তুরস্কে ন্যাটো সম্মেলন শুরু, আলোচনায় যেসব বিষয়

ন্যাটো সম্মেলন ঘিরে রাজধানী আঙ্কারায় বিশেষ বিলবোর্ড। ছবি : রয়টার্স
তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় আজ মঙ্গলবার ২০২৬ সালের ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলন শুরু হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ পশ্চিমা সামরিক জোটের ৩২টি সদস্য রাষ্ট্র ও বেশ কয়েকটি সহযোগী দেশের নেতারা একত্রিত হচ্ছেন। যেখানে আগামী দুই দিন ধরে উচ্চ-পর্যায়ের আলোচনা হবে।
প্রতিরক্ষা ব্যয়, ইউক্রেনের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সমর্থন এবং জোটের প্রতিরক্ষা শিল্প সক্ষমতা জোরদার করার প্রচেষ্টা আলোচনায় প্রাধান্য পাবে বলে মনে করা হচ্ছে।
ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটে এবং অন্যান্য কর্মকর্তারাও বলেছেন, ইউরোপ প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি রক্ষা করছে তা দেখাতে চায় এবং এই শীর্ষ সম্মেলন চলাকালীন বড় ধরনের অস্ত্র চুক্তি ঘোষণা করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
২০০৪ সালে ইস্তাম্বুলের পর দ্বিতীয়বারের মতো ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলন আয়োজন করে তুরস্ক এই সমাবেশকে তার ক্রমবর্ধমান প্রতিরক্ষা শিল্পের প্রদর্শনী হিসেবে দেখাতে চাইছে।
প্রতিরক্ষা ব্যয় : প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তবায়ন
আঙ্কারায় প্রতিরক্ষা ব্যয়ই প্রধান আলোচ্য বিষয় হবে বলে আশা করা হচ্ছে। কারণ ন্যাটো সদস্যরা গত বছরের দেওয়া নামমাত্র প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব সামরিক সক্ষমতায় পরিণত করার জন্য ক্রমবর্ধমান মার্কিন চাপের সম্মুখীন হচ্ছে।
হেগে অনুষ্ঠিত ২০২৫ সালের ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে নেতারা প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা-সম্পর্কিত ব্যয়ের জন্য ২০৩৫ সালের মধ্যে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) বার্ষিক ৫ শতাংশের একটি নতুন লক্ষ্যমাত্রায় সম্মত হয়েছেন। যা দীর্ঘদিন ২ শতাংশে ছিল।
এই পরিকল্পনা অনুযায়ী, অন্তত ৩ দশমিক ৫ শতাংশ মূল সামরিক ব্যয় যেমন— সৈন্য, অস্ত্রশস্ত্র এবং অভিযান খাতে বরাদ্দ করা হবে, এবং সর্বোচ্চ ১ দশমিক ৫ শতাংশ সাইবার প্রতিরক্ষা, সামরিক গতিশীলতা, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও প্রতিরক্ষা শিল্পসহ বৃহত্তর নিরাপত্তা অগ্রাধিকার খাতে বিনিয়োগ করা যেতে পারে।
মিত্র দেশগুলো বার্ষিক জাতীয় বাস্তবায়ন পরিকল্পনা জমা দেওয়ারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যার অগ্রগতি ২০২৯ সালে পর্যালোচনা করা হবে।
বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল রয়ে গেছে, কারণ অনেক ইউরোপীয় সরকার কঠিন সমালোচনার সম্মুখীন হচ্ছে। অন্যদিকে ওয়াশিংটন দীর্ঘদিন ধরে যুক্তি দিয়ে আসছে, ন্যাটোর সামরিক বোঝার একটি বিশাল অংশ যুক্তরাষ্ট্রের ওপর পড়ে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউরোপীয় মিত্রদের বিরুদ্ধে মার্কিন সুরক্ষার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার অভিযোগ বারবার করেছেন এবং আঙ্কারা শীর্ষ সম্মেলনের আগে সেই সমালোচনা পুনর্ব্যক্ত করে বর্তমান এই ভারসাম্যহীনতাকে হাস্যকর আখ্যা দিয়েছেন। এ ছাড়া ইউরোপকে তার নিজস্ব প্রতিরক্ষার জন্য আরও বেশি দায়িত্ব নেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন।
ইউক্রেনের জন্য সমর্থন অব্যাহত রাখা
ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধের চার বছরেরও বেশি সময় পরেও কিয়েভের প্রতি সমর্থন যে অটুট রয়েছে, তা মিত্ররা দেখাতে চাওয়ায় ইউক্রেন শীর্ষ সম্মেলনের অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় হিসেবে থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।
