গরমে ক্ষেতেই আলু সেদ্ধ হচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়ায়

গরমে বিপর্যস্ত দক্ষিণ কোরিয়ার জনজীবন। ছবি: রয়টার্স
দক্ষিণ কোরিয়া সহ সমগ্র পূর্ব এশিয়ায় এক অভূতপূর্ব ও দীর্ঘস্থায়ী চরম দাবদাহ আঘাত হেনেছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম 'দ্য গার্ডিয়ান'-এর এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, চরম উত্তাপের কারণে গঙ্গোয়ান প্রদেশের ইয়াংগু কাউন্টিসহ বিভিন্ন স্থানে মাটির নিচে থাকা আলু ক্ষেতেই সেদ্ধ হয়ে নরম ও পচে যাওয়ার মতো নজিরবিহীন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় শহর ইয়াংসানে তাপমাত্রা অতীতের সকল রেকর্ড ভেঙে ৪২.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছানোর পর কৃষি খাত ও জনজীবনে তীব্র বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে ইতোমধ্যে দেশজুড়ে অন্তত ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং প্রায় ৯ লাখ গৃহপালিত পশু ও ১৪ লাখ মাছের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে।
গবেষক ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অতি-দাবদাহের নেপথ্যে একাধিক বায়ুমণ্ডলীয় ও বৈশ্বিক জলবায়ুগত পরিবর্তনের সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে।
জলবায়ু গবেষক মোঃ বাবুল মিয়ার সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পূর্ব এশিয়ায় চলমান অস্বাভাবিক দাবদাহের পেছনে মূলত তিনটি প্রধান উপাদান অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। দক্ষিণ কোরিয়ার জনবুক ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির এই গবেষক ‘এল নিনো’ ও বায়ুমণ্ডলীয় উচ্চচাপের প্রভাবকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
বৈশ্বিক 'এল নিনো'র সক্রিয়তা
আন্তর্জাতিক জলবায়ু পূর্বাভাসের তথ্যানুযায়ী, প্রশান্ত মহাসাগরে 'এল নিনো' পর্যায় তীব্র আকার ধারণ করায় বৈশ্বিক বায়ুমণ্ডলীয় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের অস্বাভাবিক উচ্চ তাপমাত্রা পূর্ব এশিয়াজুড়ে এই দীর্ঘস্থায়ী তাপদাহ তৈরির প্রাথমিক চালিকাশক্তি।
'হিট ডোম' বা দ্বিমুখী তাপ-ঢাকনা
বায়ুমণ্ডলের ওপরের স্তরে 'তিব্বতি উচ্চচাপ' এবং নিচের স্তরে 'উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরীয় উচ্চচাপ' একসঙ্গে অবস্থান নিয়ে পুরো কোরিয়ান উপদ্বীপের ওপর একটি শক্তিশালী "হিট ডোম" বা ওভেনের মতো অবরুদ্ধ চাপ সৃষ্টি করেছে।
সমুদ্রের আর্দ্রতা ও 'ট্রপিক্যাল নাইট'
চারপাশের উষ্ণ সমুদ্র থেকে অতিরিক্ত জলীয় বাষ্প প্রবেশ করায় রাতেও তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামছে না (ট্রপিক্যাল নাইট)। উচ্চ আর্দ্রতার কারণে মানুষের শরীরে প্রকৃত তাপমাত্রার চেয়েও অনুভূতির মাত্রা বহুগুণ বেশি তীব্র হচ্ছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার শীর্ষ গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইবিএস-এর 'সেন্টার ফর ক্লাইমেট ফিজিক্স'-এর উদ্যোগে বুসান নগরীতে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ক্লাইমেট কনফারেন্সে বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানীরা কিছু সুনির্দিষ্ট তথ্য তুলে ধরেন।
তাদের মতে, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে মনসুন (বর্ষা) সিস্টেমের সংবেদনশীলতা এমনভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে যে, বর্ষা মৌসুমের মাঝেই অতি-আর্দ্র চরম দাবদাহ এবং হঠাৎ খরা তৈরি হচ্ছে।
বিশ্বব্যাপী সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে মেসো-স্কেল উচ্চচাপ বলয়গুলোর স্বাভাবিক আচরণ বদলে গেছে। ফলে প্রচলিত আবহাওয়া মডেলের মাধ্যমে এ ধরনের চরম 'হিট ডোম' ও দীর্ঘস্থায়ী ট্রপিক্যাল নাইটের নির্ভুল পূর্বাভাস দেওয়া অসম্ভব হয়ে উঠছে।
এ পরিস্থিতিতে রেস্তোরাঁ ও কিচেনে পার্ট-টাইম কর্মরত প্রবাসী শিক্ষার্থীরা এই তাপদাহে সবচেয়ে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছেন।
পরিস্থিতি মোকাবেলায় দক্ষিণ কোরিয়া সরকার জরুরি সতর্কতা জারি করে খোলা জায়গায় কাজ সাময়িকভাবে স্থগিত করা, জরুরি ত্রাণ তহবিল বরাদ্দ এবং ড্রোন ও লাউডস্পিকারের মাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রচারণা জোরদার করেছে। আবহাওয়াবিদ ও গবেষকদের মতে, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা সামলাতে এশীয় অঞ্চলগুলোর দ্রুত দীর্ঘমেয়াদী জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি।







