এক নজরে হজ
ইহরাম থেকে বিদায়ী তাওয়াফ: আত্মশুদ্ধির এক মহাযাত্রা

প্রতীকী ছবি
হজ শুধু একটি ইবাদত নয়; এটি একজন মানুষের আত্মা, চিন্তা ও জীবনের পূর্ণাঙ্গ রূপান্তরের এক মহাসফর। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে লাখ লাখ মানুষ যখন একই পোশাকে, একই তাসবিহে, একই আহ্বানে সাড়া দিয়ে কাবার দিকে ছুটে আসে, তখন সেখানে জাতি, বর্ণ, ভাষা কিংবা সম্পদের সব পার্থক্য মুছে যায়। মানুষ ফিরে যায় আদম (আ.)-এর সন্তান মানব পরিচয়ে। হজের প্রতিটি ধাপের মধ্যে লুকিয়ে আছে আত্মসমর্পণ, ধৈর্য, ত্যাগ, ভালোবাসা ও আল্লাহর প্রতি পরম আনুগত্যের শিক্ষা।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘মানুষের ওপর আল্লাহর জন্য এ ঘরের হজ করা ফরজ, যারা সেখানে পৌঁছার সামর্থ্য রাখে।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ৯৭)
হজের সফর শুরু হয় ‘ইহরাম’ দিয়ে। নির্ধারিত মীকাতে পৌঁছে হাজী সাহেবগণ গোসল করেন, সুগন্ধি ব্যবহার করেন এবং পুরুষরা দুই টুকরা সাদা কাপড় পরিধান করেন। নারীরা শালীন পোশাকেই ইহরাম বাঁধেন। এরপর উচ্চারিত হয় সেই কালজয়ী ধ্বনি—
“لَبَّيْكَ اللّٰهُمَّ لَبَّيْكَ”
“হে আল্লাহ! আমি হাজির, আপনার ডাকে সাড়া দিয়ে হাজির।”
এই ইহরামের পোশাক মানুষকে মৃত্যুর কাফনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এখানে নেই কোনো অহংকার, নেই রাজকীয়তা, নেই দুনিয়াবি পরিচয়ের গর্ব। ধনী-গরিব সবাই একাকার হয়ে দাঁড়ায় আল্লাহর সামনে।
মক্কায় পৌঁছে হাজীগণ প্রথমে কাবা শরিফ তাওয়াফ করেন। এটিকে বলা হয় ‘তাওয়াফে কুদূম’। সাত চক্কর ঘুরতে ঘুরতে মানুষ অনুভব করে, তার জীবনও যেন আল্লাহকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হওয়া উচিত। এরপর মাকামে ইবরাহিমের পেছনে দুই রাকাত সালাত আদায় করা হয় এবং সাফা-মারওয়ার মাঝে সাতবার সাঈ করা হয়। এই সাঈ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় হাজেরা (আ.)-এর সেই অবিশ্বাস্য ত্যাগ ও মাতৃত্বের সংগ্রামের কথা, যখন তিনি শিশু ইসমাঈল (আ.)-এর জন্য পানির সন্ধানে মরুভূমির উত্তপ্ত বালুর ওপর দৌড়ে বেড়িয়েছিলেন।
যিলহজের ৮ তারিখ, ‘ইয়াওমুত তারবিয়াহ’ বা তারবিয়ার দিনে হাজীগণ মিনায় গমন করেন। সেখানে অবস্থান করে যোহর, আসর, মাগরিব, এশা ও পরদিনের ফজর আদায় করেন। মিনা যেন একটি প্রশিক্ষণশিবির, যেখানে মানুষ ধৈর্য, শৃঙ্খলা ও আল্লাহর স্মরণে নিজেকে প্রস্তুত করে।
৯ যিলহজ হলো আরাফার দিন, হজের শ্রেষ্ঠ ও প্রধান রুকন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
الحَجُّ عَرَفَةُ
“হজ হলো আরাফা।” (তিরমিজি, হাদিস: ৮৮৯)
