চীনে খনিজ খোঁজে এআই
- ছয় মাসের কাজ এক সপ্তাহে

সংগৃহীত ছবি
খনিজ সম্পদের সন্ধানে নতুন প্রযুক্তির যুগে প্রবেশ করল চীন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)-নির্ভর এমন দুটি ব্যবস্থা তৈরি করেছে বেইজিং, যা খনিজ অনুসন্ধানের দীর্ঘ প্রক্রিয়াকে কয়েক মাস থেকে নামিয়ে আনতে পারে মাত্র কয়েক দিনে। চীনের দাবি, যে কাজ সম্পন্ন করতে আগে প্রায় ছয় মাস সময় লাগত, তা এখন মাত্র এক সপ্তাহেই করা সম্ভব।
গত শনিবার প্রকাশিত গ্লোবাল টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিয়ানজিনে আয়োজিত ২০২৬ চায়না ইন্টারন্যাশনাল মাইনিং কনফারেন্সে চীনের প্রাকৃতিক সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন চায়না জিওলজিক্যাল সার্ভে দুটি নতুন এআই ব্যবস্থা উন্মোচন করেছে ‘স্মার্ট প্রস্পেক্টিং’ এবং ‘স্মার্ট ম্যাপিং’। এই প্রযুক্তি খনিজ অনুসন্ধান ও ভূতাত্ত্বিক জরিপের পদ্ধতিতে বড় পরিবর্তন আনবে বলে জানিয়েছে চীনা কর্তৃপক্ষ।
‘স্মার্ট প্রস্পেক্টিং’ ব্যবস্থাটি ভূতাত্ত্বিক তথ্য, খনিজ-সংক্রান্ত বিশাল ডেটাবেজ, বিশেষজ্ঞ জ্ঞান এবং এআই অ্যালগরিদম ব্যবহার করে সম্ভাবনাময় খনিজ অঞ্চল চিহ্নিত করতে পারে। চীনের দাবি, এই প্রযুক্তি সোনা, লোহা, তামা, লিথিয়াম, কোবাল্ট, নিকেল, ক্রোমিয়াম, ইউরেনিয়ামসহ গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত খনিজ অনুসন্ধানে ব্যবহার করা যাবে।
প্রচলিত পদ্ধতিতে খনিজ অনুসন্ধানের জন্য দীর্ঘ সময় ধরে মাঠপর্যায়ের পরীক্ষা, নমুনা সংগ্রহ এবং বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণের প্রয়োজন হয়। কিন্তু নতুন এআই ব্যবস্থা একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণ করে দ্রুত সম্ভাব্য খনি এলাকার তালিকা তৈরি করতে পারে।
চীনের ভূতাত্ত্বিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, পরীক্ষামূলক ব্যবহারে এই প্রযুক্তি অনুসন্ধানের দক্ষতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। পশ্চিম চীনের একটি সোনার খনি অনুসন্ধান প্রকল্পে এআই ব্যবস্থা কয়েক দিনের মধ্যে বিপুল পরিমাণ মানচিত্র ও ভূতাত্ত্বিক তথ্য বিশ্লেষণ করে সম্ভাবনাময় এলাকা চিহ্নিত করেছে।
অন্যদিকে, ‘স্মার্ট ম্যাপিং’ ব্যবস্থা ভূতাত্ত্বিক মানচিত্র তৈরির কাজকে আরও দ্রুত ও নির্ভুল করার লক্ষ্য নিয়ে তৈরি হয়েছে। এটি ভূস্তরের গঠন শনাক্ত করা, তথ্য বিশ্লেষণ এবং রিপোর্ট তৈরির মতো কাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে করতে পারে।
বিশ্ব জুড়ে গুরুত্বপূর্ণ খনিজের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সেমিকন্ডাক্টর ও আধুনিক প্রযুক্তি শিল্পে ব্যবহৃত লিথিয়াম, কোবাল্ট ও নিকেলের মতো খনিজ এখন কৌশলগত সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ফলে দ্রুত নতুন উৎস খুঁজে বের করা শুধু অর্থনৈতিক নয়, জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়ও হয়ে উঠেছে।
তবে এআইয়ের এই দ্রুত বিস্তার শুধু প্রযুক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়, এর সঙ্গে বাড়ছে নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তার প্রশ্নও। বিশ্বের অন্যতম আলোচিত এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা দারিও আমোদেই-সহ একাধিক প্রযুক্তি নেতা সতর্ক করে আসছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষমতা যত বাড়ছে, ততই প্রয়োজন হচ্ছে এর নিরাপদ ও দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, খনিজ অনুসন্ধান, শিল্প উৎপাদন বা বৈজ্ঞানিক গবেষণার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে এআই যত বেশি সিদ্ধান্ত গ্রহণে যুক্ত হবে, ততই তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা, স্বচ্ছতা এবং মানব নিয়ন্ত্রণের বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
চীনের নতুন এআইভিত্তিক খনিজ অনুসন্ধানব্যবস্থা সেই বৃহত্তর প্রযুক্তিগত পরিবর্তনেরই অংশ। একদিকে এটি কয়েক মাসের কাজ কয়েক দিনে নামিয়ে এনে সম্পদের সন্ধানে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে, অন্যদিকে সামনে আনছে একটি বড় প্রশ্ন, অত্যন্ত শক্তিশালী এই প্রযুক্তিকে কীভাবে মানুষের স্বার্থ ও নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা যাবে?
চীন জানিয়েছে, তারা এই প্রযুক্তি আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও ব্যবহার করতে চায়। সৌদি আরব, উজবেকিস্তান, মরক্কো, লাওস, পেরু ও তানজানিয়ার মতো দেশের সঙ্গে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
খনিজ অনুসন্ধানের এই নতুন অধ্যায় দেখিয়ে দিচ্ছে, ভবিষ্যতের সম্পদ খোঁজার লড়াই শুধু ভূতত্ত্ববিদদের হাতে থাকবে না। মাটির গভীরে লুকিয়ে থাকা সম্পদের সন্ধানেও এখন বড় ভূমিকা নিতে চলেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।



