সিসা দূষণে ঝুঁকিতে শিশুর মেধা ও শিক্ষা

আবদুল মুকতাদির মামুন
বিগত দুই দশকে বাংলাদেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশু ভর্তি হার বৃদ্ধি এবং লিঙ্গ সমতা অর্জিত হলেও, শিক্ষার গুণগতমান নিম্নগামী। ইউনিসেফ ২০২৫ সালে বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার ওপর একটি গবেষণা পরিচালনা করে এবং ২০২৬ সালের মে মাসে বার্ষিক প্রতিবেদনে এই গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়।
গবেষণা প্রতিবেদনে শিখন ঘাটতিকে বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার প্রধান উদ্বেগ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এই গবেষণা প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, শিশুরা মৌলিক দক্ষতাগুলো অর্জন না করেই প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করছে। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রবেশ করা অনেক শিক্ষার্থীর গণিত এবং বাংলায় দক্ষতা এখনো কেবল প্রারম্ভিক পর্যায়ে রয়ে গেছে।
শহর বা ধনী পরিবারের শিশুদের তুলনায় গ্রামীণ এবং দরিদ্র পরিবারের শিশুদের পড়তে পারা ও গাণিতিক দক্ষতা অর্জন উল্লেখযোগ্যভাবে কম। প্রান্তিক ও গ্রামীণ পরিবারগুলোর মধ্যে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষায় উপস্থিতির হার খুব কম, যা শিশুদের প্রথম শ্রেণিতে ওঠার আগে একটি শক্তিশালী ভিত্তি গড়ে তুলতে বাধা সৃষ্টি করছে।
শিখন মানের এই উদ্বেগজনক অবস্থার পেছনে নানাবিধ কারণকে দায়ী করা হয়। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণে বিলম্ব, শ্রেণিকক্ষে ব্যবহার উপযোগী শিক্ষা উপকরণের অভাব, বুঝে বুঝে পড়ার চেয়ে মুখস্থ করায় উৎসাহিত করা, দুর্বল মূল্যায়ন পদ্ধতি, শিশুদের বয়স বা শ্রেণির পরিবর্তে তাদের প্রকৃত মেধা বা জ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে পাঠদান বা স্তর-ভিত্তিক নির্দেশনার অভাব ইত্যাদি।
সীসার সংস্পর্শে আসা শিশুদের মধ্যে প্রায়ই অত্যধিক আবেগপ্রবণতা এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণে অক্ষমতা লক্ষ্য করা যায়। এ বিষয়ে এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে— একটা ভয়ংকর আগামী আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য অপেক্ষা করছে!
এছাড়া, শিক্ষা খাতে ব্যয়, জিডিপির ১.৭% থেকে কমে ১.৫% এ দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশে শিশুশ্রম বৃদ্ধির হারও উদ্বেগজনক, যা বর্তমানে ৯.২% শিশুকে প্রভাবিত করছে (২০১৯ সালে যা ছিল ৬.৮%। এটি সরাসরি শিশুদের শ্রেণিকক্ষ থেকে দূরে সরিয়ে রাখছে অথবা প্রাথমিক শিক্ষায় মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা সীমিত করছে। ইউনিসেফ সতর্ক করেছে যে, আন্তর্জাতিক শিক্ষা সহায়তায় সম্ভাব্য বিশ্বব্যাপী কাটছাঁট ২০২৬ সালের মধ্যে শিক্ষাকে আরও বিপন্ন করতে পারে।
তবে ওপরে উল্লিখিত বিষয়গুলোকে ছাপিয়ে ২০২৫ সালের মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে একটি নতুন উদ্বেগের বিষয় সামনে এনেছে। এতে বলা হয়েছে শিশুরা মারাত্মকভাবে সিসা দূষণে আক্রান্ত! ৩৮% এরও বেশি শিশুর রক্তে সীসার উচ্চমাত্রা পাওয়া গেছে। সিসা একটি শক্তিশালী নিউরোটক্সিন (স্নায়ুবিঁষ), এবং শিশুরা বিশেষভাবে এর ঝুঁকিতে থাকে, কারণ তাদের স্নায়ুতন্ত্র ক্রমবিকাশমান।
ইউনিসেফ উল্লেখ করেছে যে, এটি মেধাবিকাশের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে, যা সরাসরি একটি শিশুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিবেশে শেখার এবং সফল হওয়ার ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে।
জনস্বাস্থ্যের পরিভাষায়, যদি প্রতি দশজন শিশুর মধ্যে প্রায় চারজনের রক্তে সীসার উচ্চ মাত্রা পাওয়া যায়, তবে এটিকে কোনো বিচ্ছিন্ন সমস্যা বলা যায় না, বরং এটিকে একটি ব্যাপক পরিবেশগত সংকট হিসেবে গণ্য করা হয়। সীসার উৎসগুলো শিশুদের চারপাশেই থাকে, অর্থাৎ, তাদের বসবাসের জায়গা এবং খেলার প্রাত্যহিক পরিবেশে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে আছে সিসা, তা দূষিত মাটি, সিসা-অ্যাসিড ব্যাটারি রিসাইক্লিং, নির্দিষ্ট কিছু রং, এমনকি মশলা যাই হোক না কেন।
এমনকি কম মাত্রার সংস্পর্শও শিশুদের বুদ্ধিমত্তাকে হ্রাস করে অর্থাৎ সিসা, নিউরনের মধ্যকার যোগাযোগ প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করে এবং এটি অমনোযোগিতার সাথে দৃঢ়ভাবে সম্পৃক্ত। সীসার সংস্পর্শে আসা শিশুদের মধ্যে প্রায়ই অত্যধিক আবেগপ্রবণতা এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণে অক্ষমতা লক্ষ্য করা যায়। এ বিষয়ে এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে— একটা ভয়ংকর আগামী আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য অপেক্ষা করছে!
লেখক: উন্নয়ন গবেষক
ইমেইল: [email protected]






