হংকংয়ে বইয়ের দোকানে গ্রেপ্তারি অভিযান
‘আমি বই বিক্রেতা’ স্লোগানে উত্তাল তাইওয়ান

হংকং পুলিশ ‘হ্যাভ এ নাইস স্টে’ নামক ব্যক্তি মালিকানাধীন বইয়ের দোকান থেকে একজন কর্মচারীকে গ্রেপ্তারের পর বই জব্দ করে নিয়ে যাচ্ছে। ছবি : সংগৃহীত
চীনের স্বায়ত্তশাসিত হংকংয়ে ব্যক্তি মালিকানাধীন একটি বইয়ের দোকান থেকে সম্প্রতি এক নারীকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাকে বাইরে আনার সময় দুহাত পেছনে বাঁধা ছিল। কিন্তু তার মাথা ছিল উঁচুতে। ওই টি-শার্টে একটি সাধারণ স্লোগান লেখা ছিল, ‘আমি একজন বইয়ের দোকানের কর্মচারী।’
পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার ওই নারী গত সপ্তাহে দুটি বইয়ের দোকানে তল্লাশি চালানোর সময় গ্রেপ্তার হওয়া পাঁচজনের একজন। তাদের বিরুদ্ধে ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ বিষয়বস্তু থাকা বই প্রদর্শন ও বিক্রির অভিযোগ আনা হয়েছে, যা হংকংয়ের জাতীয় নিরাপত্তা আইনে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ডযোগ্য অপরাধ।
এই গ্রেপ্তারের পর থেকে ওই টি-শার্টের স্লোগানটি তাইওয়ানের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। সামাজিকমাধ্যম ‘থ্রেডস’-এ বই বিক্রেতা, সংসদ সদস্য এবং অধিকার কর্মীরা হংকংয়ের প্রতি সংহতি জানাতে ‘আমি একজন বইয়ের দোকানের কর্মচারী’ হ্যাশট্যাগটি শেয়ার করছেন ।
তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে তার ফেসবুক পেজে লিখেছেন, রাজনৈতিক চাপের মুখে ‘ভাষাকে’ কখনো স্তব্ধ করা উচিত নয়।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে হংকংয়ে বইয়ের দোকানের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের এটি তৃতীয় ঘটনা। দীর্ঘ সময় ধরে এ অঞ্চলটিতে ব্যক্তি মালিকানাধীন বইয়ের দোকানে ব্যাপক অভিযানের কারণে এগুলো প্রায় শেষ হওয়ার পথে।
হংকং কর্তৃপক্ষ সর্বশেষ অভিযানে ঠিক কোন বইগুলো রাষ্ট্রদ্রোহী ছিল তা সুনির্দিষ্টভাবে জানায়নি। তবে এই গ্রেপ্তারের পর হংকংয়ের নিরাপত্তা প্রধান ক্রিস টাং বলেছেন, বই বিক্রেতাদের দায়িত্ব রয়েছে তাদের বইগুলো আইনসম্মত কিনা তা নিশ্চিত করা।
তিনি একটি উদাহরণ দিয়ে বলেছেন, যেমন খাবার বিক্রেতাদের নিশ্চিত করতে হয় যে তাদের খাবার খেয়ে মানুষ অসুস্থ হবে না।
গত সপ্তাহের অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া পাঁচজনকেই পরবর্তীতে জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়েছে।
নিষিদ্ধ বইটির খোঁজে তাইওয়ানে হিড়িক
হংকং পুলিশ এই বিষয়ে আরও কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। তবে কিছু প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, অপরাধ তালিকায় থাকা বইগুলোর মধ্যে সংবাদমাধ্যম এনপিআর-এর সাংবাদিক এমিলি ফেংয়ের লেখা ‘লেট অনলি রেড ফ্লাওয়ার্স ব্লুম: আইডেন্টিটি অ্যান্ড বিলংগিং ইন শি জিনপিংস চায়না’ বইটি থাকতে পারে।
