পুরুষের চেয়ে কম বিনিয়োগ, তবু লাভে এগিয়ে নারীরা

ছবি: রয়টার্স
টাকার খেলায় প্রচলিত ধারণাটা যেন কিছুটা বদলেই দিচ্ছেন নারীরা। বিনিয়োগ বাজারে পুরুষের তুলনায় নারীর অংশগ্রহণ তুলনামূলক কম। কিন্তু এই কম অংশের বিনিয়োগে এবার প্রমাণ মিলেছে দীর্ঘমেয়াদে আয় বেশি হওয়ার। মাঠে নারীর সংখ্যা কম, তবে যারা আছেন খেলছেন ধৈর্যসহকারে।
নতুন এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যুক্তরাজ্যে বিনিয়োগকারী নারীরা কম কেনাবেচা করেন, ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষেত্রে বেশি সতর্ক থাকেন এবং বিনিয়োগের আগে কোথায় টাকা রাখছেন, সেটি নিয়ে তুলনামূলক বেশি ভাবেন। আর এই ধীরস্থির আচরণই শেষ পর্যন্ত তাদের এনে দিতে পারে বাড়তি রিটার্ন।
তবে যুক্তরাজ্যে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের ব্যবধান বেশ বড়। ভোক্তা অর্থবিষয়ক ওয়েবসাইট বোরিং মানির এক গবেষণা অনুযায়ী, দেশটির মাত্র ২৬ শতাংশ নারী বিনিয়োগ করেন। ৪৫ বছরের কম বয়সী নারীদের মধ্যে এই হার আরও কম, ২৩ শতাংশ।
অন্যদিকে যুক্তরাজ্যের ৪১ শতাংশ পুরুষ বিনিয়োগ করেন। ৪৫ বছরের কম বয়সী পুরুষদের ক্ষেত্রেও হারটি প্রায় একই।
কার্ডিফের সরকারি কর্মকর্তা তেলেরি ইভান্স ২৫ বছর বয়সে বিনিয়োগ শুরু করেন। প্রথমে হেল্প টু বাই আইএসএতে সঞ্চয় করেন। কয়েক বছর পর স্টকস অ্যান্ড শেয়ারস লাইফটাইম আইএসএ নেন। ৩৩ বছর বয়সে তার সঞ্চয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ৪০ হাজার পাউন্ড। এর মধ্যে ৮ হাজার পাউন্ড এসেছিল বিনিয়োগের রিটার্ন থেকে।
তেলেরি জানালেন, যতটা সম্ভব বেশি সঞ্চয় করতে তিনি বেশ কঠোরভাবে খরচ নিয়ন্ত্রণ করেছেন। এমনকি ওই সময়ের অর্ধেকটা মায়ের সঙ্গে থেকেছেন, যাতে বছরে লাইফটাইম আইএসএর সর্বোচ্চ ৪ হাজার পাউন্ড জমা দিতে পারেন। চলতি বছর সঙ্গীর সঙ্গে বাড়ি কেনার আগাম অর্থ হিসেবে সেই টাকা ব্যবহার করেছেন তিনি।
কিন্তু প্রশ্ন হলো নারীরা কম বিনিয়োগ করেন কেন?
নারীরা পুরুষের তুলনায় কম বিনিয়োগ করার পেছনে সংস্কৃতিগত কারণ বড় ভূমিকা রাখে বলে মনে করেন যুক্তরাজ্যের নারী-নেতৃত্বাধীন বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান মিন্ট ভেঞ্চারসের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক জিলিয়ান ফ্লেমিং।
তার মতে, ঐতিহাসিকভাবে পরিবারের বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত পুরুষেরাই বেশি নিয়েছেন। একই সময়ে নারীদের হাতে সম্পদের নিয়ন্ত্রণও তুলনামূলক কম ছিল। তবে পরিস্থিতি বদলাচ্ছে।
অর্থ ও সম্পদ তৈরির বিষয়েও নারীদের মধ্যে আলোচনা তুলনামূলক কম বলে জানান তিনি। তবে তেলেরি বলছেন, সম্প্রতি পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। তার বন্ধুদের মধ্যেও বিনিয়োগ নিয়ে আগের চেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে।
নারীরা যখন বিনিয়োগ করেন, তখন ফলাফলের ছবিটাও বেশ চমকপ্রদ। ফিডেলিটি ইন্টারন্যাশনালের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তিন বছরে তাদের নারী ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীদের সম্মিলিত রিটার্ন ছিল ৫০ শতাংশ। পুরুষ বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রে তা ছিল ৪৭ শতাংশ।
যদিও নারীদের রিটার্ন সামান্য বেশি হওয়ার নির্দিষ্ট কারণ জানায়নি গবেষণাটি। তবে একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা রয়েছে তাদের কেনাবেচার অভ্যাসে।
বার্কলেসের তথ্য অনুযায়ী, পুরুষদের তুলনায় নারীরা প্রায় অর্ধেকবার বিনিয়োগ কেনাবেচা করেন।
লন্ডনের দ্য ওয়ার্ক সাইকোলজিস্টসের ব্যবসায়িক মনোবিজ্ঞানী জোয়ানা ফ্লয়েডের মতে, নারীদের তুলনামূলক ধৈর্যশীল ও ঝুঁকি-সচেতন আচরণ এর পেছনে কাজ করতে পারে।
তার ভাষায়, পুরুষ বিনিয়োগকারীরা বেশি রিটার্নের আশায় বেশি কেনাবেচা করেন। অথচ নারীরাই শেষ পর্যন্ত বেশি রিটার্ন পান। অর্থাৎ, যে সতর্কতা নারীদের শুরুতেই বিনিয়োগ থেকে দূরে রাখে, বাজারে ঢোকার পর সেই একই সতর্কতাই তাদের পুরস্কৃত করতে পারে।
নারীরা শুধু ঝুঁকিই কম নেন না, বিনিয়োগের ক্ষেত্রও তুলনামূলক বিস্তৃত রাখেন বলে জানান ফ্লেমিং। পুরুষেরা বেশি রিটার্নের আশায় প্রযুক্তি কোম্পানিতে ঝুঁকতে পারেন। অন্যদিকে নারীরা খুচরা ব্যবসা, খাদ্য ও পানীয়, স্বাস্থ্য ও সৌন্দর্য, নারীপ্রযুক্তি এবং সৃজনশীল শিল্পসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করতে চান।
হ্যারগ্রিভস ল্যান্সডাউনের বিনিয়োগ কৌশল পরিচালক আনা ম্যাকডোনাল্ডের মতে, নারীরা তুলনামূলক বেশি গুরুত্ব দেন, কোথায় তাদের টাকা যাচ্ছে এবং সেই অর্থ কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে সেটিকে।
তবে একটি বড় বাস্তবতাও রয়েছে। যুক্তরাজ্যে নারীদের গড় আয় এখনো পুরুষের চেয়ে কম। ফলে বিনিয়োগ করার মতো অর্থও তাদের হাতে তুলনামূলক কম থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নারীদের জন্য বিনিয়োগকে আরও সহজ, প্রাসঙ্গিক এবং ব্যক্তিগত আর্থিক লক্ষ্য ও মূল্যবোধের সঙ্গে যুক্ত করে তুলতে হবে। এতে শুধু নারীদের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক নিরাপত্তাই বাড়বে না, উপকার হবে পুরো যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিরও।





