ভিসা নাকচের ভয়ে অফার প্রত্যাহার ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয়ের
- তালিকায় সবার ওপরে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও নাইজেরিয়া

অফার হাতে এসেছে। ভিসার প্রস্তুতিও শুরু। তারপর হঠাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্তা, সেই অফার আর থাকছে না। ব্রিটেনে পড়তে চাওয়া বহু বিদেশি শিক্ষার্থীর জন্য এমন অনিশ্চয়তা এখন বাস্তব। সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ছে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, নাইজেরিয়ার আবেদনকারীদের ওপর। কারণ, নিজেদের বিদেশি শিক্ষার্থী নেওয়ার অধিকার বাঁচাতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোই অনেক ক্ষেত্রে আগেভাগে অফার ফিরিয়ে নিচ্ছে।
শনিবার (১০ অক্টোবর) ফিন্যান্সিয়াল টাইমসে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ব্রিটেনে শিক্ষার্থী ভিসা আবেদনের ১০ দশমিক ৫ শতাংশ প্রত্যাহার করা হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে হার ছিল ২ দশমিক ৩ শতাংশ। ২০২৩ সালে ছিল মাত্র শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ।
বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও পরিবর্তনটি বড়। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে বাংলাদেশি আবেদনকারীদের ২৩ দশমিক ৫ শতাংশ ভিসা আবেদন প্রত্যাহার হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে তা ছিল ৭ দশমিক ১ শতাংশ। পাকিস্তানিদের ক্ষেত্রে হার ৪০ দশমিক ৯ শতাংশ। নাইজেরিয়ায় ২২ দশমিক ৭ শতাংশ। ভারতে ৫ দশমিক ২ শতাংশ।
এর পেছনে রয়েছে ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র দপ্তরের কঠোর নতুন নিয়ম। কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় করা শিক্ষার্থী ভিসা আবেদনের প্রত্যাখ্যানের হার ৫ শতাংশ ছাড়ালে প্রতিষ্ঠানটি শাস্তির মুখে পড়তে পারে। আগে সীমা ছিল ১০ শতাংশ। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে বিদেশি শিক্ষার্থী নেওয়ার অধিকারও হারাতে পারে বিশ্ববিদ্যালয়।
তবে এটি বাংলাদেশিদের ওপর ব্রিটিশ সরকারের কোনো সার্বিক নিষেধাজ্ঞা নয়। বরং নিজেদের ঝুঁকি কমাতে পৃথক বিশ্ববিদ্যালয় আবেদন যাচাই কঠোর করছে। কোথাও নির্দিষ্ট দেশ থেকে শিক্ষার্থী নেওয়াও সীমিত করা হচ্ছে।
সান্ডারল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য স্যার ডেভিড বেল বলেছেন, “সাম্প্রতিক ও অপ্রত্যাশিত ভিসা প্রত্যাখ্যানের ঊর্ধ্বগতি কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়কে আগাম ব্যবস্থা নিতে বাধ্য করেছে।” তার মতে, যেসব দেশের আবেদন এখন বেশি হারে নাকচ হচ্ছে, সেসব বাজার থেকে প্রতিষ্ঠানগুলো পিছিয়ে আসছে।
বিদেশি শিক্ষার্থী নিয়োগকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রতিনিধি জেমি অ্যারোস্মিথ বলেছেন, “ভিসা প্রক্রিয়া স্পষ্টতই অনেক বেশি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।” তার অভিযোগ, অনেক সিদ্ধান্তে “ত্রুটিপূর্ণ, অসংগত ও অত্যন্ত ব্যক্তিনির্ভর যুক্তি” ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বড় পরিসরে অফার প্রত্যাহার করছে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কয়েকটি অস্বাভাবিক প্রত্যাখ্যানের উদাহরণও দিয়েছে। একজন আবেদনকারী আগে অন্য দেশে পড়ার কথা ভেবেছিলেন, সেটিকেও সন্দেহের কারণ করা হয়েছে। এক ডক্টরাল আবেদনকারীকে এমন পাঠ্যসূচির নাম বলতে না পারায় ভিসা নাকচ করা হয়, যা তার গবেষণা ডিগ্রিতে ছিলই না। ইস্ট অ্যাংলিয়া বিশ্ববিদ্যালয় বলেছে, তাদের নরউইচে অবস্থান নিয়েও একজন সাক্ষাৎকারগ্রহীতার বিভ্রান্তি থেকে একটি আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল।
নিয়ম ভাঙার ঝুঁকিও কাগুজে নয়। গত ৩০ সেপ্টেম্বর বাকিংহামশায়ার নিউ ইউনিভার্সিটির বিদেশি শিক্ষার্থী পৃষ্ঠপোষকতার অনুমতি স্থগিত করেছে স্বরাষ্ট্র দপ্তর।
আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী কমলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আয়ও কমবে। ইউনিভার্সিটি অ্যালায়েন্সের প্রধান ভ্যানেসা উইলসন সতর্ক করেছেন, এর ফল হতে পারে চাকরি ছাঁটাই, কোর্স বন্ধ, এমনকি ক্যাম্পাস বন্ধ হওয়া।
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য ছবিটা তাই বদলে গেছে। এখন শুধু যোগ্যতা আর বিশ্ববিদ্যালয়ের অফার যথেষ্ট নয়। একটি প্রতিষ্ঠানের নিজের ভিসা-ঝুঁকির হিসাবও ঠিক করে দিতে পারে, কার ব্রিটেনে পড়ার স্বপ্ন এগোবে, আর কারটি একটি ই-মেইলেই থেমে যাবে।



