যুক্তরাষ্ট্র নাকি ইরান
নতুন যুদ্ধবিরতি চুক্তির প্রয়োজন কার বেশি?

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
আবারও তীব্র হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত । টানা পঞ্চম দিনের মতো হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। জবাবে উপসাগরীয় কয়েকটি দেশে পাল্টা হামলা করেছে ইরান। এর মধ্যেই গত মাসের (১৮ জুন) যুদ্ধবিরতি বাড়ানো এবং আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে সই হওয়া সমঝোতা স্মারক আর কার্যকর নয় বলে জানিয়েছে দুই দেশই। তবে কূটনৈতিক সমাধানের পথ পুরোপুরি বন্ধ করেনি কোন পক্ষই। চলমান এ পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে দীর্ঘমেয়াদী এই সংঘাত চালিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য কার বেশি? অর্থনৈতিক, সামরিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা কি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দুই দেশকেই নতুন করে যুদ্ধবিরতির পথে ফিরতে বাধ্য করবে?
ইরানের সামনে অর্থনীতি, সামরিক শক্তি ও কূটনীতির চাপ
দীর্ঘদিন ধরেই কঠোর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মধ্যে রয়েছে ইরান। সাম্প্রতিক সংঘাত আরও বাড়িয়েছে সেই চাপ। নিষেধাজ্ঞার কারণে কমেছে তেল রপ্তানি, কঠিন হয়েছে আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় প্রবেশ এবং বৈদেশিক সম্পদের বড় অংশ রয়েছে স্থগিত। তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সালে ইরানের মাথাপিছু জিডিপি ছিল প্রায় ৮ হাজার ডলার। ২০২৪ সালে তা কমে দাঁড়ায় প্রায় ৫ হাজার ডলারে। একই সময়ে দৈনিক তেল রপ্তানি ২২ লাখ ব্যারেল থেকে নেমে আসে ১৫ লাখ ব্যারেলে।
জুনে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা হওয়ার পর নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করে যুক্তরাষ্ট্র, নিষেধাজ্ঞায় ছাড় দেয় ৬০ দিনের জন্য এবং প্রতিশ্রুতি দেয় ইরানের কিছু সম্পদ অবমুক্ত করার। এর ফলে একদিনেই ১৫ শতাংশ বেড়ে যায় ইরানের মুদ্রা রিয়ালের মান । কিন্তু চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র আবারও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় দীর্ঘস্থায়ী হয়নি সেই স্বস্তি।
সামরিক ক্ষেত্রেও ইরান রয়েছে উল্লেখযোগ্য ক্ষতির মুখে। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজর (সিএসআইএস) বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম ধাপেই শেষ হয়ে যায় ইরানের যুদ্ধ-পূর্ব ক্ষেপণাস্ত্র মজুতের ৩০ শতাংশ এবং ড্রোনের ৬০ শতাংশ। হামলার শিকার হয়েছে নৌঘাঁটি, বন্দর ও অস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্রও। ২০২৫ সালের ১২ দিনের যুদ্ধে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ে বলে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি। গত সপ্তাহ থেকে নতুন করে শুরু হওয়া হামলায় কৌশলগত গ্রেটার তুনব দ্বীপসহ আরও কয়েকটি সামরিক স্থাপনায় আঘাত হানা হয়েছে।
কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও চাপ বাড়ছে তেহরানের ওপর। মার্চ ও এপ্রিলে উপসাগরীয় দেশগুলোতে হামলার পর যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল, সাম্প্রতিক পাল্টা হামলায় তা আরও বেড়েছে। এর প্রেক্ষাপটে উপসাগরীয় দেশগুলো সামরিক তথ্য বিনিময় এবং আগাম সতর্কতা ব্যবস্থায় পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদার করছে।
তবে এসব চাপের মধ্যেও আপসের ইঙ্গিত দিচ্ছে না তেহরান। প্রধান সমঝতাকারি মোহাম্মদ বাকের গালিবাফের ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরান এখন ’অস্তিত্বের লড়াইয়ে’ রয়েছে। তাই শান্তি চুক্তি মেনে চলার কোনো কারণ নেই।
অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক আলাম সালেহর মতে, প্রায় ৪৭ বছরের নিষেধাজ্ঞার অভিজ্ঞতায় ইরান অর্থনৈতিকভাবে টিকে থাকার পথ তৈরি করেছে। তার মতে, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা ছাড়া কোনো চুক্তিতে যেতে রাজি নয় তেহরান। অর্থনৈতিক চাপ যতই থাকুক, দুর্বলতার বার্তা দিতে চায় না দেশটি। যুদ্ধবিরতির পর ইরান দ্রুত ড্রোন উৎপাদনও আবার শুরু করেছে বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রও চাপমুক্ত নয়
যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে ইরানের সঙ্গে সংঘাত । সাম্প্রতিক হামলার পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ১২ শতাংশ বেড়েছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহন নিয়ে উদ্বেগও ফিরে এসেছে। যুদ্ধ শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন পেট্রলের দাম ছিল ২ দশমিক ৯৮ ডলার। মে মাসে তা বেড়ে ৪ দশমিক ৬৩ ডলারে পৌঁছায়।
জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রভাব পড়ছে জনমতেও। চলতি সপ্তাহে প্রকাশিত ইউগভ জরিপ অনুযায়ী, ৫৭ শতাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করা ট্রাম্প প্রশাসনের ভুল সিদ্ধান্ত। নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে থাকায় বিষয়টি রিপাবলিকানদের জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করছে। কয়েকটি জরিপে ইতোমধ্যে ডেমোক্র্যাটদের সামান্য এগিয়ে থাকার ইঙ্গিত মিলেছে।
অস্ত্রের মজুত নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। সিএসআইএসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত সাতটি প্রধান অস্ত্রের মধ্যে অন্তত চারটির মজুত যুদ্ধের প্রথম ধাপেই অর্ধেকে নেমে আসে। এসব অস্ত্রের মজুত পুনর্গঠনে কয়েক মাস থেকে কয়েক বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। একই সঙ্গে যুদ্ধের ব্যয়ও বাড়ছে। সেন্টার ফর আমেরিকান প্রগ্রেসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ১৪ জুলাই পর্যন্ত এই সংঘাতে ১৪ জন মার্কিন সেনা নিহত এবং আরও ৪১৪ জন আহত হয়েছেন।
আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস গ্রুপের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ব্রায়ান ফিনুকেনের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ শুধু ইরানকে ঘিরে নয়। চীনের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির সঙ্গে সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ সংঘাতের জন্যও এসব অস্ত্র প্রয়োজন হতে পারে।
অন্যদিকে আলাম সালেহ মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ উভয় পক্ষের জন্যই ব্যয়বহুল। তবে আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির দিক থেকে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ছে যুক্তরাষ্ট্র। তার মতে, চীন ও রাশিয়া দেখছে—সব ধরনের সামরিক সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও মধ্যম শক্তির একটি দেশের বিরুদ্ধে দ্রুত ফল আনতে পারছে না ওয়াশিংটন।
সব মিলিয়ে, অর্থনীতি, সামরিক সক্ষমতা ও কূটনৈতিক বাস্তবতা সব দিক থেকেই চাপ বাড়ছে দুই দেশের ওপর। তবে সেই চাপের ধরন এক নয়। ইরানের কাছে এটি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও টিকে থাকার প্রশ্ন। যুক্তরাষ্ট্রের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থনৈতিক ব্যয়, জনমত, অস্ত্রের মজুত এবং রাজনৈতিক হিসাব। ফলে নতুন যুদ্ধবিরতির প্রয়োজন দুই পক্ষেরই রয়েছে। কিন্তু বর্তমান অবস্থানে দাঁড়িয়ে কোনো পক্ষই আপসের প্রথম পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত এমন ইঙ্গিত এখনো মেলেনি।




