ব্রিটেনের মার্কিন ঘাঁটিতে ‘ইরানি হামলার’ তথ্য দিয়েছিল ইসরায়েল
- ফেয়ারফোর্ড রহস্যে ব্রিটিশ-ইরানি নাগরিক গ্রেপ্তার
- গোয়েন্দা তথ্য ও গাজা-নীতি ঘিরে লন্ডন-তেল আবিব সম্পর্কে টানাপোড়েন

গোপন তথ্যের টেবিলে সহযোগী, কূটনীতির মঞ্চে প্রতিপক্ষ। ব্রিটেন ও ইসরায়েলের সম্পর্কে এখন যেন এই দ্বৈত ছবিই সবচেয়ে স্পষ্ট। ইংল্যান্ডের আরএএফ ফেয়ারফোর্ড ঘিরে সন্দেহভাজন সন্ত্রাসী ষড়যন্ত্রের তদন্তে ব্রিটিশ-ইরানি দ্বৈত নাগরিক গ্রেপ্তার হওয়ার মধ্যেই ইসরায়েলের দাবি, সম্ভাব্য ইরানি হামলার বিষয়ে তারাই নাকি আগেভাগে লন্ডনকে সতর্ক করেছিল। অথচ এরপরই পশ্চিম তীরের অবৈধ ইসরায়েলি বসতি নিয়ে নিষেধাজ্ঞার পথে হেঁটেছে ব্রিটিশ সরকার।
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) ব্রিটিশ সংবাদপত্র দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে এক জ্যেষ্ঠ ইসরায়েলি কর্মকর্তার অভিযোগ উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, লেবার পার্টির সরকার দুই দেশের সম্পর্ক নষ্ট করতে “বদ্ধপরিকর”। একই দিন স্থানীয় সময় বিকেল ৫টায় ব্রিটেনের সন্ত্রাসবিরোধী পুলিশ জানায়, ফেয়ারফোর্ড ঘটনার তদন্তে লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টার থেকে ২৭ বছর বয়সী এক ব্রিটিশ-ইরানি দ্বৈত নাগরিককে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের প্রস্তুতির সন্দেহে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, একই তদন্তে ২৬ বছর বয়সী আরেক ব্রিটিশ নাগরিককে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে এবং ওয়েস্টমিনস্টারের দুটি ঠিকানায় তল্লাশি চালানো হয়েছে। এর আগে রবিবার ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটির কাছে সন্দেহজনক তিনটি গাড়ির ঘটনায় বিশের কোঠার পাঁচ ব্রিটিশ নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পরে তাঁদের জামিনে ছেড়ে দেওয়া হয়। গাড়িগুলোতে পেট্রল পাওয়া গেলেও বিস্ফোরক মেলেনি।
সন্ত্রাসবিরোধী পুলিশের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ভিকি ইভান্স বলেছেন, তদন্তটি “অত্যন্ত জটিল” এবং সম্ভাব্য বিদেশি রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্টতাসহ সব দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামও বলেছেন, ঘটনায় ইরানের ভূমিকা থাকার “জোরালো ইঙ্গিত” রয়েছে। তবে তেহরান কোনো সংশ্লিষ্টতার কথা অস্বীকার করেছে।
এর মধ্যেই ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজকে বলেছেন, ইসরায়েল ব্রিটেনকে আগেই “ইরান-সমর্থিত হামলার” বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য দিয়েছিল। তাঁর অভিযোগ, এর অল্প সময় পরেই ব্রিটিশ সরকার ইসরায়েলি বসতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়। পরিস্থিতিকে তিনি “অবিশ্বাস্য” বলে বর্ণনা করেন। তবে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ প্রকাশ্যে এখনো নেতানিয়াহুর দাবি অনুযায়ী ওই গোয়েন্দা তথ্যের সময় ও বিস্তারিত নিশ্চিত করেনি।
গত ৮ সেপ্টেম্বর ব্রিটিশ সরকার অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি অবৈধ বসতি সম্প্রসারণ ও বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার জবাবে নতুন ব্যবস্থা ঘোষণা করে। এর মধ্যে বসতি থেকে পণ্য আমদানির ওপর বিধিনিষেধ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের গবেষণা নথি অনুযায়ী, লন্ডনের অবস্থান হলো এসব বসতি আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী এবং দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পথে বাধা। ইসরায়েল এসব পদক্ষেপ প্রত্যাখ্যান করেছে।
নেতানিয়াহুর আইনি অবস্থান নিয়েও বিভ্রান্তি রয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ২০২৪ সালের ২১ নভেম্বর তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। আদালত বলেছে, অভিযোগগুলোর পক্ষে বিশ্বাসযোগ্য ভিত্তি রয়েছে। তবে আদালতের এই অভিযোগ ও এখতিয়ার প্রত্যাখ্যান করে আসছে নেতানিয়াহু ও ইসরায়েল।
ফেয়ারফোর্ড এখন তাই শুধু একটি সম্ভাব্য সন্ত্রাসী ষড়যন্ত্রের তদন্ত নয়। ইরানকে ঘিরে নিরাপত্তা উদ্বেগ, গাজা ও পশ্চিম তীর নিয়ে ব্রিটিশ নীতি এবং বহুদিনের ব্রিটেন-ইসরায়েল গোয়েন্দা সহযোগিতা, সবকিছু একই বিন্দুতে এসে জড়ো হয়েছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কে নির্দেশ দিয়েছিল, আদৌ কোনো বিদেশি রাষ্ট্র জড়িত ছিল কি না, সেই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর এখনও পুলিশের হাতে।



