আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতে ইন্দোনেশিয়ায় আটকা ১ লাখ ৭০ হাজার যাত্রী

আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের কারণে বন্ধ রয়েছে ইন্দোনেশিয়ার প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ আটটি বিমানবন্দরের কার্যক্রম। ছবি: এএফপি
আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের কারণে ইন্দোনেশিয়ার প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ আটটি বিমানবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আটকা পড়েছেন প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার যাত্রী। রবিবার পর্যন্ত এসব বিমানবন্দরে ১ হাজার ৫৫৮টি উড়োজাহাজের যাত্রা বিলম্বিত হয়েছে। এর মধ্যে ৯০০টির বেশি উড়োজাহাজের ওঠানামা ছিল সোয়েকার্নো-হাত্তা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে ঘিরে।
শনিবার ইন্দোনেশিয়ার আনাক ক্রাকাতোয়া আগ্নেয়গিরিতে অগ্ন্যুৎপাত শুরু হয়। এ সময় আগ্নেয়গিরি থেকে লাভা ছিটকে ওঠে এবং বিকট শব্দ সৃষ্টি হয়। ভূতত্ত্ব সংস্থা জানিয়েছে, কয়েক শ কিলোমিটার দূর থেকেও শোনা গেছে এসব শব্দ। রবিবার আরও দুটি অগ্ন্যুৎপাতের ঘটনা ঘটেছে বলে সতর্ক করে আগ্নেয়গিরিবিদ্যা সংস্থা।
আগ্নেয়গিরির ছাই সোয়েকার্নো-হাত্তা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ঘিরে আকাশসীমায় ছড়িয়ে পড়ায় বিমানবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ। আনাক ক্রাকাতোয়ার অগ্ন্যুৎপাতের তীব্রতা বাড়তে থাকায় সোমবার সকাল ৮টা ৫৯ মিনিট পর্যন্ত এই স্থগিতাদেশ বাড়ানো হয়েছে বলে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
একই সময় আরও সাতটি বিমানবন্দরের কার্যক্রমও সোমবার সকাল ৮টা ৫৯ মিনিট পর্যন্ত বন্ধ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে জাভা দ্বীপের বান্দুংয়ের হুসেইন সাস্ত্রানেগারা বিমানবন্দর এবং সুমাত্রার বান্দার লামপুংয়ের কাছে রাদিন ইন্তেন দ্বিতীয় বিমানবন্দর রয়েছে।
দেশটির পরিবহন মন্ত্রী দুডি পুরওয়াগান্ধি জানান, বিকল্প হিসেবে সেমারাং ও সুরাবায়াসহ কয়েকটি শহরের বিমানবন্দর প্রস্তুত রাখা হয়েছে। তবে বিমান চলাচল বন্ধ থাকায় অনেক যাত্রীকে বিকল্প উড়োজাহাজের সন্ধানে ছুটতে হচ্ছে।
৪৪ বছরের হেনি ইয়েনসান তার মায়ের সঙ্গে নিজ শহরে ফেরার পরিকল্পনা করেছিলেন। বিমান চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তার উড়োজাহাজের যাত্রা মঙ্গলবার পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘সবাই হতাশ হয়েছে। তবে এটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে হওয়ায় কেউ ক্ষোভে ফেটে পড়েনি।’
শুক্রবার থেকে লম্বক দ্বীপে ব্যবসায়িক কাজে থাকা দানোনের কর্মকর্তা স্যামুয়েল গিবার্তো রাজধানীতে ফেরার জন্য বিকল্প উড়োজাহাজ খুঁজছিলেন। ৪৭ বছরের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘এই মুহূর্তে কিছুই নিশ্চিত নয়।’ তিনি জানান, সিটিলিংকের একটি বিকল্প উড়োজাহাজ পেয়েছিলেন তিনি, কিন্তু সেটিও বাতিল হয়ে যায়। আপাতত লম্বকেই থেকে যাওয়া ছাড়া তার আর কোনো উপায় নেই।
