ব্যাংক অব ইংল্যান্ড গভর্নরের সতর্কতা
এআইয়ের ভুল ব্যবহারে বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দার আশঙ্কা
- অতিরিক্ত নির্ভরতা, সাইবার হামলা ও বাজারে কৃত্রিম উচ্ছ্বাসকে বড় বিপদ হিসেবে দেখছেন অ্যান্ড্রু বেইলি
- সতর্ক থাকতে হবে বাংলাদেশকেও

সংগৃহীত ছবি
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার বিশ্ব অর্থনীতির জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করলেও এর অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার ভয়াবহ আর্থিক সংকট ডেকে আনতে পারে বলে সতর্ক করেছেন ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের গভর্নর অ্যান্ড্রু বেইলি। তার আশঙ্কা, এআই-নির্ভর ঝুঁকি যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তাহলে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের মন্দার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
ফিনান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি বোর্ড (এফএসবি)-এর চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করা বেইলি জি২০ দেশের অর্থমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধানদের উদ্দেশে এক সতর্কবার্তায় বলেছেন, আধুনিক বা ‘ফ্রন্টিয়ার’ এআই মডেলগুলো আর্থিক ব্যবস্থার জন্য নতুন ধরনের বিপদ তৈরি করছে। বিশেষ করে সাইবার হামলার ক্ষমতা বাড়িয়ে দিয়ে এই প্রযুক্তি বিশ্বজুড়ে আর্থিক স্থিতিশীলতাকে দুর্বল করতে পারে।
সবচেয়ে বড় ভয় সাইবার হামলা
বেইলির মতে, এআইয়ের সবচেয়ে তাৎক্ষণিক বিপদ হলো সাইবার ঝুঁকি। কারণ উন্নত এআই ব্যবস্থা এখন এমনভাবে কাজ করতে সক্ষম হচ্ছে, যা আগের তুলনায় অনেক দ্রুত তথ্য বিশ্লেষণ, দুর্বলতা শনাক্ত এবং আক্রমণের কৌশল তৈরি করতে পারে।
তিনি সতর্ক করেছেন, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো বর্তমানে একে অপরের সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। ফলে একটি বড় সাইবার হামলা শুধু একটি ব্যাঙ্ক বা একটি দেশের সমস্যা হয়ে থাকবে না, তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায়।
'এআই সাইবার হামলার গতি, পরিসর এবং কার্যকারিতা অনেক বাড়িয়ে দিতে পারে,' এমন আশঙ্কাই তুলে ধরেছেন বেইলি।
ব্যাংক অব ইংল্যান্ড গভর্নরের মতে, অনেক দেশ এখনও উন্নত এআই প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা কাঠামো ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা তৈরি করতে পারেনি। ফলে প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে ঝুঁকিও বাড়ছে।
এআই নিয়ে বিনিয়োগ উন্মাদনাও চিন্তার কারণ
শুধু সাইবার ঝুঁকি নয়, এআই ঘিরে বিশ্ববাজারে তৈরি হওয়া অতিরিক্ত আশাবাদ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বেইলি।
গত কয়েক বছরে এআই প্রযুক্তি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ ব্যাপক বেড়েছে। বড় প্রযুক্তি সংস্থাগুলোর বাজারমূল্য দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু বেইলির আশঙ্কা, যদি বাস্তবে এআই থেকে প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুফল না আসে, তা হলে বাজারে বড় ধরনের সংশোধন বা ধস নামতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত মূল্যায়ন করা প্রযুক্তি খাতে আকস্মিক পতন হলে তা শুধু শেয়ারবাজারে সীমাবদ্ধ থাকবে না; ঋণ ব্যবস্থা, বিনিয়োগ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপরও চাপ তৈরি করতে পারে।
বেইলি এর আগে এআই-নির্ভর বিনিয়োগের সঙ্গে বাজারে তৈরি হওয়া সম্ভাব্য 'বুদ্বুদ' নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছিলেন। তার মতে, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি গুরুত্বপূর্ণ হলেও অর্থনীতিতে অতিরিক্ত প্রত্যাশা তৈরি হলে তার পরিণতি বিপজ্জনক হতে পারে।
বিশ্বব্যাপী নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর ডাক
অ্যান্ড্রু বেইলি মনে করছেন, এআইয়ের ঝুঁকি মোকাবিলায় কোনও একটি দেশের পক্ষে একা কাজ করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন আন্তর্জাতিক সহযোগিতা।
তিনি জি২০ দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, উন্নত এআই ব্যবহারের জন্য সমন্বিত নীতিমালা তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে এমন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে বড় ধরনের প্রযুক্তিগত বিপর্যয়ের পর দ্রুত স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফেরা যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে বিশ্বের বড় ব্যাংক, বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ও আর্থিক সংস্থাগুলো অল্প কয়েকটি প্রযুক্তি সরবরাহকারীর ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। কোনও একটি বড় প্রযুক্তিগত সমস্যা বা নিরাপত্তা ভাঙন হলে তার প্রভাব বহু প্রতিষ্ঠানে একসঙ্গে পড়তে পারে।
এআই: আশীর্বাদ না আতঙ্ক?
