নুয়াকোট-রসুয়ার সীমান্তবর্তী গ্রাম বেত্রাবতী
একসময় ছিল জনপদ, এখন শুধু নদী আর লাশ

যে পথে মানুষ ফিরত আপনজনের কাছে, সে পথ চাপা পড়েছে কাদা, পলি আর ধ্বংসস্তূপে।
বন্যার পানি নেমে গেছে; কিন্তু বেত্রাবতীর বুক থেকে নামেনি শোক। যেখানে একসময় ঘর ছিল, সেখানে এখন নদী আর লাশ। যে পথে মানুষ ফিরত আপনজনের কাছে, সে পথ চাপা পড়েছে কাদা, পলি আর ধ্বংসস্তূপে। আর মৃত্যুর পরও যেন স্বস্তি নেই। প্রিয়জনের মরদেহ খুঁজে পাওয়া গেলেও তাকে ঘরে ফিরিয়ে আনা, শেষকৃত্য করা, শোকপালন— সবই হয়ে উঠেছে এক অসম্ভব লড়াই। নেপালের বেত্রাবতীতে গত ২৬ আগস্ট ভয়াবহ বন্যার পর এ ছবিই সামনে এসেছে। গতকাল রবিবার সরেজমিনে দেখা গেছে, বন্যার পর পুরো জনপদ প্রায় জনশূন্য। বহু মানুষ নিখোঁজ, বহু পরিবার ছিন্নভিন্ন। যারা বেঁচে আছেন, তারাও আশ্রয়ের খোঁজে ছড়িয়ে পড়েছেন অন্যত্র।
কাঠমান্ডুতে কাজ করেন দুই ভাই বিবাশ শ্রেষ্ঠ ও বিশ্বাস শ্রেষ্ঠ। বন্যার পরদিন তারা ছুটে এসেছিলেন বেত্রাবতীতে। তাদের ৭২ বছরের বাবা এবং ৬৫ বছরের মা ভেসে গিয়েছিলেন বন্যায়। বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ক্ষীণ জেনেও তারা খুঁজছিলেন দুজনকেই। শুক্রবার স্থানীয়রা তাদের জানিয়েছেন, বাড়ির কাছে মায়ের মরদেহ দেখা গেছে; কিন্তু সেখানেও শেষ হলো না অপেক্ষা। ঘন কাদা পথ আটকে রেখেছিল। প্রশাসনের উদ্ধারকারী দলও তখন পৌঁছায়নি। কেরাঘারি থেকে বিবাশ জানিয়েছেন, প্রায় দুই ঘণ্টায় উঁচু পথ পেরিয়ে তারা সেখানে গিয়েছিলেন। পরদিন ফের বেত্রাবতীতে গিয়ে নিজেদের হাতেই মায়ের মরদেহ উদ্ধার করেন দুই ভাই। ২৯ আগস্ট, বন্যার চতুর্থ দিনে মায়ের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। বিবাশের কথায়, তিনি এখনো কাঁদছেন, ঘুম আসছে না।
কিন্তু মাকে শেষবিদায় দেওয়ার জন্যও ছিল না আগের সেই জায়গা। যে জায়গায় তাদের বাড়ি ছিল, সেখান দিয়ে তখন নদী বয়ে যাচ্ছে। অন্যের জমিতে দাহ করতে চাননি তারা। তাই নিজেদের বাড়ির সামনেই মায়ের চিতা সাজাতে হয়। পরে নদীর পানি দিয়েই ধুয়ে দিতে হয় সেই স্থান। শোক পালনের মতো কোনো ঘরও অবশিষ্ট ছিল না। ফলে দুই ভাইকে ফিরে যেতে হয় কাঠমান্ডুতে। গতকাল সেখানেই শুরু হয় মায়ের শ্রাদ্ধের আচার। বাবার অবশ্য এখনো কোনো সন্ধান নেই। বিবাশের পরিবারই একা নয়। স্থানীয় বাসিন্দা নারায়ণ লাল দাঙ্গোল জানিয়েছেন, বহু মানুষ ভেসে গেছে। আতঙ্কে বেঁচে থাকা মানুষজনও ছড়িয়ে পড়েছে। নদীতে পড়ে থাকা মরদেহগুলো থেকে দুর্গন্ধ ছড়াতে শুরু করেছে।
বন্যার পরদিন দুপুরে স্থানীয় বাসিন্দা আশিস তামাংও উদ্ধারকাজে নেমেছিলেন। বেত্রাবতীর ঘড়িঘরের কাছে তিনি তার বৌদির মরদেহ উদ্ধার করে উঁচু জায়গায় তুলেছিলেন। কিন্তু মরদেহটি সরিয়ে নেওয়ার মতো কেউ ছিল না। পুলিশকে জানানো হলেও তারা কখন আসবে, তা নিশ্চিত ছিল না। ওই নারী ঘড়িঘরের কাছে একটি ব্যাংকের শাখায় কাজ করতেন। অন্য কর্মীরা পালাতে পারলেও তিনি পানির তোড়ে আটকে যান। পরদিন তার স্বামী নবরাজ তামাং এসে মরদেহ নিয়ে কেরাঘারিতে শেষকৃত্য করেন। স্থানীয় যোগেশ দাঙ্গোলের কথায়, এমন পরিবারও রয়েছে, যাদের প্রত্যেক সদস্যই নিখোঁজ। ফলে তাদের শেষকৃত্য করবেন কে, তাও জানা নেই। চোখের সামনে মানুষকে ভেসে যেতে দেখেছেন তিনি— সেই দৃশ্যের আতঙ্কে এখনো তার হাত পা কাঁপে।
একসময় ঘনবসতিপূর্ণ এই জনপদে দুই শতাধিক বাড়িতে হাজারের বেশি মানুষের বসবাস ছিল বলে স্থানীয়দের অনুমান। এখন সেই বসতি যেন এক পরিত্যক্ত শ্মশান। কেউ কেরাঘারি, কেউ গেরকু, কেউ জেলা সদর, কেউবা কাঠমান্ডুতে আশ্রয় নিয়েছেন।
বাসিন্দাদের অভিযোগ, বন্যার সতর্কতা তারা পেয়েছিলেন; কিন্তু বিপর্যয়ের ভয়াবহতা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দেওয়া হয়নি। বিবাশের প্রশ্ন, যদি আগে জানানো হতো, স্যাফ্রুবেশি, চিলিমে, তিমুরেসহ বেত্রাবতীও সম্পূর্ণ ভেসে যাবে, তাহলে কি এত প্রাণহানি হতো?
তৃতীয় দিনের বিকালে সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর একটি দল এলেও স্থানীয়দের অভিযোগ, তারা কোনো ত্রাণ নিয়ে আসেনি। বরং একটি কুকুর নিয়ে এলাকা ঘুরে পরে নতুন বন্যার আশঙ্কার গুজব ছড়ালে চলে যায়। আর বেত্রাবতী অপেক্ষা করে রইল সরকারের জন্য— কাদা, ধ্বংসস্তূপ ও নদীর পাশে পড়ে থাকা সেসব মরদেহের পাশে, যাদের ঘরে ফেরার পথটুকুও আর অবশিষ্ট নেই।







