কনস্যুলেট গেল, মিশন রইল
ইসরায়েলের চাপে জেরুজালেমে ব্রিটেনের কূটনৈতিক পালাবদল

পূর্ব জেরুজালেমে ব্রিটিশ কনস্যুলেট
পূর্ব জেরুজালেমের শেখ জাররাহতে উঁচু দেয়ালের ভেতর ব্রিটিশ পতাকা এখনও উড়ছে। কিন্তু দরজার পরিচয় বদলে গেছে। প্রায় দুই শতকের পুরোনো ব্রিটিশ কনস্যুলেট আর সেই নামে থাকছে না। ইসরায়েলের বন্ধের নির্দেশের পর নতুন সমঝোতায় ভবনটি এখন থেকে পরিচিত হবে ‘ইউকে মিশন, জেরুজালেম’ নামে। ব্রিটেন বলেছে, নাম বদলালেও ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে তাদের কাজ থামবে না।
বৃহস্পতিবার (০৮ অক্টোবর) স্কাই নিউজে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, পূর্ব জেরুজালেমের ব্রিটিশ কনস্যুলেট বন্ধের সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করেছে ইসরায়েল। এর পরই ব্রিটিশ সরকার জানিয়েছে, কনস্যুলেট ভবনটি বন্ধ হচ্ছে না। আজ থেকেই এটি নতুন নামে কাজ করবে।
ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড বলেছেন, ইসরায়েলের সরকার কনস্যুলেটটি আইনগতভাবে বন্ধ করতে পারে, এমন দাবি ব্রিটেন মেনে নেয় না। ব্রিটেনের দীর্ঘদিনের অবস্থান হলো, পূর্ব জেরুজালেম অধিকৃত ভূখণ্ড।
মিলিব্যান্ড বলেছেন, ইসরায়েলের সঙ্গে আলোচনার পর ভবনটি খোলা থাকবে। নতুন মিশনটি স্বাধীন ও কার্যকর থাকবে। ফিলিস্তিনি জনগণের সঙ্গে ব্রিটেনের কাজ এবং প্রয়োজনীয় সেবাও চলবে। তাঁর মতে, এতে জেরুজালেমে ব্রিটেনের দীর্ঘদিনের উপস্থিতি বজায় থাকবে। পাশাপাশি দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পক্ষে ব্রিটিশ ভূমিকা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।
বিরোধের সূত্রপাত গত মাসে। অধিকৃত পশ্চিম তীরের ইসরায়েলি বসতিতে উৎপাদিত পণ্যের ওপর বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞাসহ কয়েকটি ব্যবস্থা ঘোষণা করে ব্রিটেন। এর জবাবে ৮ সেপ্টেম্বর কনস্যুলেট বন্ধের জন্য ৩০ দিনের সময় দেয় ইসরায়েল। বৃহস্পতিবার সেই সময়সীমা শেষ হয়েছে।
ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিয়ন সা'আর বলেছেন, ব্রিটিশ সরকারের পদক্ষেপই পরিস্থিতিকে এখানে নিয়ে এসেছে। তাঁর দপ্তরের ভাষ্য, কনসাল জেনারেলসহ ২০ জন কূটনৈতিক কর্মীর দায়িত্ব শেষ হবে এবং তাঁরা ইসরায়েল ছাড়বেন।
তবে ব্রিটেনের বক্তব্য কিছুটা আলাদা। নিরাপত্তার নিশ্চয়তা না থাকায় কয়েকজন কর্মী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যকে সাময়িকভাবে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে লন্ডন। আগামী কয়েক মাসে আবার উপস্থিতি বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। এর অর্থ, কনস্যুলেটের পুরোনো কাঠামো আর থাকছে না। কিন্তু ব্রিটিশ কূটনৈতিক উপস্থিতিও শেষ হচ্ছে না।
