লন্ডনে সিলেটের দুমাসী ধানের সফল ফলন, খুলছে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার

দীর্ঘ তিন বছরের প্রচেষ্টায় আসে এই সাফল্য
বাংলার চিরচেনা ধান এবার ফলেছে লন্ডনের মাটিতে। সিলেট অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী দুমাসী ও পঞ্চব্রীহি ধানের সফল পরীক্ষামূলক চাষ ব্রিটেনে কৃষির নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। দীর্ঘ তিন বছরের প্রচেষ্টায় আসা এই সাফল্য ভবিষ্যতে বৃহৎ পরিসরে ধান উৎপাদনের পথ খুলে দিতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্বখ্যাত বাংলাদেশি জিনবিজ্ঞানী ড. আবেদ চৌধুরীর তত্ত্বাবধানে ২০২৩ সালে প্রথম এই পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু হয়। ব্রিটিশ বাংলাদেশি সেলিব্রিটি শেফ আজম খানের লন্ডনের বাড়ির পেছনের বাগানে সিলেটের দুমাসী ও পঞ্চব্রীহিসহ কয়েক প্রজাতির ধান রোপণ করা হয়।
প্রথম বছরের চেষ্টা সফল না হলেও থেমে যাননি উদ্যোক্তারা। পরিচর্যা ও চাষপদ্ধতিতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের পর ২০২৪ সালে প্রথমবারের মতো সফল ফলন পাওয়া যায়। সেই ধানের বীজ দিয়েই ২০২৫ ও ২০২৬ সালে আবার চাষ করা হয়।
বাগানটির পরিচর্যাকারী আজম খান বলেন, “২০২৪ সালে উৎপাদিত ধানের বীজ দিয়েই পরবর্তী দুই বছর চাষ করা হয়েছে। এবার গ্রীষ্মকাল শেষ হওয়ার আগেই ধান পেকে গেছে। গত বছর উৎপাদিত ধান থেকে চাল তৈরি করে ভাতও রান্না করা হয়েছিল।”
এই অর্জন উদ্যাপনে ৩০ আগস্ট রোববার আজম খানের বাগানে আয়োজন করা হয় ধান কাটার উৎসব। বাংলার গ্রামীণ ঐতিহ্যের আদলে আয়োজিত এই উৎসবে ব্রিটিশ বাংলাদেশি কমিউনিটির বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। লন্ডনের বুকে পাকা ধান কাটার দৃশ্য উপস্থিত মানুষের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ ও আবেগ সৃষ্টি করে।
সাংবাদিক আ স ম মাসুম বলেন, ব্রিটেনে পরীক্ষামূলকভাবে বাংলাদেশের ধান উৎপাদন অত্যন্ত ইতিবাচক ঘটনা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্রিটেনে তুলনামূলকভাবে দীর্ঘ সময় উষ্ণ আবহাওয়া বিরাজ করছে। এই পরিবর্তিত আবহাওয়া ধান চাষের পরীক্ষাটি সফল হওয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক হয়ে থাকতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
ব্রিটিশ বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি মহিব চৌধুরী বলেন, “ভবিষ্যতে ব্রিটেনে বাণিজ্যিকভাবে ধান উৎপাদন সম্ভব হলে সিলেটের ধান দেশটির খাদ্যনিরাপত্তায় বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে।”
ব্রিটিশ বাংলা ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের চেয়ারম্যান খসরুজ্জামান খসরু বলেন, ব্রিটেনে বাণিজ্যিকভাবে ধান উৎপাদনের সম্ভাবনা যাচাই এবং প্রয়োজনীয় গবেষণার জন্য বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ সহযোগিতামূলক উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
ধান কাটার উৎসবে অনলাইনে যুক্ত হন জিনবিজ্ঞানী ড. আবেদ চৌধুরী। তিনি জানান, এ বিষয়ে অক্টোবরে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে একটি বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
ড. আবেদ চৌধুরী বলেন, “আজম খান ব্যক্তিগত পর্যায়ে পরীক্ষামূলকভাবে এই কার্যক্রম শুরু করেছিলেন। সেটি সফল হওয়ার পর এখন আরও বৃহৎ পরিসরে ধান উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি বাড়ির বাগানে সফল ফলন পাওয়া আশাব্যঞ্জক হলেও বাণিজ্যিক উৎপাদনের সম্ভাবনা নির্ধারণের জন্য বড় জমিতে একাধিক মৌসুমের পরীক্ষা প্রয়োজন। উৎপাদনব্যয়, আবহাওয়ার ধারাবাহিকতা, মাটির উপযোগিতা, সেচব্যবস্থা এবং প্রতি একরে ফলনের পরিমাণও যাচাই করতে হবে।
তারপরও লন্ডনের মাটিতে সিলেটের দুমাসী ও পঞ্চব্রীহি ধানের এই সফল ফলন কেবল একটি কৃষি পরীক্ষা নয়; এটি ব্রিটিশ বাংলাদেশিদের শিকড়, ঐতিহ্য ও নতুন সম্ভাবনার এক অনন্য সংযোগ। গবেষণা ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা পাওয়া গেলে এই ছোট্ট বাগানের উদ্যোগই একদিন ব্রিটেনে বাংলাদেশি ধান চাষের বড় অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে।









