হিমালয়ের জলপ্রলয়
- নিখোঁজদের মধ্যে ৫৪০ জনই বিদেশি পর্যটক
- এই দুর্যোগকে জলবায়ু পরিবর্তনের ফল হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
চোখের পলকে মায়ের কোল থেকে ছিটকে গেল সন্তান। চিরতরে হারিয়ে গেল আজীবনের সঙ্গী। বুক চিরে বয়ে যাওয়া চঞ্চল পাহাড়ি নদীগুলো রুদ্রমূর্তিতে মুহূর্তেই জলরাক্ষস। এক লহমায় ভাসিয়ে নিয়ে গেল শত বছরের স্মৃতি, তিলে তিলে গড়া স্বপ্নের সংসার। হিমালয়ের হিমবাহ ভাঙা প্রলয়স্রোতে ভেসে গেল শত শত প্রাণ! পলকে মৃত্যুপুরী হিমালয়ের কোলঘেঁষে জেগে থাকা নেপালের শান্ত উপত্যকা। সকালে যেখানে পাখির কূজন আর চেনা মানুষের হাসিমুখ থাকার কথা ছিল, সেখানে আজ শুধু বুকফাটা হাহাকার। বানে ভেসে আসা জমাটবাঁধা কাদা সরালেই মিলছে প্রাণহীন নিথর শরীর! ভেসে গেছে সেতু-সড়ক। বিলীন হয়ে গেছে গ্রামের পর গ্রাম।
গত বুধবার সকাল ৯টা। তখনো পুরোপুরি দিনের আলো ফোটেনি তিব্বত-নেপাল সীমান্তের হিমালয় পাদদেশের শহরগুলোয়। হঠাৎ প্রলয় ওঠে হিমালয়ের ১৭ হাজার ফুট উঁচুতে। তিব্বতের গিরং পোর্ট (ল্যাংটাং লিরুং পর্বতমালা) অংশে ভেঙে পড়ে বিরাট হিমবাহ চাঁই। মুহূর্তে গর্জে ওঠে নেপালের সীমান্তবর্তী নদীগুলো। তিব্বতের কৈলাস, মানস সরোবর দুয়ারখ্যাত নেপালের রসুয়া হয়ে নুওয়াকোটের দিকে ধেয়ে আসে ‘মরণ বান’। হিমালয় সুনামি। নজিরবিহীন এ হড়পা বানে গতকাল বৃহস্পতিবার রাত পর্যন্ত নেপালের ৩৫৯ জন মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। তিব্বতে মাত্র ৩ জন। দুই দেশ মিলিয়ে নিখোঁজ ১ হাজার ৪০০-এর ওপর। নেপালের ৬৬৭, তিব্বতে ৫৫৮ জন। নেপালের নিখোঁজদের মধ্যে ৫৪০ জনই পর্যটক। ভারত, সুইজারল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, রাশিয়া, ইতালি, বুলগেরিয়া, মালয়েশিয়া, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়াসহ ৩১ দেশের নাগরিক। ভারতের ১৭৮, ৫৩ জন ইউক্রেনের, ৫১ জন মালয়েশিয়ার, যুক্তরাষ্ট্রের ৬৫, অস্ট্রেলিয়ার ৩৫ জন পর্যটক রয়েছেন। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। বিবিসি, আলজাজিরা, সিএনএন। সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এখনো নিখোঁজের সঠিক সংখ্যা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। রসুয়ায় আজ শুক্রবার গোসাইকুণ্ড মেলায় যোগ দিতে হাজার হাজার তীর্থযাত্রী এবং দেশি-বিদেশি পর্যটক যাওয়ায় হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
বুধবার সকালে হিমালয় অঞ্চলের একটি হিমবাহের নিচের অংশ ধসে উপত্যকায় পড়ে যায়। নেপাল সরকারের প্রাথমিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ভূমিকম্পের কারণে হিমবাহটি ধসে পড়তে পারে। তবে রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, ওই কম্পন আসলে হিমবাহের পাথর ও বরফ ধসে সৃষ্ট ভূকম্পনজনিত শক্তি ছিল। এরপর ওই এলাকায় ধ্বংসাবশেষের প্রবল স্রোত তৈরি হয়।
মার্কিন কৃত্রিম উপগ্রহ বা স্যাটেলাইট পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ‘প্ল্যানেট ল্যাবস’ চিত্রে দেখা গেছে, প্রায় ৫ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতায় একটি হিমবাহের নিচের অংশ ভেঙে প্রায় ১ হাজার ২০০ মিটার নিচে উপত্যকায় আছড়ে পড়ে। মুহূর্তেই গর্জে ওঠে পুরো জনপদ। ৩০ মিনিটের মধ্যেই বিপৎসীমা ছাড়িয়ে ৩০ ফুট উচ্চতায় পৌঁছে যায় নদীর ঢেউ। অথচ দুর্ঘটনার ১০ মিনিট আগেও তিব্বত থেকে আসা ভোটেকোশী নদী ছিল স্বাভাবিক। ১.৬২ মিটার (৫ ফুট ৪ ইঞ্চি)। ত্রিশূলী নদীর পানি ছিল ৪ থেকে ৪.৫ পর্যন্ত।
