একটি মুখের খোঁজে শত শত কিলোমিটার!
- হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ছুটছেন স্বজনরা
- মর্গের ছবিতে খুঁজছেন আপনজনের মুখ, তবু মরে না ফেরার আশা

ছবি: রয়টার্স
একটি ফোনকল হঠাৎ থেমে যায়। তারপর আর কোনো শব্দ নেই। কোথাও মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে প্রিয়জন, কোথাও নদীর উন্মত্ত স্রোত তাকে নিয়ে গিয়েছে অজানায়। আর সেই মানুষটিকে খুঁজতে নেপালের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটছেন স্বজনরা। হাসপাতালের মর্গে সাজানো অচেনা মুখের ছবি একটির পর একটি দেখছেন, পুলিশ শিবিরে যাচ্ছেন, উদ্ধারকেন্দ্রে খোঁজ করছেন। কারও পকেটে প্রিয়জনের ছবি, কারও মনে শেষ ফোনকথা। ভোটেকোশী বন্যার পাঁচ দিন পরও তাদের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন— মানুষটি কোথায় আছে এখন? কেমন আছে? আদৌ আছে তো? দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট।
গত বুধবার ভয়াবহ বন্যার পর রসুয়ার হাকুবেসিতে উচ্চ ত্রিশূলি-১ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত ২০ বছরের প্রবীণ বুধা নিখোঁজ হন। মঙ্গলবার দাদা রাম বুধা তাকে কর্মস্থলে রেখে কাঠমান্ডু ফিরেছিলেন। পরদিন ভাইকে খুঁজতে হাকুবেসি পৌঁছে সুড়ঙ্গে ঢোকার চেষ্টা করেন রাম। বুকসমান কাদা জমে থাকায় আর এগোতে পারেননি। সুড়ঙ্গের সামনে দাঁড়িয়ে ভাইয়ের নাম ধরে ডাকলেও কোনো উত্তর আসেনি। জুমলার পাটারাসি গ্রামীণ পুরসভার বাসিন্দা প্রবীণ সদ্য দ্বাদশ শ্রেণি পাস করেছিলেন। বিদেশে যাওয়ার আগে কিছু টাকা রোজগারের জন্য তাকে রসুয়ায় এনেছিলেন দাদা।
জাতীয় বিপর্যয় ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের হিসাবে, সোমবার বিকাল পর্যন্ত মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯০৩ জনে। উদ্ধার করা হয়েছে ১০ হাজার ৪৫১ জনকে। নিখোঁজ ৪ হাজার ২৪৭ জন। তাদের মধ্যে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ৯৩৩ জন কর্মী, প্রকৌশলী ও কর্মচারী। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ৫৯২ জন বিদেশি এবং বিদেশি পর্যটকদের সঙ্গে থাকা ১২৭ জন নেপালিও।
কর্ণালি, সুদূর পশ্চিম ও মধেশের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে রসুয়া, নুওয়াকোট, চিতওয়ান, নওয়ালপুর, তানাহুন ও পোখরায় ছুটছেন মানুষ। দাংয়ের তুলসিপুরের সরিতা চৌধুরী খুঁজছেন স্বামী সুনীলকে। তিমুরের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে রাজমিস্ত্রি ছিলেন তিনি। বন্যার আগের দিন বিকাল ৫টা পর্যন্ত কথা হয়েছিল তাদের। নদী-নালা নিয়ে ভয় পাওয়ার কথা জানিয়েছিলেন সুনীল। সরিতা বাড়ি ফিরতে বললেও তিনি রাজি হননি। এখন ১৬ বছরের ছেলে ও ১০ বছরের মেয়ের একটাই প্রশ্ন— বাবা কোথায়?
