গোপন নথির পাহারাদারই গুপ্তচর
জার্মানির সাবেক গোয়েন্দাপ্রধান কারাগারে
- প্রায় ২ হাজার গোপন নথির অভিযোগ, বিচারপূর্ব আটক অগুস্ট হ্যানিং ও তার সহযোগী
- স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আলাদা তদন্ত, সংসদীয় নজরদারি কমিটির বিশেষ পর্যালোচনা
- আজারবাইজানের নাম ঘিরে জল্পনা প্রত্যাখ্যান করেছে বাকু

জার্মানির সাবেক গোয়েন্দাপ্রধান অগুস্ট হ্যানিং
রাষ্ট্রের সবচেয়ে গোপন কক্ষের চাবি একসময় ছিল তার হাতে। এখন সেই মানুষই বিচারপূর্ব আটক। অভিযোগ, দায়িত্ব ছাড়ার পরও বছরের পর বছর তিনি পেয়েছেন গোয়েন্দা সংস্থার অতি সংবেদনশীল নথি। সেগুলোর কিছু বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার স্বার্থে ব্যবহারের সন্দেহও করছে তদন্তকারীরা।
অগুস্ট হ্যানিংকে ঘিরে কেলেঙ্কারি তাই আর একজন সাবেক গোয়েন্দাপ্রধানের মামলায় আটকে নেই। বৃহস্পতিবার তা পৌঁছে গেছে জার্মান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পার্লামেন্টের গোয়েন্দা তদারকি ব্যবস্থার ভেতরেও।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চল্যান্ডফুংকে প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হ্যানিং-কাণ্ডের পর সাবেক শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের বেসরকারি কর্মকাণ্ডে আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণের দাবি জোরালো হয়েছে। একই সঙ্গে জার্মান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাঁর মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালনের সময়ও গোপনীয়তার বিধি লঙ্ঘিত হয়েছিল কি না, তা পরীক্ষা করছে।
৮০ বছর বয়সী হ্যানিং ১৯৯৮ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত জার্মানির বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা ফেডারেল ইন্টেলিজেন্স সার্ভিসের প্রধান ছিলেন। এরপর ২০০৫ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সরকারি চাকরি ছাড়ার পর নিরাপত্তা পরামর্শক হিসেবে কাজ শুরু করেন তিনি।
মঙ্গলবার তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। বুধবার কার্লসরুহের ফেডারেল কোর্ট অব জাস্টিসের তদন্তকারী বিচারক তাকে বিচারপূর্ব আটকে রাখার নির্দেশ দেন। তাঁর সাবেক কার্যালয়প্রধান মানফ্রেড ডি-ও একই মামলায় আটক আছেন। হ্যানিংয়ের বিরুদ্ধে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার হয়ে কাজ, রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য সংগ্রহ, রাষ্ট্রদ্রোহমূলক গুপ্তচরবৃত্তি এবং রাষ্ট্রদ্রোহের চেষ্টার সন্দেহ রয়েছে।
প্রসিকিউটরদের ধারণা, ২০১০ সালের দিকে হ্যানিং ও মানফ্রেডের মধ্যে একটি বোঝাপড়া হয়। এরপর প্রায় ১২ বছর ধরে মানফ্রেড অর্থের বিনিময়ে তাঁর সাবেক প্রধানকে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করেন। ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত হ্যানিং প্রায় দুই হাজার নথি পেয়েছিলেন বলে অভিযোগ। এর অনেকগুলো ছিল গোয়েন্দা সংস্থার অভ্যন্তরীণ ব্যবহারের জন্য সংরক্ষিত। কিছু নথি চ্যান্সেলরের কার্যালয়ের উচ্চপর্যায়ের গোয়েন্দা বৈঠকের প্রস্তুতিতেও ব্যবহৃত হতো।
ব্রিটিশ দৈনিক ফিন্যান্সিয়াল টাইমস বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, হ্যানিংয়ের আইনজীবী তাঁর কাছে গোপন নথি থাকার বিষয়টি অস্বীকার করেননি। তবে অর্থের বিনিময়ে সেগুলো সংগ্রহ বা জার্মানির ক্ষতি হয় এমনভাবে বিদেশিদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁর বক্তব্য, রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই।
