যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্ক চায় অ্যামচ্যাম সাইপ্রাস
- ভিসামুক্ত ভ্রমণ, সরাসরি বিমান যোগাযোগ ও আধুনিক কর চুক্তিসহ পাঁচ দফা প্রস্তাব

সাইপ্রাসের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও কৌশলগত সম্পর্ক আরও জোরদারের আহ্বান জানিয়েছে আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন সাইপ্রাস (অ্যামচ্যাম সাইপ্রাস)। দুই দেশের সম্পর্ক আরও এগিয়ে নিতে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের প্রস্তাব করেছে সংগঠনটি।
সম্প্রতি প্রকাশিত অ্যামচ্যাম সাইপ্রাসের নীতিপত্রে এসব প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছে। বিনিয়োগ, ব্যবসায়িক যোগাযোগ, মানুষের চলাচল, নিরাপত্তা এবং দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধিকে নীতিপত্রের মূল অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অ্যামচ্যাম সাইপ্রাস বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সাইপ্রাস ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কৌশলগত সহযোগিতা দ্রুত বেড়েছে। নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে দুই দেশের অভিন্ন স্বার্থ রয়েছে। এই অগ্রগতি আরও সুসংহত করতে পাঁচটি নীতিগত উদ্যোগকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
অ্যামচ্যাম সাইপ্রাসের প্রথম প্রস্তাব হলো, সাইপ্রাসকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা ওয়েভার প্রোগ্রামে অন্তর্ভুক্ত করা।
সংগঠনটির দাবি, সাইপ্রাসে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার ২ দশমিক ১৬ শতাংশ, যা ভিসা ওয়েভার প্রোগ্রামের নির্ধারিত ৩ শতাংশ সীমার নিচে। দেশটি বায়োমেট্রিক পাসপোর্ট ব্যবস্থা উন্নত করেছে, ডিজিটাল তথ্য আদান-প্রদানের সক্ষমতা বাড়িয়েছে এবং নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদারে আইনগত পদক্ষেপ নিয়েছে বলেও নীতিপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
অ্যামচ্যাম সাইপ্রাসের মতে, ভিসামুক্ত ভ্রমণ চালু হলে ব্যবসা, পর্যটন, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক বাধা কমবে। একই সঙ্গে মার্কিন বিনিয়োগকারী ও কোম্পানিগুলোর কাছে সাইপ্রাস আঞ্চলিক সদর দপ্তর স্থাপনের জন্য আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।
১৯৮৪ সালের কর চুক্তি আধুনিকায়নের দাবি। দ্বিতীয় প্রস্তাব হিসেবে দুই দেশের ‘ডাবল ট্যাক্সেসন ট্রিটি’ আধুনিকায়নের আহ্বান জানিয়েছে অ্যামচ্যাম সাইপ্রাস।
সাইপ্রাস ও যুক্তরাষ্ট্রের এই কর চুক্তি ১৯৮৪ সালে স্বাক্ষরিত, ১৯৮৫ সালে অনুমোদিত এবং ১৯৮৬ সালে কার্যকর হয়। অ্যামচ্যামের মতে, চুক্তিটি এখনও কার্যকর থাকলেও বর্তমান বৈশ্বিক করব্যবস্থার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
সংগঠনটি বলছে, চুক্তি আধুনিকায়ন করা হলে বিনিয়োগকারীদের করসংক্রান্ত নিশ্চয়তা বাড়বে, প্রশাসনিক জটিলতা কমবে এবং বিনিয়োগ প্রবাহ বাড়তে পারে। বিশেষ করে শিপিং, জ্বালানি, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, আর্থিক সেবা এবং ফিনটেক খাতে এর সুফল পাওয়া যেতে পারে।
একই সঙ্গে OECD-এর আধুনিক কর মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি চুক্তি সাইপ্রাসকে আঞ্চলিক সদর দপ্তর ও ব্যবসায়িক সেবা কেন্দ্র হিসেবে আরও শক্তিশালী করতে পারে বলে মনে করছে সংগঠনটি।
তৃতীয় প্রস্তাব হলো সাইপ্রাস ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি সোশ্যাল সিকিউরিটি বা টোটালাইজেশন এগ্রিমেন্ট করা।
বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে এ ধরনের কোনো চুক্তি নেই। অ্যামচ্যাম সাইপ্রাসের মতে, এমন চুক্তি হলে দুই দেশে কাজ করা ব্যক্তিদের একই আয়ের ওপর দ্বৈত সামাজিক নিরাপত্তা কর দেওয়ার ঝুঁকি কমবে এবং তাদের পেনশন অধিকার সুরক্ষিত থাকবে।