আরাফার ময়দানে দাঁড়িয়ে মানুষ যেন হাশরের ময়দানের এক ঝলক দেখতে পায়। লাখো মানুষ অশ্রুসিক্ত চোখে হাত তুলে ক্ষমা প্রার্থনা করে। কেউ নিজের গুনাহের জন্য কাঁদে, কেউ পরিবার-সন্তানের জন্য দোয়া করে, কেউ আবার সমগ্র উম্মাহর জন্য রহমত কামনা করে। সূর্যাস্ত পর্যন্ত এই অবস্থান হজের প্রাণ।
সূর্য ডোবার পর হাজীগণ মুযদালিফার উদ্দেশ্যে রওনা হন। সেখানে মাগরিব ও এশার সালাত একসাথে আদায় করা হয় এবং খোলা আকাশের নিচে রাতযাপন করা হয়। এখান থেকেই কঙ্কর সংগ্রহ করা হয়, যা পরে শয়তানকে প্রতীকীভাবে নিক্ষেপ করার জন্য ব্যবহৃত হবে।
১০ যিলহজ, ঈদুল আজহার দিন, হজের অন্যতম ব্যস্ত দিন। হাজীগণ মিনায় ফিরে এসে প্রথমে বড় জামরায় সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করেন। এটি মূলত শয়তানের বিরুদ্ধে ঈমানি অবস্থান গ্রহণের প্রতীক। এরপর কোরবানি করা হয়, যা ইবরাহিম (আ.)-এর অনন্য ত্যাগের স্মৃতিকে জীবন্ত করে তোলে। তারপর পুরুষরা মাথা মুন্ডন বা চুল ছোট করেন। এতে অহংকার ঝরে পড়ে, মানুষ বিনয়ের এক নতুন পরিচয়ে ফিরে আসে।
এরপর সম্পন্ন করা হয় ‘তাওয়াফে ইফাদা’। এটি হজের ফরজ তাওয়াফ। আবারও কাবার চারপাশে সাত চক্কর, আবারও হৃদয়ের গভীর ভালোবাসা ও আত্মসমর্পণের প্রকাশ। অনেক হাজী এ সময় অশ্রু সংবরণ করতে পারেন না; কারণ অনুভূত হয়, হয়তো জীবনে আর কখনও এই ঘরে ফিরে আসা হবে না।
এরপর আসে আইয়ামে তাশরীক, অর্থাৎ ১১, ১২ ও ১৩ যিলহজ। হাজীগণ মিনায় অবস্থান করেন এবং তিনটি জামরায় সাতটি করে কঙ্কর নিক্ষেপ করেন। প্রতিদিন মোট ২১টি কঙ্কর নিক্ষেপের মাধ্যমে মানুষ যেন নিজের ভেতরের অহংকার, লোভ, হিংসা ও পাপপ্রবণতার বিরুদ্ধে প্রতীকী যুদ্ধ ঘোষণা করে। কেউ চাইলে ১২ যিলহজ সূর্যাস্তের আগে চলে যেতে পারেন, আর কেউ ১৩ তারিখ পর্যন্ত অবস্থান করেন।
সবশেষে আসে বিদায়ের বেদনাময় মুহূর্ত, ‘তাওয়াফে বিদা’। মক্কা ছাড়ার আগে শেষবারের মতো কাবাকে ঘিরে সাত চক্কর দেওয়া হয়। এই তাওয়াফে অনেক হৃদয় ভারী হয়ে ওঠে। কাবার দিকে তাকিয়ে মানুষ মনে মনে বলে, ‘হে আল্লাহ! আবারও যেন আপনার ঘরে ফিরে আসতে পারি।’
হজের প্রতিটি ধাপ আসলে মানুষের আত্মিক পরিশুদ্ধির একটি অধ্যায়। ইহরাম শেখায় সরলতা, তাওয়াফ শেখায় আল্লাহকেন্দ্রিক জীবন, সাঈ শেখায় চেষ্টা ও ত্যাগ, আরাফা শেখায় কান্না ও ক্ষমাপ্রার্থনা, কুরবানি শেখায় আত্মবিসর্জন, আর জামরায় কঙ্কর নিক্ষেপ শেখায় শয়তানের বিরুদ্ধে আজীবন সংগ্রাম।
তাই হজ কেবল কয়েকটি আনুষ্ঠানিক কাজের সমষ্টি নয়; এটি এমন এক ইবাদত, যা মানুষকে নতুন জীবনের পথে পরিচালিত করে। কবুল হজের সবচেয়ে বড় আলামত হলো, মানুষ হজ থেকে ফিরে এসে আগের চেয়ে বেশি আল্লাহভীরু, বিনয়ী ও আখিরাতমুখী হয়ে ওঠে।
মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে কবুল হজের তাওফিক দান করুন। আমীন।






