নেপালে প্রিয়জনের খোঁজে সেনাক্যাম্প ও হাসপাতালে ভিড়

নিখোঁজ স্বজনের খোঁজে নুয়াকোটের বিদুরে অবস্থিত নেপালি সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণকেন্দ্রে এসে কান্নায় ভেঙে পড়েন যমুনা রোকায়া। ছবি: সংগৃহীত
নেপালে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে দিশাহারা শত শত পরিবার। সেনাক্যাম্প থেকে হাসপাতাল, এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ছুটছেন তারা। নিখোঁজদের ছবি টাঙিয়ে সন্ধান চালাচ্ছে সেনাবাহিনী। ছবির তালিকায় প্রিয়জনের মুখ খুঁজে কেউ ফিরছেন আশায়, কেউ আবার অপেক্ষা করছেন একটি খবরের জন্য।
বৃহস্পতিবার ভোর থেকেই নুওয়াকোটের মৈথালিতে নেপালি সেনাবাহিনীর সামরিক প্রশিক্ষণকেন্দ্রে ভিড় করেন শত শত মানুষ। কেউ সেনাবাহিনীর উদ্ধার করা ব্যক্তিদের তালিকায় স্বজনের নাম খুঁজছিলেন, আবার কেউ নিখোঁজ পরিবারের সদস্যদের উদ্ধারে সহায়তার জন্য কর্মকর্তাদের কাছে আকুতি জানাচ্ছিলেন।
গত বুধবার সকাল থেকে ভোতে কোশি নদীর উপনদী লেন্দে দিয়ে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা নেমে আসে। এতে রাসুয়া, নুওয়াকোট ও ধাদিং জেলার নদীতীরবর্তী জনপদগুলোতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় নিখোঁজ আছেন ৯১০ জন। যাদের মধ্যে ৫১৭ জন বিদেশি নাগরিক।
নেপালি সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণকেন্দ্রে আসা অনেকেই জনাই পূর্ণিমা উপলক্ষে গোসাইঙ্কুণ্ডে যাওয়া স্বজনদের খুঁজছিলেন। কেউ আবার জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ও টানেলের ভেতরে আটকে পড়া ব্যক্তিদের উদ্ধারের জন্য সহায়তা চাইছিলেন। নিখোঁজ স্বজনদের নাম ও পরিচয় সেনা কর্মকর্তাদের কাছে লিখে দিয়ে তাদের অবস্থান শনাক্তের আশায় অপেক্ষা করছিলেন অনেকে।
নিখোঁজদের মধ্যে আছেন স্বামী, বাবা, ভাই, বোন ও জামাই। তাদেরই একজন শশীকলা খাতিওয়াদা। তার স্বামী দীপক রিমাল মাইলুংয়ের ত্রিশূলি-৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কাজ করতেন। বুধবার বিকাল ৪টার দিকে টানেলের ভেতর থেকে স্ত্রীকে বার্তা পাঠিয়ে তিনি জানান, সহকর্মীদের সঙ্গে তারা নিরাপদে আছেন। তবে তাদের উদ্ধার করতে হবে। পরে আরেকটি বার্তায় জানান, টানেলের প্রবেশপথ বন্ধ হয়ে গেছে এবং কীভাবে বের হবেন, তা জানতে চান।
হিমালয়ের জলপ্রলয়
২৮ আগস্ট ২০২৬
শশীকলা জানিয়েছেন, তার স্বামীর বার্তা থেকে তারা জানতে পারেন, টানেলের ভেতরে আরও ৩৫ জন কর্মী আছেন। সাধারণত শ্রমিকরা সকাল ৭টার দিকে টানেলে প্রবেশ করেন এবং দুপুরে খাবারের জন্য বের হন। বুধবার সকাল ৮টার দিকে তিনি স্বামীকে ফোন করলেও যোগাযোগ হয়নি। দুপুরে ফোন করলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।
বুধবার সন্ধ্যা থেকেই স্বামীসহ অন্য শ্রমিকদের উদ্ধারে নিরাপত্তা বাহিনীর কাছে আবেদন জানিয়ে আসছেন শশীকলা। তাকে জানানো হয়েছে, সেনাবাহিনী তাদের খুঁজছে। তবে উদ্ধার অভিযান এখনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি বলে তিনি জানতে পেরেছেন।
নিখোঁজদের তালিকায় আছেন ২৯ বছর বয়সী বিস্কিলা তামাংয়ের স্বামী সোম বাহাদুর ঘালেও। চীন থেকে আমদানি করা বৈদ্যুতিক গাড়ি কাস্টমস অফিস থেকে কাঠমান্ডুতে নিয়ে যাওয়ার জন্য তিনি বুধবার রাসুয়ার কাস্টমস কার্যালয়ে গিয়েছিলেন। বন্ধুদের সঙ্গে গাড়ি চালানোর কাজেই সেখানে গিয়েছিলেন তিনি।
