দাউদাউ আগুনে পুড়ছে ইউরোপ, জলবায়ু পরিবর্তনের নতুন সতর্কসংকেত ‘মেগা ফায়ার’

ছবি: রয়টার্স
ইউরোপের দাবানল আর শুধু বনভূমির আগুন নয়। বিজ্ঞানীদের ভাষায়, মহাদেশটি প্রবেশ করেছে ‘মেগা ফায়ার’-এর এক নতুন যুগে, যেখানে আগুনের তাপ ও শক্তি এতটাই ভয়াবহ যে তার তুলনা টানা হচ্ছে পরমাণু বোমার বিস্ফোরণ থেকে নির্গত তাপশক্তির সঙ্গে। দাবানল এখন নিজের আবহাওয়া নিজেই তৈরি করছে, সৃষ্টি করছে আগুনের ঘূর্ণিঝড়, ছাইয়ের মেঘ, এমনকি বজ্রপাতও। ফলে আগুন নেভানো তো দূরের কথা, অনেক ক্ষেত্রে দমকলকর্মীদের প্রথম কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া।
চলতি সপ্তাহে ফ্রান্স, স্পেন, গ্রিস, পর্তুগাল, যুক্তরাজ্য ও তুরস্কের বিস্তীর্ণ অঞ্চল ভয়াবহ দাবানলের কবলে পড়েছে। ফ্রান্সে এরই মধ্যে ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের মৌসুমের মুখোমুখি দেশটি। বোর্দোর কাছে বিশাল বনাঞ্চল পুড়ে গিয়েছে, কয়েক লাখ মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। স্পেনের মাদ্রিদের উপকণ্ঠে জরুরি অবস্থা শিথিল করা হলেও দেশ জুড়ে এখনো একাধিক দাবানল সক্রিয়। গ্রিসের ক্রিট দ্বীপে আগুনে প্রাণ হারিয়েছেন তিন দমকলকর্মী, পর্যটকসহ হাজার হাজার মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ বছরের দাবানলের ভয়াবহতার পিছনে রয়েছে একটি অস্বাভাবিক আবহাওয়ার ধারা। শীত ও বসন্তে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি বৃষ্টিতে বিপুল পরিমাণ গাছপালা ও ঝোপঝাড় জন্মায়। পরে একের পর এক তীব্র তাপপ্রবাহে সেই সবুজ উদ্ভিদই শুকিয়ে ভয়ংকর দাহ্য জ্বালানিতে পরিণত হয়। প্রবল গরম, কম আর্দ্রতা ও ঝোড়ো হাওয়া আগুনকে মুহূর্তের মধ্যে কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত ছড়িয়ে দিচ্ছে।
জলবায়ুবিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ আরও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। তাদের হিসাব অনুযায়ী, মানুষের কর্মকাণ্ডজনিত জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে স্পেনে এমন চরম অগ্নি-পরিস্থিতি তৈরির সম্ভাবনা ২০ গুণ বেড়েছে। ফ্রান্সেও একই ধরনের পরিস্থিতির সম্ভাবনা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। গত আড়াই দশকে দক্ষিণ ইউরোপে চরম দাবানল-উপযোগী দিনের সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে এবং সেই দিনগুলির তীব্রতাও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এই আগুন আর আগের মতো আচরণ করছে না। প্রচণ্ড তাপে আগুনের উপরে গঠিত হচ্ছে বিশাল ধোঁয়ার মেঘ বা পাইরোকিউমুলোনিম্বাস, যা কয়েক কিলোমিটার উঁচুতে উঠে নিজেরাই নতুন বাতাসের প্রবাহ তৈরি করছে। কোথাও কোথাও আগুনের ঘূর্ণিঝড়ও তৈরি হচ্ছে। ফলে আগুনের গতিপথ অনুমান করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ছে এবং দমকলকর্মীদের জীবনও চরম ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর এখনো আগস্ট শুরু না হতেই বহু দেশে পুড়ে যাওয়া বনভূমির পরিমাণ গত কয়েক বছরের রেকর্ড ছাড়িয়ে গিয়েছে। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন, বিশ্বের দ্রুততম উষ্ণায়ন হওয়া মহাদেশ হিসেবে ইউরোপে ভবিষ্যতে এমন ‘মেগা ফায়ার’ আরও ঘন ঘন দেখা যেতে পারে, যদি গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ কমানো এবং বন ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন আনা না হয়।
পরিবেশবিদদের আশঙ্কা, ইউরোপের এই দাবানল শুধু বনভূমি ধ্বংস করছে না; কৃষি, পর্যটন, জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতির উপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে। তাদের মতে, এবারের অগ্নিকাণ্ড স্পষ্ট করে দিয়েছে– জলবায়ু পরিবর্তন আর ভবিষ্যতের সংকট নয়, বরং তা এরই মধ্যে ইউরোপের বাস্তবতা হয়ে উঠেছে।




