বিবাহবিচ্ছেদ নিয়ে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ভারতীয় বংশোদ্ভূত নারী জিতলেন ৮৫ কোটি রুপি

ফৌজদারি মামলার তদন্তে কয়েক কোটি পাউন্ড মূল্যের এমন সম্পদ উন্মোচিত হয়েছে, যা এর আগে কখনো সামনে আসেনি
টাকা আর ক্ষমতা থাকলে আইনকে ফাঁকি দেওয়া যায়— এমনটাই হয়তো ভেবেছিলেন ব্রিটেনের নামী আইনজীবী ভদ্রেশ গোহিল। কিন্তু তিনি হয়তো ভুলে গিয়েছিলেন যে, ‘আইনের হাত অনেক লম্বা’ আর একজন প্রতারিত নারীর ধৈর্যের কাছে যেকোনো কূটবুদ্ধি হার মানতে বাধ্য। দীর্ঘ ২৩ বছরের এক অবিশ্বাস্য ও ক্লান্তিহীন আইনি লড়াই শেষে নিজের অধিকার ছিনিয়ে নিলেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নারী বর্ষা গোহিল। ডিভোর্সের সময় স্বামীর লুকিয়ে ফেলা কোটি কোটি টাকার সম্পদ থেকে অবশেষে প্রায় ৬৬ লাখ পাউন্ড আদায়ের ঐতিহাসিক রায় পেলেন তিনি। যুক্তরাজ্যের আইনি ইতিহাসে একে অন্যতম দীর্ঘ ও স্মরণীয় ডিভোর্স যুদ্ধ বলা হচ্ছে।
ঘটনার সূত্রপাত আজ থেকে ২৪ বছর আগে, ২০০২ সালে। স্বামী ভদ্রেশ গোহিলের পরকীয়া আর অমানুষিক আচরণে অতিষ্ঠ হয়ে যুক্তরাজ্যের আদালতে ডিভোর্সের মামলা করেন তিন সন্তানের মা বর্ষা গোহিল। সেই সময় ভদ্রেশ চালাকি করে আদালতকে জানান যে তার কাছে খুব বেশি টাকা নেই। সন্তানদের মুখের দিকে চেয়ে বর্ষা তখন প্রায় ৩.৫ কোটি টাকা নগদ এবং পরিবারের ব্যবহৃত একটি পুরোনো ‘পিউজো’ গাড়ি নিয়ে ডিভোর্সের পেপারে সই করে দেন। আপাতদৃষ্টে মামলা মিটে গেলেও বর্ষার মনে একটা খটকা সবসময়ই ছিল— তার স্বামী নিশ্চয়ই কোনো বড় সম্পত্তি লুকিয়ে রাখছেন।
দীর্ঘদিন ধরে বর্ষার কাছে সন্দেহের কোনো প্রমাণ ছিল না। কিন্তু কথায় বলে, ‘পাপ কখনো চাপা থাকে না’। ২০১১ সালে নাইজেরিয়ার এক দুর্নীতিবাজ গভর্নরের সাথে আন্তর্জাতিক অর্থপাচার, জালিয়াতি ও জালিয়াতির ষড়যন্ত্রে জড়িয়ে পড়েন ভদ্রেশ গোহিল। তদন্তে নেমে ব্রিটিশ গোয়েন্দারা চোখ কপালে তোলেন! দেখা যায়, অফশোর কোম্পানি খুলে ভদ্রেশ কোটি কোটি পাউন্ড বিদেশে পাচার করেছেন। জালিয়াতির অপরাধে ২০১১ সালে আদালতের রায়ে ভদ্রেশের ১০ বছরের জেল হয়।
ঠিক এই জায়গাতেই ভাগ্য বদলে যায় বর্ষার। ভদ্রেশের এই অপরাধের তদন্ত করতে গিয়েই পুলিশ তার এমন প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ পাউন্ডের বেনামী ও গোপন সম্পত্তির খোঁজ পায়, যা তিনি ডিভোর্সের সময় আদালতের কাছে লুকিয়েছিলেন।
স্বামীর এই বিপুল সম্পত্তির খোঁজ পেয়েই নতুন করে ডিভোর্সের আর্থিক চুক্তির বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দেন বর্ষা। মামলাটি ২০১৫ সালে যুক্তরাজ্যের সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়ায়। সুপ্রিম কোর্ট এক ঐতিহাসিক রায়ে বলে—‘কোনো ব্যক্তি যদি ডিভোর্সের সময় নিজের সম্পদের মিথ্যা হিসাব দেয়, তবে সেই মিথ্যার সুবিধা বা আইনি ঢাল তাকে কখনোই দেওয়া হবে না।’
এরপরেও লড়াই সহজ ছিল না। একদিকে ব্রিটিশ সরকার দাবি করছিল এই টাকা যেহেতু অপরাধের মাধ্যমে অর্জিত, তাই তা রাষ্ট্র বাজেয়াপ্ত করবে। অন্যদিকে বর্ষা বুক চিতিয়ে লড়াই করে প্রমাণ করেন যে, এর একটি বড় অংশ তার স্বামী বিয়ের পর সৎ ব্যবসার মাধ্যমে কামিয়েছিলেন, তাই স্ত্রী ও সন্তানদের এই টাকার ওপর প্রথম অধিকার রয়েছে।
সব দিক বিবেচনা করে যুক্তরাজ্যের হাইকোর্টের জাজ জাস্টিস উইলিয়ামস চূড়ান্ত রায়ে ভদ্রেশ গোহিলকে তীব্র ভর্ৎসনা করে বলেছেন, ‘অসততার দিক থেকে এই স্বামী সমস্ত সীমা পার করে গেছেন। তিনি আদ্যোপান্ত একজন মিথ্যাবাদী।’
আদালত ভদ্রেশের গোপন সম্পত্তি থেকে সম্পূর্ণ ‘নিষ্কলঙ্ক ও বৈধ’ ৬৬ লাখ পাউন্ড সরাসরি বর্ষা গোহিলকে দেওয়ার নির্দেশ দেয়। গত মাসে দেশের সর্বোচ্চ আদালত এই রায়ের বিরুদ্ধে আর কোনো আপিল করা যাবে না বলে সিলমোহর দেওয়ায় অবসান ঘটল দীর্ঘ ২৩ বছরের এই টানটান আইনি নাটকের।
এই রায় বিশ্বজুড়ে সেইসব নারীদের জন্য এক মস্ত বড় অনুপ্রেরণা, যারা ডিভোর্সের পর স্বামীদের চাতুরির কারণে নিজেদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হন। সত্যের জয় একটু দেরিতে হলেও যে নিশ্চিত, বর্ষা গোহিলের এই ৮৫ কোটি রুপির লড়াই তারই এক জীবন্ত প্রমাণ!