ঘালে পরিবারের বাড়ি রাসুয়ার লাহারেপৌয়া গ্রামীণ পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডে। তবে তারা বর্তমানে নুওয়াকোটের বিদুর পৌরসভার বাত্তারে বসবাস করছেন। স্বামীর কোনো খোঁজ না পেয়ে বিস্কিলা বলেছেন, দুই দিন হয়ে গেলেও তার স্বামী জীবিত আছেন কি না, কিংবা তার মরদেহ পাওয়া গেছে কি না, কোনো তথ্যই তারা পাচ্ছেন না। তিনি সেনাবাহিনীর সহায়তা কেন্দ্রে স্বামীর শারীরিক বর্ণনাও দিয়েছেন। এরপরও সন্ধ্যা পর্যন্ত কোনো খবর না পেয়ে তিনি প্রশিক্ষণকেন্দ্রের ফটকের পাশের একটি মন্দিরের কোণে একা বসে ছিলেন।বন্যার এক দিন পর বৃহস্পতিবার আরও বহু মানুষ স্বজনদের খোঁজে সেনা ব্যারাক, পুলিশ স্টেশন ও হাসপাতালগুলোতে ছুটে বেড়াচ্ছিলেন। শুধু দুর্গত এলাকাতেই নয়, আহতদের চিকিৎসার জন্য কাঠমান্ডুতে নিয়ে আসায় সেখানকার হাসপাতালগুলোতেও নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজ করছেন পরিবারের সদস্যরা।
কাঠমান্ডুর মহারাজগঞ্জের ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষণ হাসপাতালে বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানে মানুষের ভিড় দেখা যায়। অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন বাজলেই অপেক্ষমাণ স্বজনেরা ছুটে যাচ্ছিলেন। অ্যাম্বুলেন্সের দরজা খোলার আগেই উৎকণ্ঠিত চোখে স্ট্রেচারের দিকে তাকিয়ে প্রিয়জনকে খুঁজছিলেন তারা। কিন্তু পরিচিত মুখ না পেলে আবার অপেক্ষায় ফিরে যাচ্ছিলেন।
হাসপাতালের দেয়ালে টাঙানো আহতদের তালিকাতেও অনেকে স্বজনের নাম খুঁজছিলেন। কেউ জানেন না তাদের প্রিয়জন জীবিত আছেন, আহত হয়েছেন নাকি মারা গেছেন। এই অনিশ্চয়তাই তাদের হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ছুটিয়ে বেড়াচ্ছে।
দোলাখার বাসিন্দা বিজুলা কার্কিও বুধবার সকাল থেকে ২৪ বছর বয়সী ছেলের খোঁজে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ঘুরছেন। তার ছেলে পোশাক আনতে যাওয়ার কথা বলে মাকে বলেছিলেন, ‘আমি ফিরে আসব।’ এর পর থেকে তার সঙ্গে আর যোগাযোগ করা যায়নি।
বৃহস্পতিবার বিকাল ৫টা পর্যন্ত ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষণ হাসপাতালের পুলিশ ডেস্কে ভোতে কোশি বন্যায় নিখোঁজ স্বজনদের তথ্য দিয়ে এক হাজারের বেশি মানুষ নিবন্ধন করেছেন।
সিন্ধুপালচকের বারাবিসের বাসিন্দা এবং বর্তমানে কাঠমান্ডুর স্বয়ম্ভুতে বসবাসকারী গোমা থাপাও তার ৪০ বছর বয়সী স্বামীকে খুঁজছিলেন। তিনি জানান, তার স্বামী ১০ থেকে ১২ দিন আগে ওই এলাকায় গিয়েছিলেন। বুধবার সকাল ৮টার দিকে কাস্টমস কার্যালয় থেকে বের হয়ে ফিরে আসার কথা জানিয়েছিলেন। এর পর থেকে তার সঙ্গে আর যোগাযোগ হয়নি।
কাঠমান্ডুর বীর হাসপাতাল ও ট্রমা সেন্টারেও একই চিত্র দেখা গেছে। সিন্ধুপালচকের ভটলা সাদা তার ৩২ বছর বয়সী ভায়রা রাজকুমার শ্রেষ্ঠকে খুঁজছিলেন। ব্যবসার জন্য পোশাক আনতে মঙ্গলবার সীমান্তের ওপারে খাসায় গিয়েছিলেন রাজকুমার। বুধবার সকাল থেকে তার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই। তার ছবি বীর হাসপাতাল ও শিক্ষণ হাসপাতালে টাঙানো হয়েছে। পরিবারের একজন সদস্য মরদেহ আনা হতে পারে এমন আশায় কাঠমান্ডু বিমানবন্দরে অপেক্ষা করছেন, আর ভটলা হাসপাতালগুলোতে খোঁজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
ভটলা বলেছেন, এখনো রাজকুমারের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। তিনি কাঠমান্ডু মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে খোঁজ চালাবেন।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিখোঁজদের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত আছে। নেপাল পুলিশ, নেপালি সেনাবাহিনী ও সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর প্রায় এক হাজার সদস্যকে অভিযানে মোতায়েন করা হয়েছে। ব্যবহার করা হচ্ছে প্রায় দুই ডজন হেলিকপ্টার। নেপালি সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রাজা রাম বাসনেট জানিয়েছেন, এ পর্যন্ত বন্যাকবলিত বিভিন্ন এলাকা থেকে ৩০০ জনের বেশি মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে।
তিনি জানিয়েছেন, তিমুরে, স্যাফ্রুবেশি, মাইলুংসহ ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে।
সূত্র: কাঠমান্ডু পোস্ট










