যুক্তরাষ্ট্রের দূতদের সঙ্গে বৈঠকের পর জেলেনস্কি, শীতেও চলতে পারে যুদ্ধ

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। ছবি: সংগৃহীত
রাশিয়ার সঙ্গে ইউক্রেনের যুদ্ধ শীতকালেও চলতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। রবিবার কিয়েভে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের পর এ কথা বলেন তিনি। তবে বৈঠক শেষে যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে কোনো বড় অগ্রগতির ঘোষণা দেননি জেলেনস্কি বা যুক্তরাষ্ট্রের দূত স্টিভ উইটকফ।
রবিবার কিয়েভে পৌঁছান উইটকফ ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার। এর এক দিন আগে মস্কোয় রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করেন তারা। ইউক্রেনের রাজধানীতে এটি ছিল তাদের প্রথম সফর। চার বছরের বেশি সময় ধরে রুশ হামলায় কিয়েভে প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে।
জেলেনস্কি বলেন, ‘আমরা খুবই আশা করছি যে আমাদের যুক্তরাষ্ট্রের অংশীদারদের সঙ্গে আমরা সমঝোতায় পৌঁছাতে পারব। যুদ্ধ যদি শীতকালেও চলতে থাকে, তাহলে আমরা আমাদের ইউরোপীয় অংশীদারদের সমর্থনের ওপর নির্ভর করছি। এই মুহূর্তে পরিস্থিতি সেদিকেই যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।’
জেলেনস্কি আরও জানান, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও জার্মানির সঙ্গে ইউক্রেন আলোচনা করবে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলেননি তিনি। এর আগে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে বৈঠকের আহ্বান জানিয়েছিলেন জেলেনস্কি। এবারও তিনি বলেন, ভূখণ্ড নিয়ে বিরোধের সমাধান করতে হলে দুই দেশের নেতাদের সরাসরি বৈঠক প্রয়োজন।
রাশিয়া ইউক্রেনের পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে রেখেছে। শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে ক্রেমলিন জানায়, ইউক্রেনে আরও অগ্রসর হওয়ার বিষয়ে তারা আত্মবিশ্বাসী। মস্কো শুধু দখল করা অঞ্চল নয়, রাশিয়া নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করা এলাকাগুলোর স্বীকৃতিও চায়। কিয়েভের কাছে এসব শর্ত গ্রহণযোগ্য নয়।
উইটকফ বলেন, যুদ্ধের অবসান ঘটাতে উভয় পক্ষকেই সমঝোতা করতে হবে। তিনি বলেন, ‘আমরা মনে করি, সেখানে পৌঁছানোর জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান আমাদের হাতে রয়েছে। আমরা অত্যন্ত অর্থবহ, গুরুত্বপূর্ণ ও বাস্তবভিত্তিক আলোচনা করেছি। আমরা খুবই উৎসাহিত। যত দিন প্রয়োজন, তত দিন এই আলোচনা চালিয়ে যেতে আমরা আগ্রহী।’
কুশনার বলেন, ‘আশা করি, এই সফর থেকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার নতুন কিছু পথ বের হয়েছে। আমি মনে করি, এই সফর থেকে আমরা অনেক কিছু শিখেছি।’
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে ভয়াবহ এই সংঘাতে শান্তি ফেরাতে ট্রাম্প প্রশাসনের উদ্যোগ পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যেই উইটকফ ও কুশনারের এ সফর। গ্রীষ্মজুড়ে যুদ্ধ আরও তীব্র হওয়ার পর তারা আলোচনার উদ্যোগ নিয়ে ইউক্রেন ও রাশিয়া সফর করছেন।
কিয়েভে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানির প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে আরেক দফা আলোচনা চলছিল। ইউরোপীয় প্রতিনিধিদের উপস্থিতির জন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়ে জেলেনস্কি বলেন, ‘এখানে আমরা সবাই একই পক্ষে আছি।’
অন্যান্য বিদেশি কর্মকর্তাদের মতো যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরাও ট্রেনে করে কিয়েভে পৌঁছান। কিয়েভের কেন্দ্রীয় রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে তাদের স্বাগত জানাতে ‘শান্তি এক্সপ্রেস’ লেখা ছিল।
জেলেনস্কি জানান, কিয়েভের বিমানবন্দরগুলো সচল করার জন্য সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। তবে রুশ হামলার কারণে উড়োজাহাজে সেখানে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। ২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকেই দেশটির আকাশসীমা বন্ধ রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের দূতদের সফরের সময় রাশিয়া ও ইউক্রেন একে অপরের রাজধানীতে হামলা না চালানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তবে অন্য এলাকায় লড়াই অব্যাহত ছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, মস্কোয় বৈঠকের সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা ‘যুদ্ধের অবসানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কিছু পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেছেন, যা আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে প্রকাশ করা হবে।’
ক্রেমলিন বিস্তারিত কিছু না জানিয়ে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা ‘সমঝোতায় পৌঁছানোর সম্ভাব্য পথ নিয়ে কয়েকটি ধারণা তুলে ধরেছেন।’
পুতিন বারবার বলেছেন, ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলের বাকি অংশও দখল করার পরিকল্পনা রয়েছে রাশিয়ার। চলতি গ্রীষ্মে দেশটি ইউক্রেনে প্রাণঘাতী হামলাও বাড়িয়েছে। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে পুতিনের নির্দেশে ইউক্রেনে অভিযান শুরুর পর চার বছরের বেশি সময় ধরে যুদ্ধ চলছে। এখনো এর সমাপ্তির কোনো স্পষ্ট সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।
শনিবার পুতিন যুক্তরাষ্ট্রের দূতদের আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, কিয়েভে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে মস্কো। এর আগে ট্রাম্প বলেছিলেন, তার দূতেরা যুদ্ধ বন্ধের জন্য একটি ‘প্রস্তাব’ নিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘শান্তির জন্য আমাদের একটি ধারণা আছে।’ তবে এর বিস্তারিত জানাননি তিনি।
রাজধানীগুলোতে হামলা না চালানোর প্রতিশ্রুতি থাকলেও ইউক্রেনের অন্যান্য এলাকায় যুদ্ধ চলেছে। ইউক্রেনের বিমানবাহিনী জানিয়েছে, রাতভর রাশিয়া ১০৮টি চালকবিহীন উড়োজাহাজ ও ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে রাশিয়া দাবি করেছে, তারা ইউক্রেনের ২৫৮টি চালকবিহীন উড়োজাহাজ ভূপাতিত করেছে।
ইউক্রেন জানিয়েছে, শনিবার রুশ হামলায় ১১ বছর বয়সী এক শিশুসহ ১০ জন নিহত হয়েছেন। রাশিয়ার ২০২২ সালের আগ্রাসনে এখন পর্যন্ত কয়েক লাখ মানুষ নিহত এবং লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।