এতে যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত সাইপ্রাসের নাগরিক ও ব্যবসায়ীদের খরচ কমার পাশাপাশি মার্কিন কোম্পানিগুলোর জন্য সাইপ্রাসে কর্মী পাঠানোও সহজ হবে। বিশেষ করে জ্বালানি, প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা ও অর্থ খাতে দক্ষ কর্মীদের চলাচল বাড়াতে এটি সহায়ক হতে পারে।
চতুর্থ প্রস্তাব হিসেবে সাইপ্রাস ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সরাসরি বাণিজ্যিক ফ্লাইট চালুর আহ্বান জানিয়েছে অ্যামচ্যাম সাইপ্রাস।
নীতিপত্রে বলা হয়েছে, একটি মার্কিন এয়ারলাইনের সঙ্গে সরাসরি ফ্লাইট চালুর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে দীর্ঘপাল্লার এই রুট চালুর ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত যাত্রী চাহিদা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
অ্যামচ্যাম সাইপ্রাসের মতে, সরাসরি বিমান যোগাযোগ চালু হলে মার্কিন পর্যটকদের জন্য সাইপ্রাসে যাতায়াত সহজ হবে। ব্যবসা ও একাডেমিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও সময় কমবে। পাশাপাশি লারনাকা ও পাফোস বিমানবন্দর আঞ্চলিক বিমান যোগাযোগের কেন্দ্র হিসেবে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সংগঠনটি উল্লেখ করেছে, দীর্ঘপাল্লার একটি রুট বাণিজ্যিকভাবে পরিচালনার জন্য সাধারণত প্রতিদিন প্রায় ৫০০ যাত্রীর চাহিদা প্রয়োজন হয়। বর্তমানে সাইপ্রাস-যুক্তরাষ্ট্র রুটে যাত্রী সংখ্যা সেই মাত্রার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
পঞ্চম প্রস্তাব হিসেবে ইউএস কাস্টমস এন্ড বর্ডার প্রোটেকশন প্রিক্লিয়ারেন্স সুবিধা সাইপ্রাসে চালুর সম্ভাব্যতা যাচাই করার আহ্বান জানিয়েছে অ্যামচ্যাম সাইপ্রাস।
প্রি-ক্লিয়ারেন্স ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রগামী যাত্রীরা বিমান ছাড়ার আগেই মার্কিন অভিবাসন ও কাস্টমস যাচাই সম্পন্ন করতে পারেন। বর্তমানে বিশ্বের ১৫টি আন্তর্জাতিক স্থানে এ ধরনের সুবিধা চালু রয়েছে।
অ্যামচ্যামের মতে, লারনাকা অথবা পাফোস বিমানবন্দরে প্রি-ক্লিয়ারেন্স সুবিধা চালু হলে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোর পর যাত্রীরা অনেক ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ যাত্রীর মতো দ্রুত বিমানবন্দর থেকে বের হতে পারবেন। এতে সাইপ্রাসের বিমানবন্দরগুলোর আকর্ষণ বাড়বে এবং নতুন মার্কিন এয়ারলাইন রুট চালুর সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবন্দরগুলোতে প্রবেশের সময় ভিড় কমানো এবং বিমান নিরাপত্তা আরও জোরদার করতেও এ ব্যবস্থা ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছে সংগঠনটি।
অ্যামচ্যাম সাইপ্রাসের মতে, প্রস্তাবিত পাঁচটি পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও পর্যটন বাড়বে। পাশাপাশি শ্রমিক, শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীদের চলাচল সহজ হবে এবং নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও গভীর হবে।
সংগঠনটি মনে করছে, এসব উদ্যোগ পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে সাইপ্রাসের কৌশলগত গুরুত্ব আরও বাড়াবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের জন্য দেশটিকে একটি নির্ভরযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সহায়তা করবে।
অ্যামচ্যাম সাইপ্রাস জানিয়েছে, পাঁচটি অগ্রাধিকার বাস্তবায়নে তারা সাইপ্রাস সরকার এবং ওয়াশিংটনের সংশ্লিষ্ট অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত।
সংগঠনটির ভাষায়, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগ আরও জোরদার হবে।



