ইসরায়েল
বার্নহ্যামের ব্রিটেনের সঙ্গে সম্পর্ক 'জমাট’

যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামের সরকারের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক এখন ’জমাট’ অবস্থায় রয়েছে বলে জানিয়েছে তেল আবিব। গাজা যুদ্ধ, পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্পর্ক নিয়ে লন্ডনের কঠোর অবস্থানের কারণে দুই দেশের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে নতুন করে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে।
ইসরায়েলি পক্ষের এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ব্রিটিশ সরকার ইসরায়েলের সঙ্গে বিদ্যমান বাণিজ্য চুক্তি স্থগিত করার সম্ভাবনাও একসময় বিবেচনা করেছিল বলে খবর। স্কাই নিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজা ও পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের কারণে যুক্তরাজ্য সরকার এই পদক্ষেপের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে মূল্যায়ন করেছিল।
তবে শেষ পর্যন্ত চুক্তি স্থগিত করেনি লন্ডন। কিন্তু এই আলোচনা থেকেই স্পষ্ট, গাজা যুদ্ধের পর ইসরায়েলের সঙ্গে ব্রিটেনের সম্পর্ক আগের মতো স্বাভাবিক জায়গায় নেই।
কেন তৈরি হলো দূরত্ব?
বার্নহ্যাম ক্ষমতায় আসার আগেই গাজা ইস্যুতে লেবারের অবস্থান নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছিল। তিনি এর আগে গাজায় যুদ্ধবিরতি, মানবিক সহায়তা বৃদ্ধি এবং ইসরায়েলের ওপর আরও চাপ প্রয়োগের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন।
নতুন সরকারের একাধিক মন্ত্রীও ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ড নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং বলেছেন, গাজা ও পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের কিছু কর্মকাণ্ড ব্রিটিশ সামরিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এদিকে ব্রিটিশ সরকার পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে আপত্তি জানিয়ে আসছে। লন্ডনের অবস্থান, আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো কর্মকাণ্ডকে তারা সমর্থন করে না।
বাণিজ্য চুক্তি নিয়েও কেন উঠেছিল প্রশ্ন?
যুক্তরাজ্য ও ইসরায়েলের মধ্যে বাণিজ্য সম্পর্ক বহুদিনের। ব্রেক্সিটের পর দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য সুবিধা বজায় রাখতে একটি ট্রেড পার্টনারশিপ চুক্তি কার্যকর রয়েছে।
কিন্তু গাজা পরিস্থিতি ও পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ নিয়ে চাপ বাড়ার পর ব্রিটিশ সরকারের মধ্যে প্রশ্ন ওঠে, এই বাণিজ্য সম্পর্ক আগের মতো রাখা হবে কি না।
সরকারি মূল্যায়নে চুক্তি স্থগিত হলে অর্থনৈতিক প্রভাব কী হতে পারে, সেটিও বিবেচনা করা হয়েছিল। তবে লন্ডন শেষ পর্যন্ত কূটনৈতিক চাপ বজায় রেখে বাণিজ্য সম্পর্ক চালিয়ে যাওয়ার পথ বেছে নেয়।
‘সম্পর্ক জমাট’, ইসরায়েলের বার্তা
ব্রিটিশ দৈনিক টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, বার্নহ্যাম সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক বর্তমানে অত্যন্ত কঠিন পর্যায়ে রয়েছে। বিশেষ করে গাজা ইস্যুতে লন্ডনের অবস্থান নিয়ে তেল আবিবের অসন্তোষ বাড়ছে।
ইসরায়েলের দৃষ্টিতে, ব্রিটেনের নতুন সরকারের বক্তব্য ও পদক্ষেপ দুই দেশের ঐতিহাসিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তবে ব্রিটিশ সরকারের অবস্থান হলো, ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখেই আন্তর্জাতিক আইন, মানবিক মূল্যবোধ এবং মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির পক্ষে চাপ প্রয়োগ করা সম্ভব।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য
বার্নহ্যামের জন্য ইসরায়েল ইস্যু শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নীতি নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্কের সঙ্গেও যুক্ত।
যুক্তরাষ্ট্র ঐতিহাসিকভাবে ইসরায়েলের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্রদের একটি। ফলে লন্ডনকে একদিকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে হচ্ছে, অন্যদিকে গাজা ইস্যুতে নিজেদের অবস্থানও স্পষ্ট করতে হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ভারসাম্য রক্ষা করাই বার্নহ্যাম সরকারের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম বড় পরীক্ষা হতে পারে।
ব্রিটেনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও প্রভাব
ফিলিস্তিন-ইসরায়েল ইস্যু ব্রিটেনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে লেবার পার্টির বামপন্থী অংশ এবং মুসলিম ভোটারদের একটি অংশ গাজা বিষয়ে সরকারের অবস্থানের দিকে নজর রাখছে।
অন্যদিকে লেবারের একটি অংশ মনে করে, আন্তর্জাতিক মঞ্চে ব্রিটেনের বিশ্বাসযোগ্যতা ধরে রাখতে মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের বিষয়ে কঠোর অবস্থান প্রয়োজন।
ফলে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কের এই টানাপোড়েন শুধু কূটনৈতিক বিষয় নয়, বার্নহ্যামের জন্য ঘরোয়া রাজনৈতিক পরীক্ষাও।
নতুন যুগের শুরু, নাকি সাময়িক দূরত্ব?
যুক্তরাজ্য ও ইসরায়েলের সম্পর্ক বহু দশকের। নিরাপত্তা, প্রযুক্তি ও বাণিজ্যে দুই দেশের সহযোগিতা রয়েছে। কিন্তু গাজা যুদ্ধ সেই সম্পর্কে বড় চাপ তৈরি করেছে।
বার্নহ্যাম সরকার এখন এমন এক অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে তাকে একই সঙ্গে মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে এবং গাজা ও পশ্চিম তীর নিয়ে দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক প্রত্যাশার জবাব দিতে হবে।
ইসরায়েলের "সম্পর্ক জমাট" মন্তব্য সেই দূরত্বেরই প্রকাশ। এখন দেখার বিষয়, এই দূরত্ব দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক পরিবর্তনে রূপ নেয়, নাকি আলোচনার মাধ্যমে আবার আগের ভারসাম্যে ফিরতে পারে লন্ডন-তেল আবিব সম্পর্ক।