অভিযোগের সবচেয়ে গুরুতর অংশ বিদেশি গোয়েন্দা সংযোগ নিয়ে। প্রসিকিউটরদের সন্দেহ, হ্যানিং ওই নথির তথ্য ব্যবহার করে একটি বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তার জন্য বিশ্লেষণ তৈরি করেছিলেন। সেটি শেষ পর্যন্ত ওই কর্মকর্তার হাতে পৌঁছেছিল কি না, এখনও নিশ্চিত নয়। আরেকটি বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধির কাছে সংবেদনশীল রাজনৈতিক তথ্য দেওয়ার অভিযোগও তদন্তাধীন।
জার্মান সাময়িকী ডের স্পিগেল সম্ভাব্য আজারবাইজান-সংযোগের কথা জানিয়েছিল। তবে জার্মান প্রসিকিউটররা প্রকাশ্যে কোনো দেশের নাম বলেননি। আজারবাইজানও অভিযোগ দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। দেশটির গণমাধ্যম ও সম্প্রচার পরিষদ বলেছে, তদন্তের সঙ্গে আজারবাইজানকে যুক্ত করা “ভিত্তিহীন অপতথ্য”।
বৃহস্পতিবার ঘটনার আরও বড় রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া সামনে এসেছে। জার্মান পার্লামেন্টের গোয়েন্দা তদারকি কমিটি হ্যানিং-কাণ্ড নিয়ে বিশেষ পর্যালোচনার নির্দেশ দিয়েছে। কমিটির স্থায়ী প্রতিনিধিকে বিরল একটি তাৎক্ষণিক নিয়ন্ত্রণমূলক তদন্ত চালাতে বলা হয়েছে। তিনি নথি দেখতে, গোয়েন্দা কার্যালয়ে প্রবেশ করতে এবং কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবেন। লক্ষ্য শুধু কী ঘটেছে তা জানা নয়। কোথায় কাঠামোগত বা সাংগঠনিক দুর্বলতা ছিল, সেটিও খুঁজে বের করা।
কোলন বিশ্ববিদ্যালয়ের গোয়েন্দা গবেষণা কেন্দ্রের ব্যবস্থাপনা পরিচালক লুকা মান্স আরও কঠোর নিয়মের দাবি তুলেছেন। তাঁর মতে, নিরাপত্তাসংক্রান্ত উচ্চপদে থাকা কর্মকর্তাদের অবসরের পর বেসরকারি কাজ করতে হলে দীর্ঘমেয়াদে অনুমোদন নেওয়া বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত। বর্তমানে চাকরি ছাড়ার পর সর্বোচ্চ পাঁচ বছর পর্যন্ত এমন বিধিনিষেধ কার্যকর হতে পারে। লবি কন্ট্রোল নামের সংগঠনটি নিরাপত্তাসংক্রান্ত সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তাদের জন্য আজীবন নিয়ন্ত্রণের প্রস্তাব দিয়েছে।
জার্মান পার্লামেন্টের তদারকি কমিটি ২০২৩ সালেই সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের জন্য আরও কঠোর স্বচ্ছতা ও বিরতি-সংক্রান্ত নিয়মের সুপারিশ করেছিল। সেগুলোর অনেকটাই বাস্তবায়িত হয়নি। হ্যানিং-কাণ্ডের পর সেই পুরোনো সতর্কবার্তাও এখন নতুন গুরুত্ব পাচ্ছে।
তদন্তের সূত্রও এসেছে একেবারে অন্য একটি মামলা থেকে। হামবুর্গের ধনী ব্লক পরিবারের সন্তানদের ডেনমার্ক থেকে জোর করে ফিরিয়ে আনার অভিযোগ তদন্ত করতে গিয়ে ২০২৫ সালে হ্যানিংয়ের স্থাপনায় তল্লাশি চালানো হয়েছিল। সেখানেই অতি গোপন গোয়েন্দা নথির সন্ধান মেলে। পরে বিষয়টি ফেডারেল প্রসিকিউটরদের নজরে যায়।
হ্যানিংয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ এখনও আদালতে প্রমাণিত হয়নি। কিন্তু ক্ষতির প্রশ্ন ইতিমধ্যে বড় হয়ে উঠেছে। গোয়েন্দা বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, মিত্রদেশগুলোর দেওয়া সংবেদনশীল তথ্যও যদি ফাঁস হয়ে থাকে, তবে জার্মানির সঙ্গে ভবিষ্যতে তথ্য ভাগাভাগির ক্ষেত্রে অংশীদার দেশগুলো আরও সতর্ক হতে পারে।
১৯৭৪ সালে পূর্ব জার্মানির গুপ্তচর গুন্টার গিয়োমের ঘটনায় পশ্চিম জার্মানির রাজনীতি কেঁপে উঠেছিল। সেই ঘটনায় পশ্চিম জার্মানির চ্যান্সেলর উইলি ব্রান্টকে পদ ছাড়তে হয়েছিল। হ্যানিং-কাণ্ডকে এখনই সেই ঘটনার সমতুল্য বলতে সতর্ক করেছেন কর্মকর্তারা। কারণ তদন্ত এখনও চলছে। ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণও অজানা।
তবু এবারের অস্বস্তি অন্য জায়গায়। যাঁর পেশাজীবনের কাজই ছিল বিদেশি গুপ্তচর শনাক্ত করা, আজ তিনিই বিদেশি গোয়েন্দা স্বার্থে কাজের সন্দেহে বন্দি।
আদালত শেষ পর্যন্ত তাঁর ব্যক্তিগত দায় নির্ধারণ করবে। কিন্তু বৃহস্পতিবার থেকে প্রশ্নটি আরও বড় হয়েছে। জার্মান গোয়েন্দা ব্যবস্থার সবচেয়ে গোপন দরজায় যদি একসময় দায়িত্বে থাকা মানুষই পরে ফিরে আসতে পারেন পুরোনো চাবি নিয়ে, তবে সেই দরজার তালাটাই কি নতুন করে পরীক্ষা করার সময় আসেনি?



