জেন-জি আন্দোলনকারীদের আটক করে বিতর্কে নেপালের ‘জেন-জি সরকার’

জেন-জি আন্দোলনের কর্মী মাজিদ আনসারি, সারিসমা থাপা ও নেলসন ঘাতানিকে পুলিশ আটক করে
নেপালে সাম্প্রতিক সময়ে আন্দোলনকারী ও সরকার-সমালোচকদের বিরুদ্ধে পুলিশের ধারাবাহিক পদক্ষেপ ভিন্নমত প্রকাশের সংকুচিত পরিসর নিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। মানবাধিকারকর্মীদের অভিযোগ, শান্তিপূর্ণ সমালোচনাকে গণতান্ত্রিক অধিকার হিসেবে দেখার পরিবর্তে কর্তৃপক্ষ ক্রমেই আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করছে।
শনিবার এই বিতর্ক আরও তীব্র হয়, যখন সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বস্তিবাসীদের প্রতি সংহতি জানাতে কির্তিপুরের একটি অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে পৌঁছানোর পর জেন-জি আন্দোলনের কর্মী মাজিদ আনসারি, সারিসমা থাপা ও নেলসন ঘাতানিকে পুলিশ আটক করে। ভারী বৃষ্টিতে অনানুষ্ঠানিক বসতি থেকে সরিয়ে নেওয়া পরিবারগুলোর জন্য তৈরি অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র প্লাবিত হওয়ার পর তারা সেখানে যান। তাদের দাবি, ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ানো এবং বস্তিবাসীদের পুনর্বাসনের জন্য আরও মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই সমাধানের দাবি জানাতেই তারা সেখানে গিয়েছিলেন।
পরে পুলিশ তাকে কির্তিপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ সার্কেলে নিয়ে যায়। সেখানে উপপুলিশ সুপার শিব কুমার বুধাথোকি তার বিরুদ্ধে পুলিশের কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগ আনেন। থাপা ও ঘাতানি জানান, তাদের থানার একটি আলাদা কক্ষে রাখা হয়েছিল। পরে তিনজনকেই স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো হয়। থাপা ও ঘাতানির শরীরে দৃশ্যমান কোনো আঘাতের চিহ্ন না থাকলেও আনসারির চিকিৎসার প্রয়োজন হয় এবং পরে তাকে টিচিং হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। একই ধরনের কর্মকাণ্ডে আর জড়াবেন না মর্মে লিখিত অঙ্গীকার দেওয়ার পর থাপা ও ঘাতানিকে সেদিন সন্ধ্যাতেই ছেড়ে দেওয়া হয়।
এই ঘটনার প্রতিবাদে দেশের অন্য এলাকাতেও বিক্ষোভ হয়। শনিবার রাতে আনসারির সমর্থনে মোরাং জেলা পুলিশ কার্যালয়ের সামনে শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচি পালন করা ২৬ জনকে পুলিশ আটক করে। পুলিশ সুপার কবিত কাটাওয়াল বলেছেন, বারবার সতর্ক করার পরও তারা কার্যালয়ের প্রধান ফটক অবরোধ করে পুলিশের কাজে বাধা দেওয়ায় তাদের আটক করা হয়। পরদিন একই ধরনের কর্মসূচি আর করবেন না বলে অঙ্গীকার করার পর তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
রবিবার আরেকটি আলোচিত ঘটনার জন্ম হয়। ঝাপা থেকে ফিরে ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর আন্দোলনকারী দুর্গা প্রসাইকে পুলিশ আটক করে। পুলিশের দাবি, তিনি বিমানবন্দরের ভেতরে বিক্ষোভ করতে এবং সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলেন। কর্তৃপক্ষ বিমানবন্দরকে সংরক্ষিত নিরাপত্তা এলাকা হিসেবে বিবেচনা করে। পুলিশ সুপার পবন ভট্টরাই বললেন, জেলা নিরাপত্তা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিমানবন্দরে কোনো ধরনের বিক্ষোভ নিষিদ্ধ। পরে প্রসাইকে ভক্তপুরে তার বাসায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং পরবর্তীতে ছেড়ে দেওয়া হয়।
সাম্প্রতিক এসব ঘটনা সরকার-সমালোচকদের বিরুদ্ধে পুলিশের ধারাবাহিক পদক্ষেপের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। এপ্রিল মাসে প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহকে নিয়ে কথিত আপত্তিকর ভিডিও প্রকাশের অভিযোগে ইউটিউবার রোশন পোখরেলকে গ্রেপ্তার করা হয়। জনসমালোচনার মুখে প্রথমে তাকে ছেড়ে দেওয়া হলেও পরে একটি আদালত ইলেকট্রনিক লেনদেন আইনের অধীনে বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেয়। এ মাসের শুরুতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিশা মেহতাকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনামূলক পোস্ট দেওয়ার অভিযোগে স্বাস্থ্যকর্মী নবেশ অধিকারীকেও আটক করা হয়েছিল। পরদিন তাকে মুক্তি দেওয়া হয়।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য কপিল শ্রেষ্ঠ বললেন, সাম্প্রতিক গ্রেপ্তারগুলো মানুষের মধ্যে সরকারকে প্রশ্ন করার প্রবণতা নিরুৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে বলেই মনে হচ্ছে। তার মতে, বস্তিবাসীদের পরিস্থিতি নিয়ে সমালোচনার জবাবে সরকার মূল সমস্যার সমাধান না করে পুলিশি পদক্ষেপের পথ বেছে নিয়েছে।
মানবাধিকারকর্মী শোভাকর বুধাথোকিও বলেছেন, মতপ্রকাশ, সমাবেশ ও চলাচলের স্বাধীনতা সংবিধান স্বীকৃত অধিকার। অতিরিক্ত পুলিশি তৎপরতার মাধ্যমে কর্তৃপক্ষ নাগরিক পরিসর সংকুচিত করছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
তবে পুলিশ তাদের পদক্ষেপের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। নেপাল পুলিশের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, অভিযোগ বা বিশ্বাসযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টের তদন্ত করা হয়। উপমহাপরিদর্শক আবি নারায়ণ কাফলের দাবি, পুলিশ শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের অধিকারকে সম্মান করে এবং কেবল তখনই হস্তক্ষেপ করে, যখন কেউ সরকারি কর্মকর্তার কাজে বাধা দেয়, অস্থিরতা উসকে দেয় বা জননিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টি করে।
নেপাল পুলিশের সাবেক উপমহাপরিদর্শক হেমন্ত মাল্লা বলেছেন, শুধু সরকারকে সমালোচনা করার কারণে কাউকে গ্রেপ্তার করা কখনোই উচিত নয়। জনঅসন্তোষ বাড়তে থাকায় তিনি পুলিশ সদস্যদের সংবেদনশীল থাকার এবং কঠোরভাবে আইনের মধ্যেই দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান।





