জাতিসংঘে মার্কেটর থেকে ‘ইকুয়াল আর্থ’, কোন মানচিত্রে কেমন পৃথিবী

ছবি: বিবিসি
আফ্রিকাকে গ্রিনল্যান্ডের প্রায় সমান দেখানো সেই পরিচিত মানচিত্র এবার বদলে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে জাতিসংঘ। বিশ্বের বহুল ব্যবহৃত মার্কেটর মানচিত্রে আয়তনের যে বড় ধরনের বিকৃতি রয়েছে, তা দূর করতে ‘ইকুয়াল আর্থ প্রজেকশন’ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে। বাস্তবে আফ্রিকা গ্রিনল্যান্ডের চেয়ে প্রায় ১৪ গুণ বড় হলেও প্রচলিত মানচিত্রে প্রায় সমান দেখানো হয়। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত ‘কারেক্ট দ্য ম্যাপ’ প্রস্তাবের লক্ষ্য হলো মার্কেটর মানচিত্রের এই অসামঞ্জস্য দূর করা। নতুন উদ্যোগের মধ্য দিয়ে মানচিত্রে পৃথিবীকে দেখার প্রচলিত ধারণাই বদলে দিতে চাইছে জাতিসংঘ।
তবে নতুন মানচিত্রেরও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সমতল আয়তক্ষেত্রের ওপর গোলাকার পৃথিবীর পৃষ্ঠকে নির্ভুলভাবে দেখানোর সমস্যার সমাধানে বছরের পর বছর ধরে অনেক ধরনের মানচিত্র তৈরির চেষ্টা হয়েছে। প্রতিটি পদ্ধতিরই কিছু সুবিধা ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
মার্কেটর মানচিত্র
বর্তমানে বহুল ব্যবহৃত মার্কেটর মানচিত্রটি ১৫৬৯ সালে তৈরি করেছিলেন ফ্লেমিশ মানচিত্রবিদ জেরার্ডাস মার্কেটর।
ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের কার্টোগ্রাফি (মানচিত্রবিদ্যা) অধ্যাপক জেমস চেশায়ার বলেছেন, এর মূল উদ্দেশ্য ছিল ইউরোপীয় নাবিকদের সমুদ্রে পথ চলতে সাহায্য করা।
তিনি বিবিসিকে বললেন, ‘তিনি চেয়েছিলেন, মানচিত্রে একটি সরলরেখা আঁকা হলে কম্পাসের নির্দেশনা অনুসরণ করে বাস্তবেও সেটি যেন সরলরেখা থাকে। মানচিত্রটি এ কাজের জন্যই তৈরি করা হয়েছিল এবং এ কাজে এটি অসাধারণভাবে সফল।’
সমতল মানচিত্রে কোণগুলো ঠিক রাখতে বিষুবরেখা থেকে মেরুর দিকে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মার্কেটরকে গ্রিডের রেখাগুলোর মধ্যকার দূরত্ব বাড়াতে হয়েছিল।
পৃথিবীর বক্রতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে তার মানচিত্রে বিষুবরেখার কাছের দেশগুলোকে প্রকৃত আয়তনের তুলনায় অনেক ছোট এবং মেরুর কাছের দেশগুলোকে টেনে বড় দেখানো হয়েছে।
দুই মাত্রার মানচিত্রে পৃথিবীর গোলাকার পৃষ্ঠকে পুরোপুরি নির্ভুলভাবে তুলে ধরা সম্ভব নয় বলেই এই বিকৃতি তৈরি হয়।
৪৫০ বছরেরও বেশি সময় পরও মার্কেটরের তৈরি মানচিত্র বিশ্বের বহু মানচিত্রের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। শ্রেণিকক্ষ, টেলিভিশন ও অনলাইনে দেখা অনেক মানচিত্রেই এর প্রভাব রয়েছে, যার মধ্যে গুগল ম্যাপসও আছে।
