৪০ বছরের ধারায় বদলের ইঙ্গিত, মানুষের হাতে অর্থনীতি চান বার্নহ্যাম
- ‘আশাই নতুন ব্রিটেনের শক্তি’, প্রথম কমন্স ভাষণে বার্তা প্রধানমন্ত্রীর
- পানি-বিদ্যুৎ-পরিবহনে বাড়বে সরকারি নিয়ন্ত্রণ, ক্ষমতা যাবে অঞ্চলগুলোর হাতে

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। ছবি: বিবিসি
ব্রিটেনের অর্থনীতিতে গত ৪০ বছরের ধারায় পরিবর্তন আনতে চান নতুন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। তার পরিকল্পনায় পানি, বিদ্যুৎ ও পরিবহনের মতো মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত পরিষেবায় সরকারি নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো এবং লন্ডনকেন্দ্রিক ক্ষমতার কাঠামো বদলে অঞ্চলগুলোর হাতে আরও ক্ষমতা তুলে দেওয়ার বিষয়টি পেয়েছে গুরুত্ব।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) স্থানীয় সময় দুপুরে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ হাউস অব কমন্সে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথম ভাষণে বার্নহ্যাম বলেছেন, ব্রিটেনের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ তার রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রে রয়েছে। দেশের প্রতিটি অঞ্চলে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করা এবং মানুষের মধ্যে ‘ইতিবাচক ভবিষ্যতের অনুভূতি’ ফিরিয়ে আনাকে সরকারের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরেন তিনি।
সোমবার (৩১ আগস্ট) প্রকাশিত দ্য গার্ডিয়ান ও বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বার্নহ্যামের অর্থনৈতিক পরিকল্পনার মূল ভিত্তি দুটি। এর একটি হলো পানি, জ্বালানি ও পরিবহনের মতো গুরুত্বপূর্ণ পরিষেবায় সরকারি নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো। অন্যটি হলো ওয়েস্টমিনস্টার ও হোয়াইটহলকেন্দ্রিক ক্ষমতার কাঠামো বদলে স্থানীয় সরকার ও আঞ্চলিক নেতৃত্বের হাতে আরও ক্ষমতা দেওয়া।
‘জনতার অর্থনীতি’ গড়ার স্বপ্ন
বার্নহ্যামের যুক্তি, বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত অনেক অপরিহার্য পরিষেবার খরচ বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। এতে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সবার কাছে পৌঁছাচ্ছে না।
তার মতে, শুধু বড় কোম্পানির মুনাফা বাড়লেই অর্থনীতি শক্তিশালী হয় না। মানুষের আয় বাড়ানো, জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং প্রয়োজনীয় পরিষেবার মান উন্নত করাই প্রকৃত অর্থনৈতিক অগ্রগতি।
পানি খাতে সরকারি ভূমিকা বাড়ানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় পরীক্ষার জায়গা হতে পারে থেমস ওয়াটার। বিপুল ঋণের চাপে থাকা এই পানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে সংকটে রয়েছে। প্রয়োজন হলে গুরুত্বপূর্ণ পরিষেবাগুলোতে সরকারি নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর পথে হাঁটতে পারে সরকার।
জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতেও বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সরকারের ভূমিকা বাড়াতে চান বার্নহ্যাম। তার বক্তব্য, মানুষের মৌলিক প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত পরিষেবাগুলো শুধু মুনাফার হিসাব দিয়ে পরিচালিত হতে পারে না।
পরিবহন খাতেও নতুন মডেল চালুর পরিকল্পনা রয়েছে তার। গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র থাকাকালে আঞ্চলিক বাস পরিষেবায় সরকারি নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছিলেন বার্নহ্যাম। এবার সেই অভিজ্ঞতা জাতীয় পর্যায়ে কাজে লাগাতে চান তিনি।
লন্ডন থেকে ক্ষমতা যাবে অঞ্চলে
ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ম্যানচেস্টারে ‘নম্বর ১০ নর্থ’ নামে একটি নতুন সরকারি কেন্দ্র তৈরি করা হচ্ছে। লন্ডনের ১০ ডাউনিং স্ট্রিটের আদলে তৈরি এই কেন্দ্র দেশের উত্তরাঞ্চল থেকে সরকারের কার্যক্রম পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বার্নহ্যামের যুক্তি, ব্রিটেনের অর্থনৈতিক উন্নয়ন শুধু লন্ডন থেকে নির্দেশ দিয়ে সম্ভব নয়। প্রতিটি অঞ্চলের নিজস্ব শক্তিকে কাজে লাগাতে হবে। স্থানীয় মানুষ ও আঞ্চলিক নেতৃত্বকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দিলে নতুন শিল্প, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করেন তিনি।
প্রথম কমন্স ভাষণেও দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ তৈরির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন বার্নহ্যাম। তার রাজনৈতিক বার্তার কেন্দ্রে রয়েছে ব্রিটেনের মানুষকে আবারও বিশ্বাস করানো যে পরিবর্তন সম্ভব। তার মতে, দীর্ঘদিন ধরে দেশের অনেক অঞ্চল নিজেদের পিছিয়ে পড়া মনে করেছে। অর্থনৈতিক বৈষম্য কমিয়ে প্রতিটি এলাকায় উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করাই হবে সরকারের অন্যতম লক্ষ্য।
বিরোধীদের প্রশ্ন, অর্থ আসবে কোথা থেকে?
বার্নহ্যামের পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্নও উঠেছে। বিরোধীদের অভিযোগ, সরকারি নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হবে। পানি, জ্বালানি ও পরিবহনের মতো বড় খাতে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের ব্যয় শেষ পর্যন্ত করদাতাদের ওপর চাপ ফেলতে পারে।
সমালোচকদের প্রশ্ন, শুধু মালিকানা বা নিয়ন্ত্রণের ধরন বদলালেই কি পরিষেবার মান উন্নত হবে? সরকারি ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে সমস্যা আরও বাড়তে পারে।
অন্যদিকে বার্নহ্যামের সমর্থকদের দাবি, বহু বছর ধরে চলা বেসরকারিকরণের পর এখন মানুষের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সময় এসেছে।
তবে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে বার্নহ্যামের সামনে। সরকারি অর্থের সীমাবদ্ধতা, প্রতিরক্ষা ব্যয়, দুর্বল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং বিরোধীদের চাপ সামলে তার প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবে রূপ দিতে হবে।
ব্রিটিশ ভোটারদের কাছে এখন শুধু নতুন স্লোগান নয়, বাস্তব পরিবর্তনই গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যুৎ বিল কমছে কি না, পরিবহন সহজ হচ্ছে কি না এবং জীবনযাত্রার ব্যয় কমছে কি না, সেদিকেই থাকবে নজর।