এই মিশন পূর্ব জেরুজালেম, পশ্চিম তীর ও গাজার ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে ব্রিটেনের সম্পর্ক দেখভাল করে। এত দিন এটি তেলআবিবের ব্রিটিশ দূতাবাস থেকে আলাদাভাবে পরিচালিত হয়েছে। নতুন ব্যবস্থাতেও মিশনটি স্বাধীনভাবে কাজ করবে বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ সরকার।
এর আগে আশঙ্কা ছিল, কনস্যুলেট পুরোপুরি বন্ধ হলে পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে লন্ডন থেকে ইসরায়েলি কূটনীতিকদের বহিষ্কার করতে পারে ব্রিটেন। কয়েকটি প্রতিবেদনে ২৭ জনের কথাও উঠে আসে। কিন্তু নতুন সমঝোতার পর অবস্থান বদলেছে। মিলিব্যান্ড জানিয়েছেন, আলোচনা যত দিন বিশ্বাসযোগ্যভাবে চলবে, তত দিন ব্রিটেন পাল্টা কূটনৈতিক ব্যবস্থা নেবে না।
ব্রিটেনের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জোনাথন পাওয়েল গত সপ্তাহে নীরবে ইসরায়েল সফর করেছিলেন। লক্ষ্য ছিল কনস্যুলেট পুরোপুরি বন্ধ হওয়া ঠেকানো। তখন কোনো সমঝোতা হয়নি। তবে আলোচনা চলতে থাকে। শেষ পর্যন্ত সেই আলোচনাই ভবনটি খোলা রাখার পথ তৈরি করেছে।
কনস্যুলেটটির ইতিহাসও এই ভূখণ্ডের রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে। জেরুজালেমে ব্রিটিশ কনস্যুলার উপস্থিতির শুরু ১৮৩৯ সালে। শেখ জাররাহর বর্তমান ভবন বহু দশক ধরে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে ব্রিটেনের সরাসরি কূটনৈতিক যোগাযোগের প্রতীক হয়ে আছে। পূর্ব জেরুজালেম ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে দখল করে ইসরায়েল। পরে অঞ্চলটি নিজেদের ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করে। সেই সংযুক্তিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অধিকাংশই স্বীকৃতি দেয়নি। ব্রিটেনও পূর্ব জেরুজালেমকে অধিকৃত ভূখণ্ড হিসেবেই বিবেচনা করে।
আগের দিন আন্তর্জাতিক সংকট গোষ্ঠীর জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক আমজাদ ইরাকি সতর্ক করেছিলেন, কনস্যুলেট পুরোপুরি বন্ধ হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বেন ফিলিস্তিনিরা। তাঁর মতে, এতে ফিলিস্তিনিদের সহায়তায় ব্রিটেনের সক্ষমতা সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি ছিল।
নতুন সমঝোতা সেই আশঙ্কা পুরোপুরি দূর করেনি। কারণ কূটনৈতিক কাঠামো ছোট হচ্ছে। কর্মীর সংখ্যাও কমছে। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ দরজা আপাতত খোলা থাকছে।
শেখ জাররাহর ভবনের নামফলক বদলে যাচ্ছে। ‘কনস্যুলেট’ শব্দটি সরে যাচ্ছে। জায়গা নিচ্ছে ‘মিশন’। কূটনীতিতে কখনও একটি শব্দের পরিবর্তনও অনেক ইতিহাস বহন করে।
ইসরায়েল বলেছে, কনস্যুলেট বন্ধ হয়েছে। ব্রিটেন বলেছে, তাদের উপস্থিতি বন্ধ হয়নি। আর এই দুই অবস্থানের মাঝখানে রয়েছে ফিলিস্তিনিরা, যাদের সঙ্গে প্রায় দুই শতাব্দীর ব্রিটিশ কূটনৈতিক যোগাযোগ এখন নতুন নামে, ছোট পরিসরে, তবু এখনও সেই একই দরজার ভেতর থেকে চলতে থাকবে৷