তবে মার্কেটর মানচিত্রের সমালোচকরা বলেন, কোনো কোনো জায়গাকে প্রকৃত আয়তনের চেয়ে ছোট এবং অন্য জায়গাকে বড় দেখার একটি মানসিক প্রভাব রয়েছে। কারণ মানুষ স্বাভাবিকভাবেই বড় কোনো কিছুকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে।
কেনিয়ার ভূগোলবিদ কিওকো মুয়েন্দোর মতে, এর ফলে আফ্রিকার বিপুল সম্পদ, জনসংখ্যা ও বিনিয়োগের সুযোগকে পরোক্ষভাবে ছোট করে দেখা হয়েছে।
তিনি বিবিসিকে বললেন, ‘মানচিত্র শুধু ভ্রমণকারীদের পথ দেখায় না—কোনো অঞ্চলকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে কীভাবে দেখা হবে, সেটিও তারা প্রভাবিত করে।’
ইকুয়াল আর্থ মানচিত্র
মার্কেটর প্রজেকশনের এই সমস্যার সমাধান করার লক্ষ্যেই তৈরি করা হয়েছে ইকুয়াল আর্থ মানচিত্র।
২০১৮ সালে একদল কার্টোগ্রাফার এটি তৈরি করেন। এর উদ্দেশ্য ছিল স্থলভাগের আয়তন ও আকৃতি আরও নির্ভুলভাবে তুলে ধরা। ১৯৬৩ সালের রবিনসন প্রজেকশন থেকে এই মানচিত্র তৈরির অনুপ্রেরণা নেওয়া হয়েছিল। রবিনসন প্রজেকশনে একই সঙ্গে পুরো পৃথিবীর পৃষ্ঠ দেখানো যায়।
এ কারণে জাতিসংঘ ইকুয়াল আর্থ গ্রহণের আগে ফেব্রুয়ারিতে আফ্রিকান ইউনিয়নের সদস্য দেশগুলোও এই মানচিত্র গ্রহণ করে।
তবে মার্কেটর প্রজেকশনকে নৌপথ নির্ধারণের জন্য এত কার্যকর করে তুলেছিল যে সরলরেখাগুলো, ইকুয়াল আর্থে তা রাখা হয়নি। ফলে বিভিন্ন স্থানের প্রকৃত দূরত্ব মাপার ক্ষেত্রেও এই মানচিত্র ব্যবহার করা যায় না।
চেশায়ার বললেন, ‘আপনি আয়তন ঠিক রাখতে পারেন, অথবা আকৃতি ঠিক রাখতে পারেন, অথবা দূরত্ব ও দিক ঠিক রাখতে পারেন। কিন্তু সবকিছু একই সঙ্গে নিখুঁতভাবে ঠিক রাখা সম্ভব নয়। তাহলে তো আবার গোলাকার পৃথিবীর কাছেই ফিরে যেতে হবে।’
পিটার্স মানচিত্র
জার্মান ইতিহাসবিদ আরনো পিটার্স ১৯৭০-এর দশকের শুরুর দিকে পিটার্স বিশ্ব মানচিত্র তৈরি করেন। আয়তাকার এই মানচিত্রটি ১৮৫৫ সালে স্কটিশ মানচিত্রবিদ জেমস গ্যাল প্রথম যে প্রজেকশনের বর্ণনা দিয়েছিলেন, তার ওপর ভিত্তি করে তৈরি।
এই প্রজেকশনে আকৃতির নির্ভুলতার চেয়ে আয়তনের নির্ভুলতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে মেরু অঞ্চলগুলো চ্যাপ্টা হয়ে যায়, আর বিষুবরেখার কাছের অংশগুলো টেনে বড় দেখানো হয়।
এতে গ্রিনল্যান্ড ও আফ্রিকার আয়তনের বৈষম্যের সমস্যা দূর হয়। ফলে এই মানচিত্র ব্যবহারকারীরা বিভিন্ন স্থলভাগের তুলনামূলক আয়তন সম্পর্কে ধারণা পেতে পারেন। একই সঙ্গে দ্রাঘিমা ও অক্ষাংশের সরলরেখাগুলোও রাখা হয়েছে।
তবে পৃথিবীর স্থলভাগের আকৃতি এই মানচিত্রে মারাত্মকভাবে বিকৃত হয়। ফলে সব অঞ্চলকেই কিছুটা অস্বাভাবিক দেখায়। যেমন রাশিয়াকে বাস্তবের তুলনায় অনেক ছোট দেখায়।
