ভোটের জোয়ারে উত্থান, অসন্তোষের ঝড়ে পতন
কী ভুল ছিল স্টারমারের?

ছবি: রয়টার্স
মাত্র দুই বছর আগে ব্রিটেনের রাজনীতিতে বড় প্রত্যাবর্তনের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন কিয়ার স্টারমার। ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে লেবার পার্টিকে ঐতিহাসিক জয় এনে দিয়ে ১৪ বছর পর দলটিকে ক্ষমতায় ফিরিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেই বিজয়ের উচ্ছ্বাস দ্রুতই ম্লান হয়ে যায়। জনআস্থা কমে যাওয়া, দলের অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ এবং সরকারের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্নের মুখে শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়তে হয়েছে তাঁকে। সোমবার বাকিংহাম প্যালেসে রাজা তৃতীয় চার্লসের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন স্টারমার। এরপর দলটির নতুন নেতা অ্যান্ডি বার্নহ্যাম রাজা চার্লসের আমন্ত্রণে নতুন সরকার গঠনের দায়িত্ব নেন।
স্টারমারের বিদায়ের পর এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় এসেও কেন তিনি এত দ্রুত জনপ্রিয়তা হারালেন? রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্টারমারের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিল মানুষের প্রত্যাশা ও সরকারের কাজের মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হওয়া। নির্বাচনের আগে তিনি পরিবর্তনের বার্তা দিয়েছিলেন। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর অনেক ভোটারের কাছে মনে হয়েছে, সরকার কাঙ্ক্ষিত গতি ও দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে পারছে না। অর্থনৈতিক চাপ, জীবনযাত্রার ব্যয়, আবাসন সংকট এবং সরকারি পরিষেবার দুরবস্থা নিয়ে মানুষের অসন্তোষ কমেনি।
অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়: সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ
স্টারমার সরকারের সামনে শুরু থেকেই বড় চ্যালেঞ্জ ছিল দুর্বল অর্থনীতি। মূল্যস্ফীতি, উচ্চ সুদের হার এবং সাধারণ মানুষের ক্রমবর্ধমান ব্যয় নিয়ে সরকারকে বারবার চাপের মুখে পড়তে হয়েছে। অনেক ভোটার মনে করেছেন, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির তুলনায় অর্থনৈতিক স্বস্তি দিতে সরকার খুব ধীরগতিতে এগিয়েছে।
বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে এই ধারণা তৈরি হয় যে, লেবার সরকার পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে তাদের দৈনন্দিন সমস্যার সমাধান দ্রুত করতে পারেনি।
দলীয় সংকট ও নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন
স্টারমারের নেতৃত্ব নিয়ে লেবারের ভেতরেও অসন্তোষ বাড়তে থাকে। দলের কয়েকজন এমপি মনে করেন, সরকারের রাজনৈতিক বার্তা স্পষ্ট নয় এবং বিরোধীদের মোকাবিলায় নেতৃত্ব আরও আক্রমণাত্মক হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে সরকারের কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে দলীয় কর্মীদের মধ্যেও হতাশা তৈরি হয়।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, স্টারমার ছিলেন একজন দক্ষ আইনজীবী ও সংগঠক, কিন্তু জনমানসে শক্তিশালী রাজনৈতিক আবেগ তৈরি করতে তাঁর সীমাবদ্ধতা ছিল। তিনি নীতিগতভাবে সতর্ক ছিলেন, তবে অনেক সময় সেই সতর্কতাই সাধারণ মানুষের চোখে সিদ্ধান্তহীনতা হিসেবে ধরা পড়ে।
অভিবাসন ও জনসেবার চাপ
অভিবাসন ইস্যুও স্টারমার সরকারের জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। অবৈধ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থান নেওয়ার পরও বিরোধীরা অভিযোগ করে, সরকার কার্যকর সমাধান দিতে পারছে না। অন্যদিকে স্বাস্থ্যসেবা, স্থানীয় পরিষেবা ও আবাসন খাতেও দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো অব্যাহত থাকে।
এসব বিষয় কাজে লাগিয়ে ডানপন্থী দলগুলো সরকারবিরোধী প্রচার জোরদার করে। বিশেষ করে নাইজেল ফারাজের নেতৃত্বাধীন রিফর্ম ইউকের উত্থান লেবারের জন্য নতুন চাপ তৈরি করে। অ্যান্ডি বার্নহ্যামও তাঁর প্রথম ভাষণে স্বীকার করেছেন, ব্রিটেনের রাজনীতিতে মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা এখন বড় দায়িত্ব।
কিছু সাফল্যও ছিল স্টারমারের
তবে স্টারমারের পুরো মেয়াদকেই ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন না অনেকে। বিদায়ী ভাষণে তিনি দাবি করেন, তাঁর সরকার শ্রমিক অধিকার শক্তিশালী করেছে, শিশু দারিদ্র্য কমাতে উদ্যোগ নিয়েছে এবং দেশের প্রতিরক্ষা অবস্থান আরও মজবুত করেছে।
তাঁর
সমর্থকেরা বলছেন, দীর্ঘদিনের কনজারভেটিভ শাসনের পর ক্ষমতায় এসে
অর্থনীতি ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার
অনেক জটিলতা সামলাতে হয়েছে স্টারমারকে। কিন্তু সমালোচকদের বক্তব্য, জনগণ দ্রুত পরিবর্তন
দেখতে চেয়েছিল, যা তিনি দিতে
পারেননি।
নতুন
অধ্যায়ে ব্রিটিশ রাজনীতি
স্টারমারের বিদায়ের মধ্য দিয়ে ব্রিটিশ রাজনীতিতে আবারও নেতৃত্ব পরিবর্তনের অধ্যায় শুরু হলো। গত এক দশকে যুক্তরাজ্য এখন সপ্তম প্রধানমন্ত্রীর মুখ দেখল।
অ্যান্ডি বার্নহ্যাম এখন লেবার সরকারের নতুন মুখ। তিনি ক্ষমতায় এসে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং সরকারি পরিষেবায় সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে স্টারমারের মতো বার্নহ্যামের সামনেও সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে একটাই, মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা। কারণ ব্রিটিশ ভোটাররা এখন শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, দ্রুত বাস্তব পরিবর্তন দেখতে চাইছেন।