এআই নিয়ে বিশ্বজুড়ে দ্বিমুখী আলোচনা চলছে। একদিকে এই প্রযুক্তি উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারে, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, গবেষণা ও শিল্পে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে চাকরি, সাইবার নিরাপত্তা এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়ে তৈরি হচ্ছে উদ্বেগ।
ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের গভর্নরের সতর্কবার্তা মূলত প্রযুক্তি বন্ধ করার আহ্বান নয়; বরং দ্রুত এগিয়ে চলা এআই বিপ্লবকে নিরাপদ ও নিয়ন্ত্রিত করার আহ্বান।
বিশ্ব অর্থনীতি যখন মূল্যস্ফীতি, ঋণের চাপ এবং ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার মতো একাধিক সমস্যার মুখোমুখি, তখন এআইয়ের অনিয়ন্ত্রিত ঝুঁকি নতুন সংকট তৈরি করতে পারে বলেই সতর্ক করছেন অর্থনীতিবিদরা।
সতর্কতার প্রয়োজন বাংলাদেশেও
বিশ্ব আর্থিক ব্যবস্থায় এআই-জনিত কোনও বড় ধাক্কা তৈরি হলে বাংলাদেশও পরোক্ষভাবে তার প্রভাব অনুভব করতে পারে। দেশের ব্যাংকিং, মোবাইল আর্থিক পরিষেবা ও ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থা দ্রুত প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠছে। ফলে এআই-চালিত সাইবার হামলা, তথ্য চুরি বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তিগত দুর্বলতা নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। পাশাপাশি বিশ্ববাজারে এআই বিনিয়োগের সম্ভাব্য ধস হলে বৈদেশিক বিনিয়োগ, রপ্তানি, শেয়ারবাজার ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক আস্থার ওপরও চাপ পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে সঠিক নীতিমালা, শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা এবং দক্ষ জনবল তৈরি করা গেলে এআই বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকি নয়, বরং ব্যাংকিং দক্ষতা, জালিয়াতি শনাক্তকরণ ও ডিজিটাল অর্থনীতির উন্নয়নে বড় সুযোগও হয়ে উঠতে পারে। তাই অ্যান্ড্রু বেইলির সতর্কবার্তা বাংলাদেশের জন্যও একটি বার্তা, এআই গ্রহণের পাশাপাশি এর ঝুঁকি মোকাবিলার প্রস্তুতিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
অ্যান্ড্রু বেইলির বার্তা তাই স্পষ্ট, এআইয়ের দৌড় থামানো নয়, কিন্তু তার লাগামও ছেড়ে দেওয়া যাবে না। কারণ ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অনেকটাই নির্ভর করছে মানুষ কতটা দায়িত্বশীলভাবে এই প্রযুক্তিকে ব্যবহার করতে পারে তার ওপর।







