ব্রিটেনের প্রতিরক্ষা প্রধান
যুদ্ধ ফিরেছে ইউরোপে, নিরাপত্তা আর ‘নিশ্চিত’ নয়

যুক্তরাজ্যের চিফ অব দ্য ডিফেন্স স্টাফ এয়ার চিফ মার্শাল স্যার রিচার্ড নাইটন
“শান্তি কি কেবল যুদ্ধ না থাকার নাম, নাকি যুদ্ধ ঠেকানোর মতো প্রস্তুতির নাম?” ইউরোপের আকাশে সেই পুরোনো প্রশ্নই যেন নতুন করে ফিরে এসেছে। ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ, বাল্টিক অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা, সাইবার হামলা, নাশকতা ও তথ্যযুদ্ধের আবহে ব্রিটেনের সর্বোচ্চ সামরিক কর্মকর্তা সতর্ক করলেন, ইউরোপ আর নিজের নিরাপত্তাকে নিশ্চিত ধরে নিতে পারে না।
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেনডেন্টে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে। প্রতিবেদনে যুক্তরাজ্যের চিফ অব দ্য ডিফেন্স স্টাফ এয়ার চিফ মার্শাল স্যার রিচার্ড নাইটন এবং সুইডেনের সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক জেনারেল মাইকেল ক্লেসন ইউরোপকে নিজেদের প্রতিরক্ষার বড় অংশের দায়িত্ব নিতে এবং ন্যাটোর উত্তরাঞ্চলীয় প্রতিরক্ষা বলয় আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানিয়েছেন।
দুই সামরিক প্রধানের ভাষ্য, ইউক্রেন যুদ্ধ দেখিয়েছে সামরিক প্রস্তুতি, প্রতিরক্ষা শিল্পের সক্ষমতা এবং জাতীয় স্থিতিস্থাপকতা কতটা জরুরি। ইউরোপীয় দেশগুলোকে নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি যৌথ নিরাপত্তার জন্য আরও দায়িত্ব নিতে হবে। তাঁদের সংক্ষিপ্ত বার্তা, “এটি যুদ্ধের প্রস্তুতি নয়, যুদ্ধ ঠেকানোর চেষ্টা।”
নাইটন ও ক্লেসন বলেছেন, শীতল যুদ্ধের অবসানের পর ইউরোপের নিরাপত্তা পরিবেশ এত গভীরভাবে বদলায়নি। বড় পরিসরের যুদ্ধের প্রত্যাবর্তন, ধারাবাহিক সাইবার হামলা, নাশকতা, বিভ্রান্তিমূলক প্রচার এবং বিভিন্ন আগ্রাসী কর্মকাণ্ড মনে করিয়ে দিচ্ছে, ইউরোপের নিরাপত্তা এখন আর স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিশ্চিত নয়। তবে তাঁদের মতে, অংশীদারিত্ব, প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা সক্ষমতা এবং রাজনৈতিক দৃঢ়তা কাজে লাগাতে পারলে ইউরোপ এই সাম্প্রতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারবে।
দুই দেশের সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে নতুন প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা উদ্ভাবন এবং পারস্পরিক কার্যক্ষমতা আরও বাড়ানোর ওপরও জোর দিয়েছেন তাঁরা। উদ্দেশ্য, সংকটের মুহূর্তে ব্রিটিশ, সুইডিশ ও অন্যান্য ন্যাটো বাহিনী যেন দ্রুত এবং নির্বিঘ্নে একসঙ্গে কাজ করতে পারে। তাঁদের মতে, উত্তর ইউরোপ, আর্কটিক, বাল্টিক সাগর এবং ন্যাটোর উত্তর ফ্ল্যাঙ্ক এখন ইউরো-আটলান্টিক নিরাপত্তার কেন্দ্রীয় ক্ষেত্র।
এই সতর্কতা এসেছে এমন এক সময়ে, যখন ২৪ সেপ্টেম্বর ফিনল্যান্ড ও সুইডেন প্রথমবার যৌথভাবে যুদ্ধবিমান উড়িয়ে ফিনল্যান্ড উপসাগরের আন্তর্জাতিক আকাশসীমায় রুশ সামরিক বিমান শনাক্ত ও অনুসরণ করে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপে মোতায়েন প্রায় ৮০ হাজার সেনার মধ্যে প্রায় ২৫ হাজার বা তার বেশি সেনা প্রত্যাহারের একটি সম্ভাব্য পরিকল্পনা পর্যালোচনা করছে বলে এনবিসি নিউজ জানিয়েছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি।
উত্তেজনা আরও বাড়িয়েছে কালিনিনগ্রাদ ঘিরে মস্কোর সাম্প্রতিক হুঁশিয়ারি। বুধবার রাশিয়া ন্যাটোকে জানায়, বাল্টিক সাগরঘেরা তাদের এই বিচ্ছিন্ন ভূখণ্ডকে অবরুদ্ধ করার চেষ্টা হলে প্রয়োজন পড়লে পারমাণবিক অস্ত্রসহ পুরো সামরিক সক্ষমতা ব্যবহার করা হতে পারে। ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটে জবাবে বলেছেন, “পারমাণবিক হুমকি বন্ধ করুন।” ন্যাটো জানিয়েছে, তারা একটি প্রতিরক্ষামূলক জোট এবং তাদের সামরিক তৎপরতা রুশ ভূখণ্ডের বিরুদ্ধে নয়।
নাইটন ও ক্লেসনের বক্তব্যের মূল সুর অবশ্য যুদ্ধকে অনিবার্য বলা নয়, বরং প্রতিরোধকে বিশ্বাসযোগ্য করা। তাঁদের যুক্তি, দুর্বলতা আগ্রাসনকে উৎসাহিত করতে পারে, আর প্রস্তুতি ও ঐক্য সম্ভাব্য প্রতিপক্ষকে বোঝায় যে হামলার মূল্য যেকোনো সম্ভাব্য লাভের চেয়ে বেশি হবে। মানুষ, সমাজ, প্রতিরক্ষা শিল্প এবং সামরিক সক্ষমতায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে ন্যাটোর উত্তর ফ্ল্যাঙ্ককে শক্তিশালী করাই এখন তাঁদের অগ্রাধিকার।
দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট জানিয়েছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার গত বছর নাইটনকে এই পদে বেছে নিয়েছিলেন, তখন ব্রিটিশ সামরিক কাঠামোর সর্বোচ্চ পেশাদার পদে।
স্যার রিচার্ড নাইটন ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ব্রিটেনের চিফ অব দ্য ডিফেন্স স্টাফ। এর আগে তিনি রয়্যাল এয়ার ফোর্সের প্রধান ছিলেন। সুইডেনের জেনারেল মাইকেল ক্লেসন ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক। দুই সেনাপ্রধানের বার্তা এক জায়গায় মিলেছে: অনিশ্চিত সময়ে ইউরোপের নিরাপত্তা অন্য কারও দায়িত্ব নয়, নিজেদের প্রস্তুতি, ঐক্য এবং প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপরই শান্তির ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে।