পিটার্স মানচিত্রের সরলরেখাগুলোও কম্পাসের নির্দিষ্ট দিক নির্দেশ করে না। ফলে নৌপথ নির্ধারণে এগুলোর কোনো ব্যবহার নেই।
উল্টো ও সরানো মানচিত্র
কোনো স্থলভাগকে মানচিত্রে কত বড় দেখানো হচ্ছে, তার ওপর যেমন সেটির গুরুত্ব সম্পর্কে মানুষের ধারণা প্রভাবিত হতে পারে, তেমনি মানচিত্রে কোনো অঞ্চলের অবস্থানও তার গুরুত্বের ধারণাকে প্রভাবিত করতে পারে।
এই মানসিক পক্ষপাত দূর করতে কিছু কার্টোগ্রাফার এমন মানচিত্র তৈরির চেষ্টা করেছেন, যেখানে দক্ষিণকে ওপরে রাখা হয়েছে। কারণ বিশ্বের দক্ষিণাঞ্চলকে মানচিত্রের নিচে থাকার কারণে কম গুরুত্বপূর্ণ মনে করার যে প্রবণতা, সেটি মোকাবিলা করাই এর উদ্দেশ্য।
এ ছাড়া পৃথিবীর কোথায় আপনি অবস্থান করছেন, তার ওপরও মানচিত্রের কেন্দ্রে কোন মহাদেশ থাকবে, তা বদলে যেতে পারে।
এই বিকল্প মানচিত্রগুলো আমাদের পরিচিত বিশ্বের চেয়ে ভিন্ন একটি দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে। তবে এগুলো কোনো অঞ্চলকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখানোর সমস্যার সমাধান করে না। বরং শুধু মানচিত্রের দৃষ্টিকেন্দ্র বদলে দেয়।
মেরুকেন্দ্রিক মানচিত্র
জাতিসংঘের পতাকার কেন্দ্রে রয়েছে উত্তর মেরু। ফলে কোনো একটি মহাদেশকে প্রধান কেন্দ্র হিসেবে দেখানো হয়নি।
কোন স্থলভাগ মানচিত্রের কেন্দ্রে থাকবে এবং সে কারণে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে—এই সমস্যার একটি সমাধান হলো কোনো স্থলভাগকেই কেন্দ্রে না রাখা।
জাতিসংঘের লোগোতে ব্যবহৃত মানচিত্রে এ পদ্ধতিই নেওয়া হয়েছে। এখানে উত্তর মেরুকে কেন্দ্র করে পৃথিবীকে দেখানো হয়েছে এবং মহাদেশগুলো সেখান থেকে চারদিকে ছড়িয়ে রয়েছে।
এটি ‘অ্যাজিমুথাল ইকুইডিস্ট্যান্ট প্রজেকশন’ নামে পরিচিত। এই পদ্ধতিতে একটি নির্দিষ্ট কেন্দ্রকে ঘিরে বৃত্তাকার মানচিত্রে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল দেখানো হয়। পৃথিবীর কেন্দ্রবিন্দু থেকে কোনো অঞ্চল যত দূরে, সেই বৃত্ত তত বড় হয়।
এই ধরনের মানচিত্রে কেন্দ্র থেকে প্রতিটি স্থানের ‘অ্যাজিমুথ’,অর্থাৎ অনুভূমিক দিক সঠিকভাবে দেখানো হয়।
তবে গোলাকার পৃথিবীর পুরো পৃষ্ঠকে একটি বৃত্তের মধ্যে দেখাতে গেলে কেন্দ্র থেকে যত দূরে যাওয়া হয়, মানচিত্রের বিকৃতিও তত বাড়তে থাকে।
যেমন জাতিসংঘের মানচিত্রে দক্ষিণ মেরুর কাছের অঞ্চলগুলো চ্যাপ্টা ও টানটান দেখায়। কারণ উত্তর মেরুর চারপাশের একটি বৃত্তের সমান পরিধির যে অংশ দক্ষিণে থাকার কথা, সেটি মানচিত্রে অনেক বড় হয়ে যায়।
সূত্র : বিবিসি






