পুতিন-জেলেনস্কির প্রশংসার পর ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে পরিকল্পনা জানাল ভারত

২০২৩ সালে জাপানের হিরোশিমায় জি-৭ নেতাদের শীর্ষ সম্মেলনের সময় ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি— রয়টার্স
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান ঘটাতে ভারত ‘শুধু সমর্থন জানানোতেই সীমাবদ্ধ নেই’ বলে জানিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। নয়াদিল্লির প্রস্তাবিত পরিকল্পনাকে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি প্রশংসা করার পর তিনি এ কথা বলেন।
নয়াদিল্লিতে মিউনিখ সিকিউরিটি কনফারেন্সে বক্তব্য দেওয়ার সময় জয়শঙ্কর বলেছেন, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ভারত মস্কো ও কিয়েভ— দুই পক্ষের সঙ্গেই আলোচনা করেছে। কৃষ্ণসাগরে নৌ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা থেকে শুরু করে জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধ করা পর্যন্ত বিভিন্ন প্রস্তাব নিয়ে এসব আলোচনা হয়েছে।
যুদ্ধের বিষয়ে ভারত নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রেখেছে। দেশটি লড়াই বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। তবে রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ প্রতিরক্ষা ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের কারণে মস্কোর সরাসরি সমালোচনা করতে নয়াদিল্লি অনিচ্ছুক বলে মনে হয়েছে।
গত আগস্টেও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পুতিনকে যুদ্ধ বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিরগিজস্তানে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার সম্মেলনের ফাঁকে তাদের বৈঠক হয়েছিল।
জয়শঙ্কর বলেছেন, শত্রুতা কমানোর জন্য বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ নিয়ে ভারত এখন রাশিয়া ও ইউক্রেন— দুই দেশের সঙ্গেই আলোচনা করছে।
জয়শঙ্কর রবিবার বলেছেন, ‘গত কয়েক মাসে আমরা শুধু সমর্থন জানানোর বাইরে গিয়ে আরও কিছুটা সক্রিয়ভাবে যুক্ত হয়েছি।’
তিনি বলেছেন, কৃষ্ণসাগরে নৌ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা শুরুর পর তা শস্য ও জ্বালানি রপ্তানি এবং সম্ভাব্য ‘হামলা না চালানোর’ ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনায় বিস্তৃত হয়েছে।
জয়শঙ্কর যুদ্ধটিকে ‘দুর্ভাগ্যজনক সংঘাত’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেছেন, ভারতের অবস্থান ‘খুবই স্পষ্ট— আমরা এই সংঘাতের অবসান দেখতে চাই।’
ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা রবিবার চারটি পৃথক যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব বিবেচনা করার কথা জানানোর পর জয়শঙ্করের এই মন্তব্য এলো। তিনি ভারতের প্রস্তাবকে ‘সবচেয়ে বিস্তৃত’ বলে বর্ণনা করেন।
কিয়েভে সাংবাদিকদের সিবিহা বললেন, ‘আমাদের চারটি প্রস্তাব রয়েছে। সবচেয়ে বিস্তৃত হলো ভারতের প্রস্তাব।’ তিনি বলেছেন, সংঘাতের অবসানে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালনের আগ্রহ প্রথমবারের মতো জানিয়েছে ভারত।
অন্য তিনটি উদ্যোগ এসেছে তুরস্ক, মিসর ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে। তুরস্ক ও মিসর ইউক্রেনের শস্য রপ্তানি সহজ করতে কৃষ্ণসাগরে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়েছে। আর ওয়াশিংটন জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধে একটি চুক্তির জন্য চাপ দিচ্ছে।
