ইইউ বাজারে নতুন প্রতিদ্বন্দ্বী, আয়ারল্যান্ডের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ

এআই নির্মিত ছবি
কানাডাকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রথম সহযোগী সদস্য’ করার প্রস্তাব ঘিরে ইউরোপের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সভাপতি রোবের্তা মেতসোলা ইঙ্গিত দিয়েছেন, কানাডার পথ অনুসরণ করে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডও ভবিষ্যতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের দিকে এগোতে পারে। তিনটি দেশই এখনো পূর্ণ সদস্য হওয়ার প্রক্রিয়ায় নেই বরং প্রস্তাবিত সহযোগী সদস্যপদের কাঠামোই এখনও নির্ধারিত হয়নি। তবু এই উদ্যোগ সফল হলে আয়ারল্যান্ডের অর্থনীতি ও শ্রমবাজারে এর প্রভাব কম হবে না। কারণ আয়ারল্যান্ডের অর্থনৈতিক শক্তির একটি বড় অংশ দাঁড়িয়ে আছে বিদেশি বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং ইউরোপের একক বাজারে সহজ প্রবেশাধিকারের ওপর। নতুন তিন দেশ যদি ইউরোপের সঙ্গে এমন সম্পর্ক পায়, যাতে তাদের পণ্য, পরিষেবা, বিনিয়োগ কিংবা কর্মীদের জন্য ইউরোপের বাজারে প্রবেশ অনেক সহজ হয়ে যায়, তাহলে আয়ারল্যান্ডকে একই বিনিয়োগের জন্য আরও কঠিন প্রতিযোগিতায় নামতে হতে পারে।
তবে এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি। কানাডা এখন ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দিচ্ছে না। ইউরোপীয় কমিশনের সভাপতি উরসুলা ফন ডার লায়েন ১৬ সেপ্টেম্বর কানাডাকে প্রথম সহযোগী সদস্য করার প্রস্তাব দিয়েছেন। কিন্তু এই ধরনের সদস্যপদ ইউরোপীয় ইউনিয়নের বর্তমান চুক্তিতে নেই। কানাডাও বলেছে, তারা পূর্ণ সদস্যপদ চাইছে না বরং বিশেষ ধরনের ঘনিষ্ঠ অংশীদারত্ব নিয়ে আলোচনা করতে আগ্রহী। আগামী ২৯ ও ৩০ অক্টোবর কানাডায় অনুষ্ঠেয় ইউরোপীয় ইউনিয়ন-কানাডা শীর্ষ বৈঠকে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হতে পারে।
তবু প্রস্তাবটি আয়ারল্যান্ডের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশটি দীর্ঘদিন ধরে কানাডীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ইউরোপের প্রবেশদ্বার হিসেবে নিজেকে তুলে ধরেছে। জুনে কানাডা ও আয়ারল্যান্ডের যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, কানাডীয় প্রতিষ্ঠানগুলো আয়ারল্যান্ডে প্রায় ২৬ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত। একইভাবে আইরিশ প্রতিষ্ঠানগুলো কানাডায় ৩০ হাজারের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান দিয়েছে। কানাডা ও আয়ারল্যান্ড দুই দেশই বাণিজ্য ও বিনিয়োগ আরও বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই অবস্থায় কানাডা যদি ভবিষ্যতে আয়ারল্যান্ডে কার্যালয় স্থাপন না করেও ইউরোপের বড় অংশের বাজারে একই ধরনের সুবিধা পায়, তাহলে আয়ারল্যান্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ-সুবিধা দুর্বল হতে পারে। একই কথা অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সভাপতি মেতসোলা ইতিমধ্যে বলেছেন, কানাডার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের পর অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের মতো দেশও একই ধরনের সম্পর্কের দিকে আসতে পারে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে আয়ারল্যান্ডের বিনিয়োগ কমবেই। বরং নতুন সম্পর্কের ফলে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের প্রতিষ্ঠানগুলো ইউরোপে আরও বেশি বিনিয়োগ করতে পারে। তার একটি অংশ আয়ারল্যান্ডেও আসতে পারে। কিন্তু প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রটি তখন শুধু ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; ইউরোপের বাইরের উন্নত অর্থনীতিগুলোর প্রতিষ্ঠানও একই বাজারে আরও সহজে প্রতিযোগিতা করতে পারবে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে আয়ারল্যান্ডের বিদেশি বিনিয়োগের শক্তি অবশ্যই উল্লেখযোগ্য। আয়ারল্যান্ডের শিল্প উন্নয়ন সংস্থার হিসাবে, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ১৯০টি নতুন বিনিয়োগ নিশ্চিত হয়েছে, যার মাধ্যমে ১০ হাজার ৪১০টি নতুন কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি এসেছে। প্রযুক্তি, জীবনবিজ্ঞান, প্রকৌশল ও আর্থিক পরিষেবায় এসব বিনিয়োগের বড় অংশ হয়েছে। কিন্তু একই সংস্থা সতর্ক করেছে, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের জন্য বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগিতা তীব্র হচ্ছে। বিনিয়োগ ধরে রাখতে ও নতুন বিনিয়োগ আনতে অবকাঠামো, জ্বালানি, আবাসন, দক্ষ কর্মী, উদ্ভাবন এবং পরিকল্পনা ব্যবস্থার উন্নতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। অর্থাৎ কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডকে নতুন সুবিধা দেওয়া হলে আয়ারল্যান্ডের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান শুধু করব্যবস্থার ওপর নির্ভর করবে না। কোন দেশে পর্যাপ্ত আবাসন আছে, কোথায় দক্ষ কর্মী পাওয়া যায়, কোথায় বিদ্যুৎ ও পরিবহন অবকাঠামো উন্নত, কোথায় ব্যবসা স্থাপন দ্রুত—এসব বিষয় বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
শ্রমবাজারের ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে। আয়ারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান দপ্তরের হিসাবে, ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে কর্মরত মানুষের সংখ্যা বছরে ২১ হাজার ২০০ জন বেড়ে ২৮ লাখ ৩৯ হাজার ৩০০ হয়েছে। কিন্তু কর্মসংস্থানের বৃদ্ধির হার ছিল মাত্র শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ। একই সময়ে বেকারত্বের হার বেড়ে ৫ দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে, যা এক বছর আগে ছিল ৪ দশমিক ৮ শতাংশ। আগস্টে বেকারত্বের হার ছিল ৫ শতাংশ, যা এক বছর আগের তুলনায় শূন্য দশমিক ১ শতাংশীয় বিন্দু বেশি। তরুণদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও কঠিন—১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের বেকারত্বের হার আগস্টে ছিল ১২ দশমিক ৩ শতাংশ। এমন সময়ে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের নাগরিকদের জন্য ইউরোপে কাজের সুযোগ বাড়লে আয়ারল্যান্ডের শ্রমবাজারে দ্বিমুখী প্রভাব পড়তে পারে। যেসব খাতে কর্মীর ঘাটতি রয়েছে, সেখানে বিদেশি দক্ষ কর্মীর প্রবাহ আয়ারল্যান্ডের জন্য সুবিধা বয়ে আনতে পারে। স্বাস্থ্যসেবা, প্রকৌশল, নির্মাণ, গবেষণা ও উচ্চদক্ষ প্রযুক্তিনির্ভর পেশায় অতিরিক্ত কর্মী পাওয়া গেলে প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্প্রসারণ সহজ হতে পারে। উৎপাদন বাড়লে নতুন কর্মসংস্থানও তৈরি হতে পারে।
কিন্তু যেসব পেশায় চাকরির সংখ্যা সীমিত এবং স্থানীয় কর্মীদের প্রতিযোগিতা বেশি, সেখানে নতুন কর্মীর প্রবাহ প্রতিযোগিতা বাড়াতে পারে। শ্রমিকের সরবরাহ দ্রুত বাড়লে কিছু ক্ষেত্রে মজুরি বৃদ্ধির গতি কমে যাওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে। তবে এর মাত্রা নির্ভর করবে কোন পেশায় কত মানুষ আসছেন এবং সেই সময়ে ওই পেশায় শ্রমিকের চাহিদা কতটা—তার ওপর। আয়ারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি তথ্য দিয়েছে। ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে আয়ারল্যান্ডে কর্মসংস্থানের বার্ষিক নিট বৃদ্ধির পুরোটা এসেছে অ-আইরিশ কর্মীদের মাধ্যমে; একই সময়ে আইরিশ কর্মীদের কর্মসংস্থান কমেছে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে কর্মসংস্থান অনুমতিপত্রের সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় ৩৩ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে। এ থেকে বোঝা যায়, আয়ারল্যান্ডের অর্থনীতি ইতিমধ্যেই বিদেশি কর্মীদের ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল। ফলে নতুন কোনো শ্রমিক চলাচল ব্যবস্থা চালু হলে তার প্রভাবও তুলনামূলকভাবে দ্রুত দেখা যেতে পারে। তবে শ্রমিকের সংখ্যা বাড়া মানেই আয়ারল্যান্ডের মানুষের চাকরি কমে যাওয়া নয়। বিদেশি কর্মীরা যদি এমন খাতে যান যেখানে কর্মীর ঘাটতি রয়েছে, তাহলে তাঁরা অর্থনীতির উৎপাদনক্ষমতা বাড়াতে পারেন। নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলে কিংবা পুরোনো প্রতিষ্ঠান সম্প্রসারিত হলে অতিরিক্ত কর্মসংস্থানও তৈরি হতে পারে।
সবচেয়ে বড় চাপ আসতে পারে আবাসন খাতে। বিদেশি বিনিয়োগ বাড়লে এবং দক্ষ কর্মীর আগমন অব্যাহত থাকলে বাড়ির চাহিদাও বাড়বে। ইতিমধ্যে আয়ারল্যান্ডের শিল্প উন্নয়ন সংস্থা বিদেশি বিনিয়োগ ধরে রাখার গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে আবাসনকে উল্লেখ করেছে। ফলে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে ইউরোপের সম্পর্ক যত গভীর হবে, আয়ারল্যান্ডের জন্য ততই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে—নতুন কর্মী ও বিনিয়োগ গ্রহণের মতো পর্যাপ্ত আবাসন, পরিবহন, বিদ্যুৎ ও জনসেবা দেশটি দিতে পারছে কি না। বাণিজ্যেও একই সঙ্গে সুযোগ ও চাপ তৈরি হতে পারে। অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা শেষ হয়েছে। ভবিষ্যতে এই সম্পর্ক আরও গভীর হলে আইরিশ খাদ্য, ওষুধ, শিক্ষা, আর্থিক পরিষেবা ও অন্যান্য রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানের জন্য অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের বাজারে সুযোগ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে ওই দেশগুলোর প্রতিষ্ঠানও ইউরোপীয় বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাবে। অর্থাৎ আয়ারল্যান্ডের সামনে সম্ভাব্য চিত্রটি একেবারে একমুখী নয়। নতুন বাজার যেমন খুলবে, তেমনি প্রতিযোগীও বাড়বে। নতুন দক্ষ কর্মী যেমন আসবেন, তেমনি কিছু পেশায় চাকরির প্রতিযোগিতাও বাড়তে পারে। নতুন বিনিয়োগ যেমন আসতে পারে, তেমনি আয়ারল্যান্ডে বিনিয়োগ স্থাপনের বিশেষ আকর্ষণ ধরে রাখার জন্য সরকারের ওপর চাপও বাড়বে।
সবশেষে তাই কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড ইউরোপের আরও কাছে আসছে। এই ঘটনাকে শুধু আয়ারল্যান্ডের জন্য বিপদ বা সুযোগ হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়বে না। আসল বিষয় হবে, সহযোগী সদস্যপদের অধীনে এসব দেশকে ইউরোপীয় বাজার, শ্রমবাজার ও বিভিন্ন কর্মসূচিতে কতটা প্রবেশাধিকার দেওয়া হয়। যদি সুবিধা সীমিত থাকে, আয়ারল্যান্ডের ওপর প্রভাবও সীমিত থাকতে পারে। কিন্তু যদি পণ্য, পরিষেবা, বিনিয়োগ ও মানুষের চলাচলে ব্যাপক সুবিধা দেওয়া হয়, তাহলে আয়ারল্যান্ডকে তার বহুদিনের অর্থনৈতিক সুবিধা নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে। ইউরোপের দরজা যদি কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের জন্য আরও খুলে যায়, তাহলে আয়ারল্যান্ডের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হবে দরজা বন্ধ করা নয় বরং সেই দরজার ভেতরে নিজের অবস্থান কতটা শক্ত রাখা যায় সেটিরই বহিঃপ্রকাশ।



