জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে বিশ্বজুড়ে বিক্ষোভ
- দায়ী করা হচ্ছে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধকেই

ঢাকার একটি পেট্রলপাম্পে ডিজেল কেনার অপেক্ষায় মানুষ। ছবি: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছে বিক্ষোভ। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সরবরাহে সংকট তৈরি হওয়া এবং দাম বেড়ে যাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করছেন সাধারণ মানুষ। তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার পর বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভ, ধর্মঘট ও সড়ক অবরোধের ঘটনাও ঘটেছে।
নিউইয়র্ক টাইমসের ১৫ সেপ্টেম্বরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গুয়াতেমালা, সিরিয়া, পর্তুগাল, ফিলিপাইন, শ্রীলঙ্কা, ইন্দোনেশিয়া ও বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে করা হয়েছে বিক্ষোভ। গুয়াতেমালা ও সিরিয়ায় বিক্ষোভকারীরা টায়ার ও গাড়িতে আগুন দিয়েছেন।
পর্তুগালে ডিজেলের দাম গ্যালনপ্রতি ৯ ডলার ছাড়িয়ে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছানোর প্রতিবাদে চালকেরা রাস্তায় গাড়ির দীর্ঘ সারি তৈরি করে অনবরত হর্ন বাজিয়েছেন।
বিশেষ করে এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলো, যারা মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল, যুদ্ধের প্রভাবে পরিবহন ব্যবস্থা ও অর্থনীতিতে চরম চাপের মুখে পড়েছে। জ্বালানি সংকট, পাম্পে দীর্ঘ লাইন এবং বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্নের কারণে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড মন্থর হয়ে পড়ছে। পাশাপাশি জ্বালানির খরচ বেড়ে যাওয়ায় ধর্মঘট করছেন ট্যাক্সিচালক ও শ্রমিকেরা।
অনেক দেশই এখন কঠিন এক প্রশ্নের মুখোমুখি। মূল্যবৃদ্ধির বোঝা জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া কি বেশি ঝুঁকিপূর্ণ, নাকি ভর্তুকি ও সহায়তা বাড়ানো উচিত?
অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির প্রভাষক ও এশিয়ায় সংঘাত ও রাষ্ট্রগঠনবিষয়ক গবেষক সানা জাফরি বলেন, ‘এই ভূরাজনৈতিক সংকট সামাল দেওয়ার মতো কতটা আর্থিক সক্ষমতা এশিয়া বা সামগ্রিকভাবে উন্নয়নশীল বিশ্বের রয়েছে? সেই সক্ষমতা যখন ফুরিয়ে আসতে শুরু করবে, তখন বিশ্ব আর্থিক বাজারের কী হবে?’
তিনি আরও বলেন, ‘একটা পর্যায়ে গিয়ে এটি সবার সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে।’
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে ইন্দোনেশিয়ার পরিস্থিতিও তুলে ধরা হয়েছে। দক্ষিণ সুলাওয়েসির মাকাসার শহরের বাসিন্দারা রান্নার গ্যাসের ঘাটতি, পর্যায়ক্রমিক বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং পেট্রোল রেশনিং বা সীমিতকরণের কথা জানিয়েছেন।
দেশটির রাজধানীজুড়ে চালকদের খালি ট্যাঙ্কের মোটরসাইকেল ঠেলে নিয়ে যেতে দেখা গেছে। কেউ কেউ জ্বালানি শেষ হয়ে যাওয়া পাম্পের কাছে গাড়ি রেখে দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করছেন। সোমবার ট্যাক্সিচালকেরা লাইসেন্স প্লেটের জোড়-বিজোড় নম্বরের ভিত্তিতে নতুন রেশনিং ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেন। একই দিন শিক্ষার্থীরা জ্বালানির আকাশচুম্বী দামের প্রতিবাদে সমাবেশ করলেও সরকারপন্থী উগ্র সংগঠনগুলো তা পণ্ড করে দেয়।
ফিলিপাইনের ম্যানিলা উপসাগরীয় অঞ্চলের জেলেরা কয়েক সপ্তাহের মৌসুমি বৃষ্টির পর সমুদ্রে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। কিন্তু ডিজেল ও গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ায় তাদের বড় একটি অংশ এখনো বন্দরে অবস্থান করছেন।
গুয়াতেমালা সিটির রাস্তায় পরিবহন শ্রমিক ও আদিবাসী অধিকারকর্মীরা মিছিল করেছেন। শুধু মূল্যসীমা নির্ধারণ বা ভর্তুকির মতো সাময়িক পদক্ষেপ নয়, আরও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের দাবি জানিয়েছেন তারা।
বাংলাদেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটি তার ব্যবহৃত পেট্রোলিয়ামের ৯০ শতাংশেরও বেশি আমদানি করে। এর সিংহভাগই আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ঘাটতির কারণে বাংলাদেশে রেশনিং ব্যবস্থা চালু করতে হয়েছে। দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে পরিচিত পোশাক কারখানাগুলোও সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে ইরানকেন্দ্রিক সংঘাত শুরুর পর অনেকে বিকল্প হিসেবে ডিজেলের দিকে ঝুঁকলেও এখন সেই জ্বালানির দামও বেড়ে চলেছে।
বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের কেন্দ্রস্থল গাজীপুরের একটি কারখানার কর্মকর্তা রবিউল হাসান মেহেদি মঙ্গলবার জানান, এখন দিনে চার থেকে পাঁচবার বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটছে।
কয়েক ঘণ্টা ধরে কাজ বন্ধ থাকা, যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অসংখ্য কারখানা ও হাজার হাজার শ্রমিকের কর্মবিরতি, এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপি নেতা নাহিদ ইসলাম ঢাকায় আয়োজিত এক প্রতিবাদ সমাবেশে বলেন, ‘মানুষের এই মিছিল মূলত তাদের বিরুদ্ধে, যারা গ্যাস, তেল ও বিদ্যুৎ নিয়ে সিন্ডিকেট গড়ে তুলছে এবং দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা করছে।’




