পাঁচ বছরে স্তব্ধ আফগানিস্তানের কণ্ঠস্বর
- সাংবাদিকতার ওপর তালিবানি নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর

বর্তমানে সাংবাদিকদের নজরদারি, আটক, মারধর, সেন্সরশিপ এবং নির্বাসনে ঠেলে দেওয়ার পাশাপাশি নারী সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে বৈষম্য তীব্র আকার ধারণ করেছে।
কাবুল দখলের পাঁচ বছর পূর্তির প্রাক্কালে আফগানিস্তানের সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করল কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস। শুক্রবার নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে সাংবাদিকদের ওপর দমন পীড়ন অবিলম্বে বন্ধ করতে তালিবানের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি। সিপিজে এর বক্তব্য, গত পাঁচ বছরে শুধু সাংবাদিকদের ওপর বিচ্ছিন্নভাবে চাপ সৃষ্টিই নয় বরং স্বাধীন তথ্যপ্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ করে একটি প্রচারব্যবস্থা গড়ে তুলেছে তালিবান।
২০২১ সালের ১৫ আগস্ট কাবুল দখলের পরপরই সংবাদমাধ্যমের ওপর চাপ শুরু হয় বলে জানিয়েছে সিপিজে। সরকারি সম্প্রচার মাধ্যমে নারী সাংবাদিকদের কাজ বন্ধ করে দেওয়া, বিক্ষোভের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের মারধর এবং পরবর্তী সময়ে নির্বিচারে আটক ও কারাবাসকে সংবাদ নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার অভিযোগ রয়েছে। সিপিজে এর নথিভুক্ত প্রথম দিকের ঘটনাগুলির মধ্যে রয়েছে হেরাটের রেডিও নওরুজের সাংবাদিক ও প্রযোজক খালিদ কাদেরির মামলা। ২০২২ সালে তালিবান তার সাংবাদিকতার কাজের জন্য তাকে সাজা দেয়।
সিপিজে-এর আফগানিস্তান-পাকিস্তান প্রতিনিধি ওয়ালিউল্লাহ রহমানির কথায়, তালিবান ক্ষমতা নেওয়ার পাঁচ বছরে আফগানিস্তান সাংবাদিকদের জন্য বিশ্বের অন্যতম কঠিন দেশে পরিণত হয়েছে। সাংবাদিকদের নজরদারি, আটক, মারধর, সেন্সরশিপ এবং নির্বাসনে ঠেলে দেওয়ার পাশাপাশি নারী সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে বৈষম্য আরও তীব্র হয়েছে। ইন্টারনেট ও মোবাইল যোগাযোগে বিধিনিষেধও পরিস্থিতিকে আরও সংকটজনক করে তুলেছে।
সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়েছেন নারী সাংবাদিকরা। হেলমান্দে রেডিও ও টেলিভিশনে নারীদের কণ্ঠ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সাংবাদিকদের সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেওয়া থেকে বিরত রাখা এবং টেলিভিশনে উপস্থিতির সময় মুখ ঢাকার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তালিবান গোয়েন্দারা নারী পরিচালিত রেডিও বেগমে অভিযান চালিয়ে সেটির সম্প্রচার বন্ধ করে দেয়
এদিকে ২০২৪ সালে সেন্সরশিপ আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়। লাইভ রাজনৈতিক সম্প্রচার নিষিদ্ধ, তালিবানের সমালোচনায় বাধা এবং সাক্ষাৎকারের ক্ষেত্রে মাত্র ৬৮ জন অনুমোদিত বিশ্লেষকের তালিকা তৈরি করা হয়। লন্ডনভিত্তিক আফগানিস্তান ইন্টারন্যাশনালের সম্প্রচারেও বাধা দেওয়া হয়। একই সময়ে তাকহার প্রদেশে টেলিভিশন সম্প্রচার ও প্রকাশ্যে ছবি তোলার ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং নানগারহারে ১৪ টি সংবাদমাধ্যমের সম্প্রচার লাইসেন্স স্থগিত করা হয়। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে দেশীয় সংবাদমাধ্যমে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনুষ্ঠান সম্প্রচারও নিষিদ্ধ করা হয়।
সিপিজে-এর দাবি ২০২৫ সালের মধ্যে তালিবান প্রায় ১৫ টি বড় টেলিভিশন, রেডিও, সংবাদপত্র ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। এমন পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য, শিক্ষা কিংবা দুর্ঘটনার খবরের বাইরে অনেক বিষয়ে স্বাধীনভাবে রিপোর্ট করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। ইন্টারনেট বিচ্ছিন্নতাও তথ্যপ্রবাহে বড় আঘাত করেছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে একাধিক প্রদেশে ফাইবার-অপটিক ইন্টারনেট বন্ধ করার পর একই মাসে প্রায় ৪৮ ঘণ্টার দেশব্যাপী ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়
এই দমন পীড়ন ২০২৬ সালেও থামেনি। মে মাসে তালিবান গোয়েন্দারা টোলোনিউজ (TOLOnews) - এর দুই সাংবাদিককে আটক করার পর তাদের কার্যালয়ে অভিযান চালায়। কর্মীদের ফোন বাজেয়াপ্ত, জিজ্ঞাসাবাদ ও নজরদারির অভিযোগ ওঠে। জুনে তালিবানের আইন মন্ত্রণালয়ের সশস্ত্র সদস্যরা তামাদন টিভির সম্প্রচার বন্ধ করে কাবুলের কার্যালয় সিল করে দেয়। পরে সংশ্লিষ্ট দুই কর্মীকে আটক করা হয়। এর আগে তালিবান রাহ-এ-ফারদা টিভির নিয়ন্ত্রণও নেয়। এই পরিস্থিতিতে শত শত সাংবাদিক দেশ ছেড়ে নির্বাসনে যেতে বাধ্য হয়েছেন। প্রতিবেশী দেশগুলিতে থাকা সেই সাংবাদিকদেরও আটক করা হচ্ছে। এছাড়া নির্বাসন ও জোর করে আফগানিস্তানে ফেরত পাঠানোর আশঙ্কা রয়েছে। সিপিজে- এর দাবি, তালিবানকে অবিলম্বে সাংবাদিক নিপীড়ন বন্ধ করে স্বাধীন সংবাদমাধ্যম ও তথ্যপ্রবাহের অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে।
ভাষান্তর : রুবাইয়া জেসমিন






