যেভাবে ছয় দিন বেঁচে ছিলেন এভারেস্টে হারিয়ে যাওয়া শেরপা

গত সপ্তাহে এভারেস্টে নিখোঁজ হওয়ার পর মৃত বলে আশঙ্কা করা দাওয়া শেরপাকে খুঁজে পাওয়া গেছে। ছবি : সংগৃহীত
মাউন্ট এভারেস্টে নিখোঁজ হওয়ার দীর্ঘ ছয় দিন পর জীবন্ত অবস্থায় পর্বত থেকে হামাগুড়ি দিয়ে নেমে আসা নেপালি গাইড দাওয়া শেরপা জানিয়েছেন তার অলৌকিক বেঁচে ফেরার গল্প।
বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, পকেটে থাকা অল্প কিছু চকলেট এবং এভারেস্টের বরফ চিবিয়ে চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি নিজেকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন।
‘পর্বত থেকে নামার সময় তিনি আসলে নিখোঁজ হননি; বরং অক্সিজেন ফুরিয়ে যাওয়ার কারণে তিনি বরফের পেছনে পড়ে থাকতে বাধ্য হয়েছিলেন’, ৫৭ বছর বয়সী এই শেরপা স্পষ্ট করেন।
ততক্ষণে সবাই ধরে নিয়েছিল, দাওয়া শেরপা হয়তো এভারেস্টে প্রাণ হারিয়েছেন। এমনকি নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে তার পরিবার শেষকৃত্যের আনুষ্ঠানিকতাও শুরু করে দিয়েছিল।
কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে এভারেস্টের একটি পরিচ্ছন্নতাকর্মী দল বেস ক্যাম্পের দিকে বরফের ওপর তাকে পিছলে পিছলে নেমে আসতে দেখে।
উদ্ধারের পর তাকে দ্রুত হেলিকপ্টারে করে কাঠমান্ডুর একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে পানিশূন্যতা, ফ্রস্টবাইট এবং একটি হাড় ভাঙার চিকিৎসা চলাকালীন তিনি গত শুক্রবার বিবিসি নেপালির সঙ্গে কথা বলেছেন।
দাওয়া শেরপা বলেছেন, ‘আমি ভাবিনি বেঁচে ফিরব। ভেবেছিলাম এভাবেই হয়তো আমি মারা যাব।’
গত বৃহস্পতিবার খুম্বু আইসফলের কাছে উদ্ধার হওয়ার আগে পর্বতারোহী ক্রিস থ্রাল-ই দাওয়া শেরপাকে শেষবার দেখেছিলেন। ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সাবেক এই সদস্য জানান, ক্যাম্প-৩ এর ঠিক ওপরে প্রায় সাড়ে ৭ হাজার মিটার উচ্চতায় দাওয়া শেরপা তার ব্যাকপ্যাকের ওপর বসে ছিলেন।
অক্সিজেন শেষ হয়ে যাওয়ার পর দাওয়া শেরপা আর হাঁটতে পারছিলেন না। তিনি বলেছেন, ‘প্রথম দুই দিন আমি কিছুই খাইনি। এরপর আমি বরফ চিবানো শুরু করি। এতে আমার দাঁতে প্রচণ্ড ব্যথা হচ্ছিল। তাও আমি শক্ত বরফ চিবিয়ে যাচ্ছিলাম।’
পরে তিনি পকেটে কিছু চকলেট খুঁজে পান। সেগুলোও তিনি খান। সঙ্গে কিছুটা গলে যাওয়া বরফের পানিও পান করেন।
ধীরে ধীরে নিচে নামার চেষ্টা করার একপর্যায়ে তিনি হিমবাহের একটি গভীর ফাটলে পড়ে যান। ওই ফাটলের ভেতর কোনো উপায় না পেয়ে তিনি টানা আড়াই দিন আটকে ছিলেন।
এরপর হঠাৎ আসা একটি বরফধস ফাটলের ভেতর বরফ ফেলে দেয়। যা তার জন্য আশার আলো নিয়ে আসে। দাওয়া শেরপা বলেছেন, ‘সেই জমা বরফের ওপর পা দিয়ে আমি সোজা হয়ে দাঁড়াই এবং ওপরের দিকে তাকাই... আমার মনে হলো আমি এবার এখান থেকে বের হতে পারব।’
ফাটল থেকে কোনোমতে বের হয়েই তিনি কাছাকাছি কিছু দড়ি পান। যা তাকে পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বত থেকে আরও নিচে নামতে সাহায্য করে।
দাওয়া শেরপার বেঁচে ফেরার খবর শেরপা সম্প্রদায়, তার সহযাত্রী পর্বতারোহী এবং নিজের পরিবারের কাছে বড় আনন্দের বার্তা নিয়ে এসেছে।
উল্লেখ্য, চলতি পর্বতারোহন মৌসুমে এভারেস্টে পাঁচজন মারা গেছেন। ১৯২০-এর দশক থেকে এ পর্যন্ত ৩০০-এর বেশি মানুষ এখানে প্রাণ হারিয়েছেন।
সেখানে উদ্ধার তৎপরতার দায়িত্বে থাকা ৮কে এক্সপেডিশনের নির্বাহী পরিচালক পেম্বা শেরপা এটিকে একটি প্রকৃত আত্মউদ্ধার হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
দাওয়া শেরপার স্ত্রী দামু শেরপা জানান, এক্সপেডিশন কোম্পানি যখন জানায় উদ্ধার অভিযান আর সম্ভব নয়, তখন তিনি আশা ছেড়ে দিয়ে শেষকৃত্যের কাজ শুরু করেছিলেন।
দামু শেরপা বলেছেন, চোখের সামনে তাকে প্রথমবার দেখে আমি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। এত উঁচুতে খাবার ও রসদ ছাড়া তিনি কীভাবে বেঁচে ছিলেন, তা আমি ভাবতেই পারছি না। নেপাল সরকারের উচিত নিশ্চিত করা যেন ভবিষ্যতে আর কারও এমন ভাগ্য না হয়।
সূত্র : বিবিসি