কিয়েভ জানিয়েছে, তারা জ্বালানি ও কৃষ্ণসাগরে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব বিবেচনা করতে প্রস্তুত। তবে তাদের দাবি, দুটি বিষয়কে একসঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
সিবিহা বললেন, ‘আমরা জ্বালানি ও কৃষ্ণসাগরে যুদ্ধবিরতির জন্য প্রস্তুত। তবে শুধু এই দুই বিষয়কে একসঙ্গে নিয়ে।’
তিনি আরও বলেছেন, এ ধরনের চুক্তির জন্য জ্বালানি স্থাপনা, বন্দর অবকাঠামোসহ সব ধরনের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে।
গত মাসে জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠকের পর জেলেনস্কি বলেছেন, তারা কৃষ্ণসাগরের পরিস্থিতিসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি ‘অন্যায্য যুদ্ধ’ হিসেবে বর্ণনা করা এই সংঘাতের অবসানে দিল্লির আগ্রহের জন্য ভারতকে ধন্যবাদ জানান।
অন্যদিকে পুতিন ‘শান্তিপূর্ণ উপায়ে এবং যত দ্রুত সম্ভব এই সংঘাতের অবসান ঘটানোর আগ্রহের’ জন্য মোদিকে ধন্যবাদ জানান। ভালদাই ডিসকাশন ক্লাবের পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক এক বক্তব্যে রুশ নেতা বললেন, ‘পারস্পরিকভাবে গ্রহণযোগ্য সমাধান খুঁজে বের করার বিষয়ে তার গভীর আগ্রহ এবং খুব ভালো কিছু ধারণা রয়েছে।’
তিনি বললেন, ‘সে অর্থে প্রধানমন্ত্রী স্বাভাবিকভাবেই নিরপেক্ষ অবস্থান নিয়েছেন, তবে সংঘাতের অবসানের বিষয়ে তার আগ্রহ রয়েছে।’
আগস্টের শেষ দিকে পুতিনের সঙ্গে বৈঠকে মোদি মানবতার স্বার্থে ‘অন্তহীন যুদ্ধ’ থেকে ‘যুদ্ধের সমাপ্তির’ দিকে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
২০২৪ সালে মস্কোয় এক বৈঠকে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী রুশ প্রেসিডেন্টকে বলেছিলেন, ‘বোমা, বন্দুক ও গুলির মধ্যে শান্তি আলোচনা সফল হয় না।’ তিনি আরও বলেছিলেন, ‘যুদ্ধক্ষেত্রে কোনো সমাধান খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়।’
যুদ্ধের কারণে ভারত সরাসরি ও পরোক্ষ— দুভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এপ্রিল থেকে কৃষ্ণসাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলায় অন্তত পাঁচ ভারতীয় নাবিক নিহত হয়েছেন। এর জবাবে দিল্লি উভয়পক্ষের কাছেই জোরালো প্রতিবাদ জানিয়েছে এবং ওই অঞ্চলের ‘অত্যন্ত অস্থিতিশীল’ পরিস্থিতি সম্পর্কে নাবিকদের সতর্ক করে পরামর্শ জারি করেছে।
একই সময়ে রাশিয়ার কাছ থেকে কম দামে অপরিশোধিত তেল কেনা বন্ধ করতে যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে পড়েছে ভারত। চীনের পর ভারতই রুশ জ্বালানির দ্বিতীয় বৃহত্তম ক্রেতা। রুশ তেল কেনা অব্যাহত রাখলে যুক্তরাষ্ট্র ভারতীয় পণ্যের ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকিও দিয়েছে।
পশ্চিমা চাপ সত্ত্বেও ২০২২ সালে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে দিল্লি দুবার পুতিনকে আতিথ্য দিয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে রাষ্ট্রীয় সফরে এবং ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে ব্রিকস সম্মেলনে তিনি ভারত সফর করেন।
ভারত রোম সংবিধির স্বাক্ষরকারী দেশ নয়। তাই ইউক্রেনে কথিত যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) পুতিনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করলেও তাকে গ্রেপ্তার করার আইনি বাধ্যবাধকতা ভারতের নেই।
সূত্র: দ্য ইনডিপেনডেন্ট