দক্ষিণ সুমাত্রার বান্দার লামপুং শহরেও পৌঁছেছে আগ্নেয়গিরির ছাই। সেই ছাইয়ে পার্ক করে রাখা গাড়ি ও সড়কের পাশের বিভিন্ন এলাকা ঢেকে গেছে।
২৫ বছরের আন্দ্রে বায়ু সাপুত্রা বলেন, ‘আমি উদ্বিগ্ন। এটি ফুসফুসে মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে এবং ফুসফুসে সংক্রমণ ঘটাতে পারে।’
এদিকে আগ্নেয়গিরির ছাই ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় জাকার্তার সব স্কুল সোমবার বন্ধ থাকবে। ওই দিন শ্রেণি কার্যক্রম অনলাইনে পরিচালনা করা হবে বলে জানিয়েছে নগর কর্তৃপক্ষ। তবে কত দিন এ ব্যবস্থা চলবে, তা জানানো হয়নি।
জাভা ও সুমাত্রা দ্বীপকে পৃথক করা প্রণালিতে অবস্থিত আনাক ক্রাকাতোয়া। এর অর্থ ‘ক্রাকাতোয়ার সন্তান’। আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের কারণে নৌযান চলাচলে বিঘ্ন ঘটতে পারে বলে প্রণালিটি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। স্থানীয় বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আগ্নেয়গিরিটিকে ঘিরে তিন কিলোমিটার ব্যাসার্ধের নির্ধারিত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় কোনো নৌযান যেতে পারবে না।
গত শতকের শুরুর দিকে সমুদ্র থেকে জেগে ওঠার পর থেকে আনাক ক্রাকাতোয়া মাঝেমধ্যে সক্রিয় হয়ে আসছে। ১৮৮৩ সালে ক্রাকাতোয়া আগ্নেয়গিরির ভয়াবহ অগ্ন্যুৎপাতের পর সৃষ্ট বিশাল গহ্বরেই পরে আনাক ক্রাকাতোয়া গড়ে ওঠে। ওই অগ্ন্যুৎপাত ইতিহাসের অন্যতম প্রাণঘাতী ও ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে বিবেচিত। এতে আনুমানিক ৩৫ হাজার মানুষ নিহত হয়েছিলেন।
ভূতত্ত্ব সংস্থার প্রধান লানা সারিয়া জানান, ‘ভূকম্পনজনিত তৎপরতা আগ্নেয়গিরির অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থায় আগ্নেয় তরলের চলাচল বা নির্গমনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।’ তবে পরবর্তী অগ্ন্যুৎপাত কখন হবে, এর মাত্রা কতটা হবে এবং কী ধরনের অগ্ন্যুৎপাত ঘটবে, তা সুনির্দিষ্টভাবে পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব নয় বলে জানান তিনি।
আনাক ক্রাকাতোয়ার কাছাকাছি না যাওয়ার জন্যও সতর্ক করেছেন লানা। তার ভাষ্য, আগ্নেয়গিরি থেকে ছিটকে বের হওয়া পদার্থ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় থাকা মানুষের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। তবে সাম্প্রতিক অগ্ন্যুৎপাত থেকে এই মুহূর্তে সুনামি সৃষ্টির আশঙ্কা নেই বলেও জানান তিনি।
২০১৮ সালে আনাক ক্রাকাতোয়ার একাংশ ধসে পড়ার কারণে সুনামি সৃষ্টি হয়েছিল। ওই ঘটনায় ৪২৯ জন নিহত হন এবং হাজারো মানুষ বাস্তুচ্যুত হন।
ইন্দোনেশিয়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি দ্বীপপুঞ্জ রাষ্ট্র। দেশটি প্রশান্ত মহাসাগরীয় ‘অগ্নিবলয়’ এলাকায় অবস্থিত। সেখানে মহাদেশীয় ভূত্বকের বিভিন্ন পাতের সংঘর্ষের কারণে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত ও ভূমিকম্পের প্রবণতা বেশি।






