উগ্রবাদ দমনে নতুন কৌশল ঘোষণা যুক্তরাজ্যের

সংগৃহীত ছবি
সামাজিক সম্প্রীতি জোরদার এবং উগ্রবাদ মোকাবিলায় নতুন নীতিগত কাঠামো প্রকাশ করেছে যুক্তরাজ্য সরকার। সরকার বলছে, বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, অনলাইনে উগ্রবাদী প্রচার এবং সমাজে বিভাজন বাড়ার ফলে জাতীয় স্থিতিশীলতার ওপর ঝুঁকি বাড়ছে।
‘প্রোটেক্টিং হোয়াট ম্যাটারস: টুওয়ার্ডস আ মোর কনফিডেন্ট, কোহিসিভ, অ্যান্ড রেজিলিয়েন্ট ইউনাইটেড কিংডম’ শীর্ষক এই নীতিপত্রে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে একটি কর্মসূচি তুলে ধরা হয়েছে। এর লক্ষ্য হচ্ছে সামাজিক সংহতি বৃদ্ধি, উগ্রবাদ মোকাবিলা এবং ভুয়া তথ্য ও বিদেশি হস্তক্ষেপের প্রভাব মোকাবিলা করা।
নীতিপত্রে বলা হয়েছে, বর্তমান সময়ে সামাজিক সম্প্রীতির বিষয়টি সরাসরি জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে উঠেছে। কারণ শত্রুভাবাপন্ন রাষ্ট্র ও উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো ক্রমেই ব্রিটিশ সমাজের অভ্যন্তরীণ বিভাজনকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে।
প্রতিবেদনের ভূমিকায় প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বলেছেন, শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ সমাজই জাতীয় স্থিতিশীলতার ভিত্তি। তিনি লিখেছেন, ‘সামাজিক সংহতি নিজেই একটি গুরুত্বপূর্ণ মূল্যবোধ। একই সঙ্গে এটি আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার স্থিতিশীলতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। সহজভাবে বললে, বিশ্বমঞ্চে শক্ত অবস্থান নিতে চাইলে দেশের ভেতরে শক্ত ও ঐক্যবদ্ধ সমাজ গড়ে তুলতে হবে।’
সরকার বলেছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন কারণে সামাজিক সংহতির ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে অর্থনৈতিক সংকট, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, জনসংখ্যাগত রূপান্তর এবং উগ্রবাদের বিস্তার।
প্রতিবেদনটিতে সতর্ক করা হয়েছে, বিদেশি শক্তিগুলো বিভ্রান্তিমূলক তথ্য ছড়িয়ে এবং প্রভাব বিস্তারমূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে ব্রিটিশ সমাজে বিভাজন আরও বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
পরিকল্পনায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে স্থানীয় সম্প্রদায়ের উন্নয়নে বিনিয়োগ, অভিবাসন ও একীভূতকরণ নীতির সংস্কার, ঘৃণাজনিত অপরাধ মোকাবিলায় কঠোর ব্যবস্থা এবং উগ্রবাদী সংগঠনের বিরুদ্ধে অধিক ক্ষমতা প্রদান।
‘প্রাইড ইন প্লেস’ কর্মসূচি সম্প্রসারণের প্রস্তাবও রয়েছে। এর মাধ্যমে স্থানীয় এলাকাগুলোর উন্নয়ন ও নাগরিক সম্পৃক্ততা বাড়াতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন দেওয়া হবে।
এ ছাড়া বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়ের জন্য একটি নতুন ‘সোশ্যাল কোহেশন টাস্কফোর্স’ গঠন করা হবে এবং প্রতিবছর অগ্রগতি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে।
অভিবাসন ও একীভূতকরণও এই কৌশলের একটি বড় অংশ। সরকারের মতে, ভবিষ্যতে নীতিতে ইংরেজি ভাষা শেখা, কর্মসংস্থানে অংশগ্রহণ এবং নাগরিক জীবনে সম্পৃক্ততার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে।
নীতিপত্রে ‘আর্নড সেটেলমেন্ট’ নামে নতুন একটি ব্যবস্থার কথাও বলা হয়েছে। এর আওতায় সাধারণভাবে অভিবাসীদের স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পেতে যুক্তরাজ্যে অন্তত ১০ বছর থাকতে হবে। তবে যারা উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবেন, তাদের ক্ষেত্রে সময় কমানোর সুযোগ রাখা হবে।
এর পাশাপাশি অবৈধ অভিবাসন কমানো এবং আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য হোটেল ব্যবহারের প্রথা ধীরে ধীরে বন্ধ করার পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনটিতে উগ্রবাদ মোকাবিলার বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ইসলামপন্থী উগ্রবাদ এবং চরম ডানপন্থী মতাদর্শ—দুটিই এখনও গুরুতর হুমকি হিসেবে রয়ে গেছে।
প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও বাড়তি নজরদারি থাকবে। অনলাইন সেফটি আইনের আওতায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ক্ষতিকর কনটেন্ট ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে ব্যবস্থা নিতে হবে এবং অ্যালগরিদম কীভাবে কাজ করে সে বিষয়ে আরও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
ধর্মীয় বিদ্বেষ মোকাবিলার জন্যও নতুন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে মুসলিমবিদ্বেষ ও ইহুদিবিদ্বেষ মোকাবিলায় নতুন কর্মসূচি, উপাসনালয়ের নিরাপত্তা জোরদারে অতিরিক্ত অর্থায়ন, মুসলিমবিদ্বেষের নতুন সংজ্ঞা নির্ধারণ এবং ঘৃণাজনিত অপরাধের অভিযোগ জানানো ও তদন্তে সহায়তা বৃদ্ধি।
সরকারের মতে, এই কৌশল দীর্ঘমেয়াদি একটি উদ্যোগের সূচনা মাত্র। লক্ষ্য হলো সামাজিক স্থিতিশীলতা শক্তিশালী করা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুরক্ষিত রাখা।
নীতিপত্রে বলা হয়েছে,‘’আত্মবিশ্বাসী, সংহত ও স্থিতিশীল সমাজ গড়ে তোলা পুরো সমাজের যৌথ দায়িত্ব।’ কেন্দ্রীয় সরকার এ ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসন, বিকেন্দ্রীকৃত প্রশাসন এবং নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করবে।




