ভারতে ‘একযোগে ৫০টি মসজিদ ভাঙচুর’— দাবিটির সত্যতা কী

ছবি: আগামীর সময়
ভারতের মিরাট শহরে একযোগে ৫০টি মসজিদ ভেঙে ফেলা হয়েছে এবং মুসলিমদের ঘরবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে আগুন দেওয়া হয়েছে—এমন একটি চাঞ্চল্যকর দাবি সম্প্রতি ভিডিওসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এই স্পর্শকাতর দাবিটি দুই দেশের নেটিজেনদের মধ্যেই তীব্র উদ্বেগ ও বিভ্রান্তির সৃষ্টি করেছে। তবে তথ্য অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রচারিত এই দাবিটি সম্পূর্ণ বানোয়াট ও ভিত্তিহীন। মূলত, উত্তর প্রদেশের অন্য একটি জেলার স্থানীয় সংঘর্ষের ভিডিও ব্যবহার করে এই সাম্প্রদায়িক অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।
ভাইরাল দাবি ও প্রেক্ষাপট
গত ১৭ মে ফেসবুকের একটি ব্যক্তিগত প্রোফাইল থেকে ভিডিওটি প্রথম পোস্ট করা হয়। পোস্টের ক্যাপশনে দাবি করা হয়, মিরাট শহরে একযোগে ৫০টি মসজিদ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের ঘরবাড়ি ও দোকানে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। মুহূর্তের মধ্যে ভিডিওটি বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়ে। তবে ভিডিওর কি-ফ্রেম ধরে রিভার্স ইমেজ সার্চ করে ভারতভিত্তিক একাধিক মূলধারার গণমাধ্যম ও ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থার প্রতিবেদনে এর আসল সত্যতা পাওয়া যায়।
অনুসন্ধান ও আসল ঘটনা
অনুসন্ধানে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, ভাইরাল হওয়া ভিডিওটি মিরাট শহরের নয়; বরং এটি উত্তর প্রদেশের হাপুর জেলার ধৌলানা থানার দেহরা গ্রামের একটি ঘটনা। গত ৯ মে সেখানে মহারানা প্রতাপ জয়ন্তী উপলক্ষে একটি শোভাযাত্রা বের করা হয়েছিল। সেই শোভাযাত্রা চলাকালে স্থানীয় দুটি পক্ষের মধ্যে আকস্মিক সংঘর্ষ ও পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। ওই সময় কিছু দোকানপাট ও যানবাহনে ভাঙচুর চালানো হলেও কোনো মসজিদ ভাঙচুর বা ধর্মীয় উপাসনালয়ে হামলার কোনো ঘটনাই ঘটেনি।
গণমাধ্যম ও পুলিশের বক্তব্য
ভারতের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যম ‘ইন্ডিয়া টুডে’ তাদের বিশেষ ফ্যাক্ট-চেক প্রতিবেদনে নিশ্চিত করেছে, মিরাটে মসজিদ ভাঙচুর বা মুসলিমদের বাড়িতে অগ্নিসংযোগের কোনো ঘটনার অস্তিত্বই নেই।
এছাড়া, ঘটনার পরদিনই অর্থাৎ ১০ মে হাপুর জেলা পুলিশ একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়। সেখানে বলা হয়, শোভাযাত্রাকে কেন্দ্র করে পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে ৩ জনকে গ্রেফতার এবং আরও কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।
ভারতের সুপরিচিত ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থা ‘অল্ট নিউজ’-ও বিষয়টি খতিয়ে দেখে জানিয়েছে, ভিডিওটি মিরাটে মসজিদ ভাঙচুরের দাবির সাথে কোনোভাবেই সম্পর্কিত নয় এবং এই অপপ্রচারের পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই। খোদ মিরাট পুলিশও তাদের অফিশিয়াল এক্সে এক পোস্টে স্পষ্ট করেছে যে, আলোচিত ঘটনাটি তাদের জেলার নয় এবং মিরাটে এমন কোনো ঘটনাই ঘটেনি। একই সাথে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর অভিযোগে সংশ্লিষ্ট অনলাইন অ্যাকাউন্টের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলেও পুলিশ জানিয়েছে।
সামগ্রিক তথ্য-প্রমাণ ও উত্তর প্রদেশ পুলিশের বক্তব্য বিশ্লেষণ শেষে এটি শতভাগ স্পষ্ট যে, হাপুর জেলার একটি শোভাযাত্রাকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া স্থানীয় সংঘর্ষ ও ভাঙচুরের ভিডিওকে মিরাটের ঘটনা দাবি করা হচ্ছে। ‘একযোগে ৫০টি মসজিদ ভাঙচুর’ এবং ‘মুসলিমদের বাড়িঘরে আগুন দেওয়ার’ এই ভয়াবহ দাবিটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক, ভিত্তিহীন এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।












