প্রিয়জনের খোঁজে দিশাহারা স্বজনরা
শহরের ‘৯০ শতাংশ’ বাসিন্দা তলিয়ে গেছে পলিমাটিতে
- কাদা, বিধ্বস্ত সেতু আর মাটির নিচে বাড়ি নেপালে দুর্যোগ থেকে বিপর্যয়

বন্যায় নিখোঁজ প্রিয়জনের খোঁজে অপেক্ষায় নেপালের নুয়োকোটের স্বজনরা -রয়টার্স
প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে ব্যাপক বিপর্যয়ে নেপাল। গত বুধবার নেপাল-তিব্বত সীমান্তে আকস্মিক আঘাত হানে বন্যা। কাদামাটির নিচে ঘরবাড়ি, বিধ্বস্ত সেতু, ভেসে যাওয়া মানুষ, হাসপাতালে আপনজনকে খুঁজতে ভিড়। বন্যায় রক্ষা পাওয়া অনেকেই শুয়ে স্ট্রেচারে। কেউ হাঁটছেন অন্যের কাঁধে ভর দিয়ে। শহর জুড়ে হেলিকপ্টারের টানা গর্জন। আটকে পড়া মানুষদের আকাশপথে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। গতকাল বৃহস্পতিবার এমন হৃদয়বিদারক দৃশ্যই দেখা গেছে সীমান্তের নুয়াকোট শহরে।
অল্পের জন্য বন্যায় ভেসে যাওয়া থেকে রক্ষা পান কাস্টম কর্মকর্তা ওমকার জোশি। উদ্ধার হওয়ার আগের রাতটি কাটিয়েছিলেন সীমান্ত শহর তিমুরের একটি পাহাড়ের চূড়ায় আটকা পড়ে। তিনি নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে যে শহরটি ছেড়েছিলেন, তা পানি, কাদা ও ধ্বংসস্তূপের প্রবল স্রোতের নিচে প্রায় বিলীন হয়ে গেছে। আবেগঘন কণ্ঠে এএফপিকে বলেছেন, “সব শেষ। শহরের ‘৯০ শতাংশ’ বাসিন্দা মারা গেছে পলিমাটিতে তলিয়ে। উপত্যকার নিচ দিয়ে বন্যার পানি বয়ে যাওয়ার সময় শত শত মানুষ শুধু কাছের ঢাল বেয়ে ওপরে উঠে প্রাণ বাঁচান।” জোশি আরও বললেন, ‘এটি এক বিশাল সমাধিক্ষেত্র। অবশিষ্ট রয়েছে শুধু বালু আর নুড়িপাথর, মানুষের রক্তে যা লাল হয়ে আছে।’
বিদুর শহরের আরেকজন বাসিন্দা সীতা। তার স্কুলশিক্ষক ছোট ভাই রামচন্দ্রকে খুঁজতে দিগ্বিদিক ঘুরছেন। অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনো উপায় তার হাতে নেই। সীতা বলছিলেন, ‘দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার ঠিক আগেই সকালে ছোট ভাইয়ের সঙ্গে আমার কথা হয়েছিল। কিন্তু এরপর থেকেই তার ফোন বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।’ কাছাকাছি এক কোণে চুপচাপ বসে আনিশা নেপালি। তার গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রু। বিপর্যয়ের কথা শুনে বুধবারই কাঠমান্ডু থেকে ছুটে আসেন। নিখোঁজ মা ও ছোট ভাইয়ের কোনো খবরই তিনি পাননি। আনিশা বলেছেন, ‘আমি তাদের নাম জানিয়েছি, কিন্তু এখনো কোনো খবর পাইনি।’
বিদুরে, উদ্বিগ্ন বহু স্বজন এভাবেই রাস্তার পাশে ফুটবল মাঠকে আলাদা করা কাঁটাতার বেড়ার ফাঁক দিয়ে প্রিয়জনের পরিচিত মুখটি দেখার আশায় তাকিয়ে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের তথ্য অনুযায়ী, ত্রিশূলী নদীর তীরে অবস্থিত প্রায় ১৫০টি বাড়ির মধ্যে মাত্র একটি বাড়ি অক্ষত ছিল। সেটি চারতলাবিশিষ্ট একটি বৃদ্ধাশ্রম। তবে উদ্ধারকর্মীরা জানিয়েছেন, বৃদ্ধাশ্রমটি থেকে পালানোর চেষ্টার সময় ভূমিধসের কবলে পড়ে অন্তত সাতজন বয়স্ক বাসিন্দা ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েছেন। একজন উদ্ধারকর্মীর শেয়ার করা ছবিতে দেখা যায়, এক ভুক্তভোগী উপড়ে পড়া একটি গাছের নিচে আটকা পড়ে আছেন।
শহরের বাসিন্দা সাবির মিয়া জানিয়েছেন, পাহাড় থেকে বন্যার পানি তীব্র বেগে নেমে আসার আগাম সতর্কবার্তা অনেক মানুষের জীবন বাঁচাতে সাহায্য করেছে। তিনি বলেছেন, ‘আমাদের অনেকেই জীবন বাঁচাতে পেরেছি, কিন্তু বাকি সবকিছু হারিয়ে গেছে। এখন চারদিকে শুধুই ধ্বংসস্তূপ।’
বিধ্বস্ত অবকাঠামো: সিএনএনের একটি প্রতিবেদনে নেপালের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার চিত্র বর্ণনা করেছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, উত্তাল ত্রিশূলী নদীর ওপরের একটি বড় সেতু মাঝখান থেকে পরিষ্কারভাবে দু-টুকরো হয়ে যাওয়ার কথা। এ সেতুর পাশেই পথচারীদের চলাচলের উপযোগী তার ও ধাতুর তৈরি একটি সরু সেতু সম্পূর্ণ দুমড়েমুচড়ে ও বেঁকে যাওয়া অবস্থায় দাঁড়িয়ে।
নুয়াকোট পৌরসভার রাতা মাতে শহরে এসে শেষ হয়েছে একটি রাস্তা। সেখানে ছয় ইঞ্চিরও বেশি গভীর ঘন কাদা গাড়িগুলোর সামনে এগোনোর পথ আটকে দেয়। রাস্তা পরিষ্কারের কাজে নিয়োজিত তিনটি জেসিবি যন্ত্রের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও পরিস্থিতির কোনো সমাধান হয়নি।