যদিও ইউক্রেন ন্যাটোর সদস্য নয়, জোটটি ন্যাটো-ইউক্রেন কাউন্সিল এবং ন্যাটো নিরাপত্তা সহায়তা ও ইউক্রেনের জন্য প্রশিক্ষণ (এনএসএটিইউ) মিশনের মতো ব্যবস্থার মাধ্যমে কিয়েভের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখে, যা সামরিক সহায়তা ও প্রশিক্ষণের সমন্বয় করে।
২০২২ সালে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে মিত্র দেশগুলো ইউক্রেনের সামরিক সহায়তার সিংহভাগ সরবরাহ করেছে।
আয়োজক দেশ তুরস্কও জোটের মধ্যে কিয়েভের একজন সক্রিয় সমর্থক হিসেবে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছে, ইউক্রেনকে বায়রাক্তার টিবি২ ড্রোন সরবরাহ করেছে এবং মস্কোর সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ খোলা রাখার পাশাপাশি রাশিয়া-ইউক্রেন শান্তি আলোচনার প্রাথমিক পর্বগুলোর আয়োজন করেছে।
গত বছর ন্যাটো ও যুক্তরাষ্ট্র ‘অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ইউক্রেনীয় চাহিদার তালিকা’ চালু করেছে। এটি এমন একটি ব্যবস্থা যা মিত্র দেশগুলোকে কিয়েভের দ্বারা কর্মপরিচালনার অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত মার্কিন-নির্মিত সামরিক সরঞ্জাম, যার মধ্যে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও অন্তর্ভুক্ত, সেগুলোর জন্য যৌথভাবে অর্থায়ন করার সুযোগ দেয়।
আঙ্কারায় নেতারা ইউক্রেনের সঙ্গে অস্ত্র সরবরাহ, বিমান প্রতিরক্ষা, গোলাবারুদ জোগান এবং প্রতিরক্ষা-শিল্প সহযোগিতার অগ্রগতি পর্যালোচনা করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
কিন্তু ওয়াশিংটন থেকে আসা পরিবর্তনশীল সংকেতও এতে প্রভাব ফেলতে পারে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার যুক্তি দিয়েছেন, ইউক্রেনকে সমর্থন এবং বৃহত্তর অর্থে ইউরোপের নিরাপত্তার জন্য ইউরোপীয় মিত্রদের আরও বেশি দায়িত্ব নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের অনির্দিষ্টকালের সমর্থন তুলে নেওয়ার ইঙ্গিতও দিয়েছেন।
ফেব্রুয়ারির শেষে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে সমর্থন দিতে ব্যর্থ হওয়ায় ইউরোপীয় মিত্রদের বারবার অভিযুক্ত করেছেন ট্রাম্প।
প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় সক্ষমতা বাড়ানো
প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়ানোর পাশাপাশি নেতারা নতুন ব্যয়ের প্রতিশ্রুতিগুলোকে কীভাবে দ্রুততর অস্ত্র উৎপাদন এবং শক্তিশালী সামরিক সক্ষমতায় রূপান্তরিত করা যায়, সেদিকেও মনোযোগ দেবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
বিষয়টি আরও জরুরি হয়ে উঠেছে, কারণ ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ গোলাবারুদ, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জামের ঘাটতি সামনে এসেছে এবং একই সঙ্গে মিত্র দেশগুলোর নিজস্ব মজুদ পূরণের প্রয়োজনীয়তাকেও তুলে ধরেছে।
ন্যাটো কর্মকর্তারা বারবার সতর্ক করেছেন, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা জুড়ে প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় ব্যাপক হারে বাড়া সত্ত্বেও উৎপাদন ক্ষমতা ক্রমবর্ধমান চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি।
রুট ইউরোপের খণ্ডিত প্রতিরক্ষা শিল্প, ধীরগতির ক্রয় প্রক্রিয়া এবং যুদ্ধক্ষেত্রের চাহিদার তুলনায় পিছিয়ে থাকা উৎপাদন সময়সীমার দিকে ইঙ্গিত করেছেন।
৭ জুলাই দিনটি ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলন প্রতিরক্ষা শিল্প ফোরাম (এনএসডিআইএফ২৬)-এর জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যাকে ন্যাটো আন্তঃআটলান্টিক প্রতিরক্ষা উৎপাদন, বিনিয়োগ ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে তাদের প্রধান আয়োজন হিসেবে বর্ণনা করে।
সূত্র : আনাদুলো এজেন্সি