এই খবরের পর তাইওয়ানে বইটির জন্য উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। তাইওয়ানের প্রকাশক অ্যাক্রোপলিস পাবলিশিং গত সপ্তাহে জরুরি ভিত্তিতে আরও ১০ হাজার অতিরিক্ত কপি ছাপানোর অর্ডার দিয়েছে।
অ্যাক্রোপলিস-এর সিনিয়র এডিটর সারা সুং বলেছেন, কিছু পাঠক ‘গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার একটি ঘোষণা’ হিসেবে এই বইটি কিনছেন। সুং আরও যোগ করেন, তারা দেখাচ্ছে যে চীনের সেন্সরশিপের মাধ্যমে তাদের স্তব্ধ বা ভীত করা যাবে না।
তাইওয়ানের রাজধানী তাইপের একটি বইয়ের দোকানমালিক চ্যাং হুই-জু জানিয়েছেন, তার দোকানে এমিলি ফেং-এর বইটির আর কোনো স্টক নেই। চ্যাং বলেছেন, এর আগে, খুব কম মানুষই এটির দিকে মনোযোগ দিয়েছিল। কিন্তু এই ঘটনার পরপরই বইটি সব জায়গায় শেষ হয়ে গেছে।
তাইপেই-এর আরেকটি দোকান ‘কুয়োস অ্যাস্ট্রাল বুকশপ’-এও বইটি শেষ হয়ে গেছে। সেখানে বইয়ের কপি খুঁজে না পাওয়া একজন গ্রাহক উ জিয়া-শুয়ান বলেছেন, তিনি সাধারণত চীন সংক্রান্ত বইয়ের প্রতি আগ্রহী নন, কিন্তু হংকংয়ের গ্রেপ্তারের ঘটনায় তার আগ্রহ জেগেছে। তার ভাষ্য, এটি নিষিদ্ধ হওয়ার ঘটনাটি আমাকে আরও বেশি কৌতূহলী করে তুলেছে।
এক জনপদ, দুই স্মৃতির গল্প
এমিলি ফেং-এর এই বইটিতে চীনের নেতা শি জিনপিং-এর দেশ শাসনের কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ব্যবচ্ছেদ করা হয়েছে। বইটির একটি অধ্যায় যার নাম ‘দ্য বুকসেলার’, সেখানে হংকংয়ের প্রখ্যাত বই বিক্রেতা লাম উইং-কি-র ওপর আলোচনা করা হয়েছে।
লাম ২০১৫ সালে চীনা কর্তৃপক্ষের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন, কিন্তু পরে তিনি হেফাজত থেকে পালিয়ে তাইওয়ানে চলে যান এবং সেখানে তাইপেইতে তার বইয়ের দোকান ‘কজওয়ে বে বুকস’ পুনরায় চালু করেন। এই মাসের শুরুর দিকে লাম মারা যান। তার তাইপের দোকানের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত। দোকানটির বন্ধ শাটারে এখনও তার সমর্থকরা বিভিন্ন চিরকুট, ফুল এবং বিয়ারের ক্যান রেখে শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন।
লামের এই কাহিনী তাইওয়ান ও হংকংয়ের একে অপরের সঙ্গে এবং সেই সঙ্গে মূল ভূখণ্ড চীনের সঙ্গে থাকা জটিল ও অস্বস্তিকর সম্পর্কের চিত্র তুলে ধরে । তাইওয়ান কখনোই গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের অংশ ছিল না। কিন্তু বেইজিং দীর্ঘকাল ধরে এই স্বশাসিত দ্বীপটিকে তাদের ভূখণ্ডের অংশ হিসেবে দাবি করে আসছে। সম্প্রতি এটিকে চীনের সঙ্গে একীভূত করার হুমকি দিয়েছে বেইজিং।
চীনের প্রস্তাবিত একটি শান্তিপূর্ণ একীভূতকরণের পথ হলো হংকংয়ের মতো তাইওয়ানকেও ‘এক দেশ, দুই ব্যবস্থা’ কাঠামোর অধীনে শাসন করা। তবে ৮০ শতাংশের বেশি তাইওয়ানিজ এই ধারণা প্রত্যাখ্যান করেছেন।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান




