ফ্রান্স-স্পেনের দাবানলে তিন লাখের বেশি মানুষ ঘরছাড়া

ছবি: রয়টার্স
ইউরোপ জুড়ে চলমান তাপপ্রবাহ এবার ভয়াবহ দাবানলে রূপ নিয়েছে। ফ্রান্সের ঐতিহাসিক শহর ও বিখ্যাত মদ উৎপাদন অঞ্চল বোর্দোর দুয়ারে পৌঁছে গেছে আগুন। একই সময়ে স্পেনের বিভিন্ন অঞ্চলেও নিয়ন্ত্রণের বাইরে একাধিক দাবানল।
শনিবার জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে স্পেন। এদিকে ফ্রান্সের পরিস্থিতি সামাল দিতে আজ জরুরি বৈঠক ডেকেছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ। দুই দেশ মিলিয়ে তিন লাখের বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
গত সপ্তাহে ফ্রান্সের আটলান্টিক উপকূলের কাছে শুরু হওয়া দাবানল সোমবার পর্যন্ত বোর্দো মহানগরের প্রবেশপথ থেকে মাত্র ১৫ কিলোমিটার দূরে পৌঁছে গেছে। আগুন ঠেকাতে রাতভর কাজ চালিয়ে গেছেন দমকলকর্মীরা।
বোর্দোর উপকণ্ঠের সেস্তা শহরের মেয়র জেরোম স্টেফে বলেছেন, এটি এমন একটি দাবানল, যার আকার এর আগে কেউ দেখেনি। তার ভাষায়, তাপপ্রবাহ আবার ফিরে আসার আগেই আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টায় সময়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে চলেছেন দমকল বাহিনী।
গিরন্দ প্রদেশের প্রশাসন জানিয়েছে, পরিস্থিতি আপাতত মোটামুটি স্থিতিশীল। তবে সপ্তাহের শেষদিকে আবারও তাপমাত্রা বেড়ে ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠতে পারে। এতে আগুন আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ফ্রান্সের অর্থমন্ত্রী রোলাঁ লেস্ক্যুর জানিয়েছেন, দাবানলের ফলে ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতি বড় ধাক্কার মুখে পড়েছে। বোর্দো ফ্রান্সের অন্যতম প্রধান আঙুর ও মদ উৎপাদন কেন্দ্র। পাশাপাশি এটি জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্যও। এমন সংকট এই অঞ্চলের জন্য বড় আঘাত।
প্রতিবেশী স্পেনেও চলছে ভয়াবহ দাবানল। স্পেনে এখনো জারি রয়েছে জরুরি অবস্থা। মাদ্রিদের উত্তর-পশ্চিমের পার্বত্য এলাকায় তিনটি বড় আগুন এখনো সক্রিয়। তবে অনুকূল আবহাওয়ার কারণে আগুনের বিস্তার কিছুটা ধীর হয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে পূর্বাঞ্চলের কাস্তেয়োন প্রদেশে একটি দাবানল এখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বললেন, এগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। জলবায়ু পরির্তনের বেদনাদায়ক প্রকাশ এটি। এর ফলে ষষ্ঠ প্রজন্মের ভয়াবহ দাবানল আরও শক্তিশালী হচ্ছে, তাপপ্রবাহ বাড়ছে এবং ভূখণ্ড আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ষষ্ঠ প্রজন্মের দাবানল এতটাই তীব্র যে, তা নিজস্ব আবহাওয়া তৈরি করতে পারে এবং প্রতি ঘণ্টায় হাজার হাজার হেক্টর বনভূমি পুড়িয়ে ফেলতে সক্ষম। অনেক বিজ্ঞানীর মতে, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই এমন দাবানল ও তাপপ্রবাহের ঘটনা বাড়ছে।
স্পেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফার্নান্দো গ্রান্দে-মার্লাস্কা বলেছেন, সোম ও মঙ্গলবার আগুন নিয়ন্ত্রণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বুধবার থেকে আবহাওয়া প্রতিকূল হওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে। তারপরও পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদী।
মাদ্রিদ, তোলেদো ও আভিলা প্রদেশে দাবানলে এখন পর্যন্ত প্রায় ৭৭ হাজার হেক্টর বনভূমি পুড়ে গেছে। আভিলার দাবানলকে দেশটির সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দাবানল হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
দাবানলের কারণে ফ্রান্সে প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার এবং স্পেনে প্রায় এক লাখ মানুষকে বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদ স্থানে যেতে হয়েছে। ইউরোপে চলতি গ্রীষ্মে এরই মধ্যে তিন দফা তাপপ্রবাহ বয়ে গেছে। কয়েকটি দেশে নতুন তাপমাত্রার রেকর্ডও সৃষ্টি হয়েছে।
কাস্তেয়োন থেকে সরিয়ে নেওয়া বাসিন্দা মারিয়া আঙ্গেলেস সেরানো বলেছেন, জিনিসপত্রের ক্ষতি একদিন পূরণ করা সম্ভব। কিন্তু প্রকৃতির এই ধ্বংস আর মানসিক কষ্ট সহজে কাটিয়ে ওঠা যায় না। আর মাদ্রিদের পশ্চিমাঞ্চলের চাপিনেরিয়া এলাকার বাসিন্দা রোসিও দোমিঙ্গেজ বললেন, চারদিকে ছাই উড়ছিল। কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। মনে হচ্ছিল যেন পৃথিবীর শেষ সময় এসে গেছে।





