‘লিগ্যাসি প্রজেক্ট’ চালু করা হয়েছে। কেউ নিজের সন্তানের জন্য একটি চিঠি লেখেন। কেউ একটি ডায়েরি রেখে যান। আবার কেউ বা নিজের জীবনের শিক্ষা লিখে রেখে যান একটি ‘এথিক্যাল উইল’-এ।
গবেষণায় দেখা গেছে, এসব কাজ মানুষকে জীবনের শেষ সময়ে শান্তি দেয়। কমায় উদ্বেগ ও বিষণ্নতা। কারণ তখন তারা অনুভব করতে পারেন, তাদের জীবন শুধু শেষ হয়ে যাচ্ছে না; কিছু একটা থেকে যাচ্ছে। তবে উত্তরাধিকার মানেই শুধু মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে করা কোনো কাজ নয়। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ সবচেয়ে বেশি যা রেখে যেতে চায়, তা সম্পদ নয়— মূল্যবোধ।
একজন মা হয়তো কোনো দিন বড় বই লেখেননি। তার নামে কোনো ভবনও নেই। কিন্তু তিনি যদি সন্তানকে শিখিয়ে যান মানুষের কষ্ট বুঝতে, তাহলে সেটিও এক ধরনের উত্তরাধিকার। একজন শিক্ষক হয়তো কোটি টাকা রেখে যেতে পারবেন না। কিন্তু তার কোনো ছাত্র যদি জীবনের কঠিন মুহূর্তে তার শেখানো একটি বাক্য মনে করে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়, সেটিও একটি উত্তরাধিকার। একজন সাংবাদিক, একজন চিকিৎসক, একজন কৃষক কিংবা একজন রিকশাচালক— প্রত্যেকের জীবনেই এমন কিছু থাকে। যা তার মৃত্যুর পরও অন্য মানুষের মধ্যে বেঁচে থাকতে পারে।
সম্ভবত এ কারণেই মানুষ শুধু বেঁচে থাকতে চায় না, মনে রাখাও চায়।
নিউজিল্যান্ডের মনোবিজ্ঞানী জেসি বেরিং বলেছেন, ‘মানুষ নিজের জীবনকে একটি গল্পের মতো কল্পনা করে। আমরা নিজেদের সেই গল্পের প্রধান চরিত্র ভাবি। আর স্বাভাবিকভাবেই চাই, গল্পের শেষে যেন কোনো অর্থ থাকে, কোনো শিক্ষা থাকে, কোনো বার্তা থাকে।’
হয়তো এ কারণেই পৃথিবীর প্রায় সব সংস্কৃতিতে মানুষ গল্প বলে, স্মৃতি লিখে রাখে, ছবি তোলে, সন্তানদের উপদেশ দেয়, কিংবা কোনো না কোনোভাবে নিজের অস্তিত্বের চিহ্ন রেখে যেতে চায়। কারণ আমরা জানি, শরীর একদিন হারিয়ে যাবে। কিন্তু গল্পগুলো থেকে যেতে পারে।
এই ভাবনার আরেকটি দিকও আছে। গবেষকরা বলছেন, উত্তরাধিকার নিয়ে ভাবা শুধু মৃত্যুর পরের বিষয় নয়; এটি বর্তমান জীবনকেও বদলে দিতে পারে। যখন একজন মানুষ নিজেকে প্রশ্ন করে— ‘আমি কী রেখে যেতে চাই?’ তখন সে অনিবার্যভাবে আরেকটি প্রশ্নের মুখোমুখি হয়— ‘তাহলে আজ আমি কী করছি?’ যদি কেউ চায় মানুষ তাকে একজন সৎ ব্যক্তি হিসেবে মনে রাখুক, তাহলে তাকে আজ সৎ হতে হবে।
যদি কেউ চায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পৃথিবীকে একটু ভালো রেখে যেতে, তাহলে তাকে আজ পরিবেশ রক্ষার কথা ভাবতে হবে। যদি কেউ চায় মৃত্যুর পর মানুষ তার মানবিকতার কথা বলুক, তাহলে তাকে আজ মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। অর্থাৎ উত্তরাধিকার ভবিষ্যতের বিষয় হলেও, তার ভিত্তি তৈরি হয় বর্তমানের প্রতিটি সিদ্ধান্তে। সম্ভবত এ কারণেই গবেষকরা তরুণদেরও উত্তরাধিকার নিয়ে ভাবতে বলছেন। কারণ এটি কোনো বৃদ্ধ বয়সের প্রকল্প নয়। এটি জীবনের প্রকল্প।
অনেকেই মনে করেন, বড় কিছু না করলে কোনো উত্তরাধিকার তৈরি হয় না। কিন্তু ইতিহাস বলছে, সবচেয়ে গভীর উত্তরাধিকারগুলো অনেক সময় সবচেয়ে নীরব। একজন বাবা প্রতিদিন সৎভাবে সংসার চালিয়েছেন। একজন মা শত কষ্টের মধ্যেও সন্তানকে মানুষ করেছেন। একজন শিক্ষক হাজারো শিক্ষার্থীর জীবনে আলো জ্বালিয়েছেন। একজন বন্ধু বিপদের দিনে পাশে থেকেছেন। এগুলো হয়তো ইতিহাসের বইয়ে লেখা হবে না। কিন্তু মানুষের হৃদয়ে লেখা থাকবে। আর শেষ পর্যন্ত মানুষের হৃদয়ের চেয়ে বড় কোনো স্মৃতিস্তম্ভ কি আছে? হয়তো নেই। তাই প্রশ্নটা আসলে মৃত্যুর পর মানুষ আপনাকে মনে রাখবে কি না, সেটি নয়। প্রশ্নটা হলো— কীভাবে মনে রাখবে? আপনার রেখে যাওয়া সম্পদের জন্য? নাকি আপনার রেখে যাওয়া মূল্যবোধের জন্য?
আমরা কেউই জানি না মৃত্যুর পর আমাদের নাম কতদিন বেঁচে থাকবে। হয়তো একসময় সবাই ভুলেও যাবে। কিন্তু একজন মানুষের জীবনে যদি আমরা একটু আলো রেখে যেতে পারি, একটি ভালো শিক্ষা, একটি সাহসী সিদ্ধান্ত বা একটি মানবিক আচরণ রেখে যেতে পারি— তাহলে সেটিও কম কিছু নয়। কারণ শেষ পর্যন্ত জীবনকে শুধু বছর দিয়ে মাপা যায় না। মাপা যায় প্রভাব দিয়ে। আর সেই প্রভাবই হয়তো মানুষের সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার।
একদিন আমরা সবাই চলে যাব। আমাদের ঘর, বই, পোশাক, ছবি— সবই ধীরে ধীরে অন্য কারও হয়ে যাবে। কিন্তু যদি আমাদের কারণে কোনো মানুষ একটু ভালো হয়, একটু সাহসী হয়, একটু বেশি মানবিক হয়— তাহলে আমাদের একটি অংশ হয়তো থেকে যাবে তার ভেতরে। আর সেটিই হয়তো মৃত্যুর পরও বেঁচে থাকার সবচেয়ে সুন্দর উপায়।