ভৌত অবকাঠামোমন্ত্রী সুনীল লামসাল জানিয়েছেন, বন্যায় অবকাঠামো খাতে প্রায় ২০০ বিলিয়ন নেপালি রুপির ক্ষতি হয়েছে। সড়ক ও সেতুর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কারণে এগুলো দ্রুত সংস্কারকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এবং সড়ক বিভাগের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় ৩৫টি কংক্রিটের সেতু এবং ৪৫টি ঝুলন্ত সেতু ভেসে গেছে।
গতকাল প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ সড়কপথে নুওয়াকোটে গিয়ে ক্ষয়ক্ষতি পরিদর্শন এবং আহত কয়েকজনের সঙ্গে দেখা করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানিয়েছে, এ সময় তিনি স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোকে দ্রুত সহায়তা দেওয়া, বন্ধ হয়ে যাওয়া সড়ক ও অবকাঠামো যত দ্রুত সম্ভব সচল এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের কাজ ত্বরান্বিত করার নির্দেশ দিয়েছেন।
এ বছরের জুনে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে জানিয়েছিলেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে চলতি শতাব্দীর শেষ নাগাদ হিন্দুকুশ হিমালয়ের হিমবাহগুলো মোট আয়তনের ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত হারাতে পারে। এতে হিমবাহ ও হ্রদের পানি গলার হার বাড়বে এবং ভয়াবহ বন্যার ঝুঁকি তৈরি হবে। একই সঙ্গে এ পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসকারী প্রায় ২৪ কোটি মানুষের জন্য পানির সংকটও বাড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ভোটেকোশী ও ত্রিশূলী অঞ্চলের এ দুর্যোগ হিমালয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তন ও বিভিন্ন সংকটের ফল। ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ববিদ রঞ্জন দাহাল একে বড় ধরনের দুর্যোগ হিসেবে উল্লেখ করে বলেছেন, উজান থেকে আসা ঢল এতটা ভয়াবহ হবে, তিনি তা কল্পনাও করেননি।
নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে ভোটেকোশীসহ বিভিন্ন নদীর অববাহিকায় নেমে আসা আকস্মিক বন্যায় প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতিতে গতকাল অনুষ্ঠিত সর্বদলীয় বৈঠকে গভীর শোক প্রকাশ করা হয়। রাজনৈতিক মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে উঠে দুর্যোগ মোকাবিলায় ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার অঙ্গীকার করেন নেতারা। সিংহ দরবারে অনুষ্ঠিত বৈঠকে রসুয়া, নুওয়াকোট, ধাদিং, গোরখা, চিতওয়ান, নওয়ালপরাসি ও অন্যান্য জেলায় বন্যার কারণে প্রাণহানি, অবকাঠামো ধ্বংস এবং পরিবেশগত সংকটে জাতীয় শোক প্রকাশ করা হয়।
যৌথ বিবৃতি দেওয়া আট দলের মধ্যে রয়েছে আরএসপি সভাপতি রবি লামিছানে, কংগ্রেস সভাপতি গগন থাপা, এনসিপি সমন্বয়ক প্রচণ্ড, ইউএমএল মহাসচিব শঙ্কর পোখরেল, শ্রম সংস্কৃতি পার্টির নেতা ধ্রুব রাই, আরপিপি সভাপতি রাজেন্দ্র লিংদেন, জেএসপি নেপালের সভাপতি উপেন্দ্র যাদব এবং জনমত পার্টির নেতা চন্দন সিং।








