সেনেগালে ঈদুল আজহায় আভিজাত্যের প্রতীক ‘লাডুম’

সংগৃহীত ছবি
পশ্চিম আফ্রিকার দেশ সেনেগালে ঈদুল আজহা শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং এটি ঐতিহ্য, সামাজিক মর্যাদা, পারিবারিক বন্ধন ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের এক অনন্য আয়োজন। স্থানীয় উলফ ভাষায় ঈদুল আজহাকে বলা হয় ‘তাবাস্কি’। বিশ্বের অন্যান্য মুসলিম দেশের মতো এখানেও কোরবানির মাধ্যমে হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর ত্যাগ ও আল্লাহর প্রতি আনুগত্য স্মরণ করা হয়। তবে সেনেগালের ঈদকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে বিশেষ এক প্রজাতির ভেড়া। নাম ‘লাডুম’।
ঈদের কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই সেনেগালের রাজধানী ডাকারের বিভিন্ন পশুর হাট ও খামারে শুরু হয় তাবাস্কির প্রস্তুতি। প্রতিবেশী মালি ও মৌরিতানিয়া থেকে লাখ লাখ ভেড়া দেশে আনা হয়। শহরের বিভিন্ন অস্থায়ী ঘের ও খামারে সেগুলো রাখা হয়। সাধারণ মানুষ কোরবানির জন্য ভেড়া কিনতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেও সবচেয়ে বেশি আলোচনায় থাকে রাজকীয় চেহারার লাডুম ভেড়া।
ঝকঝকে সাদা পশম, নিখুঁত বাঁকানো শিং ও বিশাল দেহের জন্য পরিচিত লাডুমকে অনেকেই ‘ভেড়ার ফেরারি’ বলে থাকেন। এদের ওজন ১৮০ কেজি পর্যন্ত হতে পারে। সেনেগালে এই ভেড়া শুধু পশু নয়, বরং অভিজাত জীবনযাপন ও সামাজিক মর্যাদার প্রতীক। একেকটি লাডুমের দাম ৭০ হাজার ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে, যেখানে দেশটির মাথাপিছু আয় প্রায় ১ হাজার ৬০০ ডলারের সামান্য বেশি। ফলে একটি লাডুমের মালিক হওয়া মানে সমাজে বিশেষ মর্যাদার অধিকারী হওয়া।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, ঈদুল আজহায় সাধারণ ভেড়া কোরবানি হলেও অধিকাংশ লাডুম কোরবানি থেকে রেহাই পায়। এসব ভেড়া মূলত প্রজনন, প্রদর্শনী ও সৌন্দর্য প্রতিযোগিতার জন্য পালন করা হয়। বিশেষ খামারে তাদের জন্য থাকে রাজকীয় যত্ন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ম্যাসাজ করা হয়, বিশেষ খাদ্য দেওয়া হয়, এমনকি সিরিঞ্জের মাধ্যমে ভিটামিনও খাওয়ানো হয়। খামারের দেয়ালে সাজিয়ে রাখা হয় চ্যাম্পিয়ন ভেড়ার ছবি ও বংশপরিচয়।
তাবাস্কির দিন সূর্যোদয়ের পর মসজিদে ঈদের নামাজ আদায় করা হয়। এরপর পরিবারগুলো ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী ভেড়া বা দুম্বা কোরবানি করে। কোরবানির মাংসের এক অংশ পরিবার নিজেরা খায়, এক অংশ আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের মধ্যে বিতরণ করা হয় এবং বাকি অংশ গরিবদের দেওয়া হয়। সেনেগালের বিশেষত্ব হলো, মুসলিমদের পাশাপাশি কোরবানির মাংস ভাগাভাগি করা হয় খ্রিস্টান প্রতিবেশীদের সঙ্গেও।
ঈদের দিন শিশুরা নতুন পোশাক পরে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ‘নদেওয়েনাল’ নামে পরিচিত উপহার বা হাতখরচ সংগ্রহ করে। সন্ধ্যায় শুরু হয় ‘জিয়ার’ অনুষ্ঠান। নারী-পুরুষ সবাই সেরা পোশাক পরে আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের বাড়িতে যান, একে অপরের কাছে ক্ষমা চান এবং আগামী বছরের জন্য বিনিময় করেন শুভকামনা।
সেনেগালে ঈদুল আজহা ধর্মীয় আবেগ, সামাজিক সম্প্রীতি, ঐতিহ্য ও আভিজাত্যের এমন এক মেলবন্ধন, যা বিশ্বের অন্য অনেক দেশের ঈদ উদযাপন থেকে আলাদা পরিচয় এনে দিয়েছে একে।