তুলসিপুরের ৪০ জনের দল ওয়ার্ড চেয়ারম্যান মোহন পৌডেলের নেতৃত্বে ১৮ জন নিখোঁজ বাসিন্দার খোঁজে চিতওয়ান হয়ে পোখরা যায়। সেখানে ১০২টি অজ্ঞাত দেহের ছবি পরীক্ষা করেও কাউকে শনাক্ত করা যায়নি। কাস্কি পুলিশের দাবি, প্রতিদিন প্রায় এক হাজার মানুষ পোখরায় আসছেন নিখোঁজ স্বজনের খোঁজে। রৌতহটের ৬০ বছরের বিরসিমায়া ছেলেকে খুঁজতে ভরতপুরে পৌঁছেছেন। রসুয়া কাস্টমসের কাছে কর্মরত শের বাহাদুর মাঝির ছবি মেলেনি। তবু তার বিশ্বাস, ছেলে বেঁচে আছে। ব্যাঙ্কের কারিঙ্গা থারু ভাই আশারাম ও ভাইপো পৃথ্বী নারায়ণের খোঁজে ভরতপুরে দুদিন কাটিয়ে শেষ পর্যন্ত ফিরেছেন। কোথায় আর খুঁজবেন, জানেন না।
নুওয়াকোটের নবরাজ লামা ভাই রমেশ্বরকে খুঁজতে নুওয়াকোট, চিতওয়ান, গইঁডাকোট ও পোখরা ঘুরেছেন। বন্যার আগের দিন ভিডিও কলে কথা হয়েছিল। রমেশ্বর জানিয়েছিলেন, খাওয়া শেষ করে ঘুমোতে যাচ্ছেন। পাঁচ দিন পরও তার না দেহ মিলেছে, না জীবিত থাকার খবর। রসুয়াগড়ির দিকে পণ্য নিতে যাওয়া চালক রমেশ্বরের মতোই নিখোঁজ মাকওয়ানপুরের প্রশান্ত। জেলা প্রশাসনের হিসাবে, মাকওয়ানপুরের ৬৫ জন এখনো নিখোঁজ।
স্যালিয়ানের মেনওয়ালাল বুধাথোকি হাসপাতালে আহত ভাই গিরিলালকে পেলেও খুঁজে পাননি তার স্ত্রী সুনীতা ও তিন সন্তান নির্মলা, কেশব ও নিরজনকে। সুনীতার দেহ রসুয়ায় পাওয়া যেতে পারে বলে খবর এলেও নিশ্চিত নয়। একই জেলা থেকে অর্জুন রানা খুঁজছেন শ্রমিক হিসেবে তিমুরে যাওয়া ৬০ বছরের বাবা দুর্গা বাহাদুর রানাকে। স্থানীয় চেয়ারম্যান দুর্গা বাহাদুর পুনও নিখোঁজদের সন্ধানে তাদের সঙ্গে গিয়েছেন।
আর এক সকালেই সব বদলে যায় প্রিয়াঙ্কা গাদারিয়ার জীবনে। সকাল সাড়ে ৮টায় স্বামী আশিসের সঙ্গে ফোনে কথা বলছিলেন তিনি। হঠাৎ ফোন কেটে যায়। আধঘণ্টা পর জানতে পারেন বন্যার কথা। ২৩ বছরের আশিসের প্রথম পোস্টিং ছিল মাইলুং পুলিশ চৌকিতে। এখনো নিখোঁজ। নেপালি সেনার ৪৫, নেপাল পুলিশের ২৫ এবং সশস্ত্র পুলিশের ১২ সদস্যও নিখোঁজ।
লুম্বিনী প্রাদেশিক হাসপাতালের মর্গে তিন দিন ধরে ছবি হাতে ঘুরছেন হুমনাথ নেউপানে। তার আত্মীয়, প্রায় ২৮ বছরের কাস্টমস এজেন্ট প্রকাশ দেবকোটা নিখোঁজ। ফেসবুক থেকে ছবি ছাপিয়ে পুলিশের কাছে বারবার দেখাচ্ছেন তিনি। অন্যদিকে মেয়ের খোঁজে ব্যাঙ্কের তিলক ঘার্তি মাগার ৩০ হাজার নেপালি টাকা ধার করেছেন। ২৮ বছরের জানকি রসুয়ার হোটেলে কাজ করছিলেন। বিদেশে যাওয়ার জন্য দালালের হাতে টাকা খুইয়ে ঋণ শোধ করতে সেখানে গিয়েছিলেন।
এই মানুষগুলোর কাছে বাড়ি ফেরা মানে খোঁজ থামানো নয়। নদী যত দূরেই নিয়ে যাক, তারা ছুটছেন। কারণ শেষ আশাটুকু এখনো বেঁচে আছে।







